যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যুদ্ধকে ‘ঈশ্বরের ইচ্ছা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ঈশ্বরের সমর্থনপ্রাপ্ত বলে দাবি করেন। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে ঘিরে ইরান যুদ্ধ নতুন করে আন্তর্জাতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের মতে, এই যুদ্ধ শুধু সামরিক বা ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের ফল নয়, বরং একটি উগ্র ধর্মীয় মতবাদের প্রভাবেও পরিচালিত হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে এটি কি একটি সাধারণ যুদ্ধ, নাকি আধুনিক যুগের একধরনের ‘ক্রুসেড’ (ধর্মের নামে যুদ্ধ)?
ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়, যাদের বেশিরভাগই শিশু। প্রাথমিক তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করা হয়নি। এই ঘটনার পরও হেগসেথ যুদ্ধকে ‘ঈশ্বরের ইচ্ছা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে থাকেন এবং দাবি করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ঈশ্বরের সমর্থনপ্রাপ্ত।
গত সোমবার পোপ লিও বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের মুখোমুখি হতে তার ‘কোনো ভয় নেই’ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলা চালিয়ে যাবেন। মার্কিন বংশোদ্ভূত এই পোপ সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের সমালোচনা করে একে ‘যুদ্ধের উন্মাদনা’ বলে অভিহিত করেছেন। সহিংসতার আহ্বানে মার্কিন প্রশাসনের সদস্যদের বারবার ঈশ্বরের নাম নেওয়ারও তিনি সমালোচনা করেছেন। পোপ তখনই এই মন্তব্য করলেন যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পোপ লিও-র সমালোচনা করে তাকে অপরাধ দমনে দুর্বল বলে অভিযুক্ত করেছেন এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিষয়ে তার অবস্থানের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি পোপ লিওর ভক্ত না।’
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের সংবাদদাতা জুলিয়া ক্যারি ওং এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ‘হেগসেথের ঘনিষ্ঠ ধর্মীয় উপদেষ্টা ব্রুকস পটেগার পেন্টাগনে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে, তা ঈশ্বরের পরিকল্পনার অংশ। তিনি উল্লেখ করেন, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত বা যুদ্ধের ঘটনাও ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। ইরান যুদ্ধ চলাকালে হেগসেথ প্রকাশ্যে ইরানি শাসনব্যবস্থাকে ‘বর্বর’ আখ্যা দেন এবং তাদের বিরুদ্ধে ‘কোনো দয়া না দেখানোর’ আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি আমেরিকান জনগণকে ‘যিশু খ্রিস্টের নামে বিজয়ের জন্য প্রার্থনা’ করতে বলেন। তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ক্যাথলিক ধর্মগুরু ‘পোপ লিও’ সতর্ক করে বলেন, যাদের হাত রক্তে রঞ্জিত, তাদের প্রার্থনা ঈশ্বর গ্রহণ করেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, হেগসেথ একটি কট্টর ক্যালভিনিস্ট ধর্মীয় ধারার অনুসারী। এই মতবাদে বিশ্বাস করা হয়, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে তা পূর্বনির্ধারিত এবং ঈশ্বরের ইচ্ছার বাইরে কিছুই নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্বাস যুদ্ধ বা সহিংস ঘটনাকেও ন্যায্যতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
ইতিহাসবিদ ক্রিস্টিন কোবেস ডু মেজ বলেন, আধুনিক আমেরিকান ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ সহিংসতাকে নৈতিকভাবে বৈধ করার একটি প্রবণতা তৈরি করছে। তার মতে, আগে এসব ধারণা সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু এখন তা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রভাব ফেলছে। এই প্রবণতা শক্তিশালী হওয়ার পেছনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের সময়কার রাজনৈতিক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়। তার প্রশাসনের সময় থেকেই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে এবং হেগসেথের মতো ব্যক্তিদের উত্থান সেই ধারারই প্রতিফলন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান স্পষ্টভাবে ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা রাখার কথা বলে।