আমেরিকা-ইরানের ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী সপ্তাহে। এদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ চলছেই। সেই সঙ্গে সমানে হুমকি-ধমকিও দিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে বাগে আনার জন্য সবকিছুই করছে যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফা মধ্যস্থতা-বৈঠকের জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। জানা গেছে, ইসলামাবাদে প্রথম বৈঠক ভেস্তে গেলেও শিগগিরই ইরানের সঙ্গে ফের বৈঠকে বসতে পারে আমেরিকা। বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে, আগামী সপ্তাহেই এই বৈঠক হতে পারে। এদিকে ইসরায়েল ও লেবাননের ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার তথ্য দিয়েছেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ৩টা থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, “আমি লেবাননের সম্মানিত প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে চমৎকার আলোচনা করেছি। এই দুই নেতা তাদের দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থানীয় ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি শুরু করতে রাজি হয়েছেন।” পোস্টের শেষে ট্রাম্প লেখেন, “বিশ্বের ৯টি যুদ্ধ সমাধান করাটা আমার জন্য সম্মানের বিষয় ছিল, আর এটি হবে দশম।’
এদিকে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভায় ভোট হওয়ার আগেই ট্রাম্প লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করায় ইসরায়েলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির সংবাদ মাধ্যম চ্যানেল ১২ জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা আসা ইসরায়েলের জন্য আরও একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংকট সমাধানের একটা গুরুত্বপুর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।গত বুধবার হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে তারা আশাবাদী। হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট জানান, মার্কিন প্রতিনিধিদল আগামী সপ্তাহে ফের ইসলামাবাদে যেতে পারেন।
এদিকে বুধবার তেহরানে পৌঁছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন পাকিস্তান সেনাপ্রধান অসিম মুনির। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতা-বৈঠকের জন্য গতকাল বৃহস্পতিবারও অনেকগুলো বৈঠক করেছেন তিনি। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য সফরে আছেন পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনার কূটনৈতিক মঞ্চ প্রস্তুত করতেই তার এই উদ্যোগ। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে তার এই সফর চলবে।
এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ইরান যদি কোনো চুক্তিতে সম্মত না হয় তবে মার্কিন বাহিনী যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত।
হেগসেথ বলেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেছে, তারা যুদ্ধবিরতির সময় ইরানে অস্ত্র পাঠাবে না।
এদিকে পারস্য উপসাগরে ২৪০ মিলিয়ন ডলারের গোয়েন্দা ড্রোন খুইয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী। বিরলতম এই ড্রোনটি এ পর্যন্ত মাত্র ২০টি তৈরি করা হয়েছে। ২৪০ মিলিয়ন ডলারের মার্কিন নৌবাহিনী ড্রোনটি বিধ্বস্ত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও এর কারণ সম্পর্কে এখনও কিছু জানায়নি।
‘লেবাননে যুদ্ধবিরতি ইরানে যুদ্ধবিরতির মতোই গুরুত্বপূর্ণ’Ñ বলেছেন ইরানি পার্লামেন্ট স্পিকার ঘোনচে হাবিবিয়াজাদ। লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার।
লেবাননের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিয়েছি যে, আমরা এই মুহূর্তে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নই।’
ট্রাম্প দুই নেতার মধ্যে ঐতিহাসিক আলোচনার ঘোষণা দিলেও ইসরায়েলি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন। লেবাননের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিয়েছি যে, আমরা এই মুহূর্তে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নই।’
লেবাননের কর্মকর্তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা আর কোনো আলোচনা করবেন না।
উল্লেখ্য, ইসরায়েল জানিয়েছে যে তারা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখনই শেষ করতে চাইছে না। যদিও ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি সম্পন্ন হলো। এই যুদ্ধে লেবাননে এ পর্যন্ত ২,১৬৭ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১২ লাখেরও বেশি বাসিন্দা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল সতর্ক করে বলেছেন যে, ইউরোপের হাতে আর মাত্র ছয় সপ্তাহের মতো জেট ফুয়েল (বিমানের জ্বালানি) অবশিষ্ট আছে।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকলে শিগগিরই অনেক ফ্লাইট বাতিল হতে পারে।
এদিকে হরমুজ প্রণালীর ওমান অংশে জাহাজ চলাচলের প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। প্রস্তাব অনুযায়ী এ পথ দিয়ে জাহাজগুলো যাতে হামলার কোনো ঝুঁকি ছাড়াই চলতে পারেÑ এমন ব্যবস্থা বিবেচনা করে দেখতে পারে তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনার অংশ হিসেবে তেহরান এই প্রস্তাব দিয়েছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করে জানিয়েছে। তবে ইরান এই পথে পেতে রাখা মাইনগুলো সরাবে কি না অথবা ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোও এই সুবিধা পাবে কি না, সে বিষয়ে সূত্রটি কিছু জানায়নি।