নিজ শহরেই শরণার্থী
আল জাজিরা
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:১৭ পিএম
আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:২১ পিএম
তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার পর ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল নিজের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছেন এক ইরানি নাগরিক। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলায় রফি-নিয়া সিনাগগ (ইহুদি উপাসনালয়) এবং পার্শ্ববর্তী আবাসিক ভবনগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। ছবি: আল জাজিরা/এএফপি
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ভয়াবহতা ও সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে ২৭ বছর বয়সী ইরানি তরুণী সানার (ছদ্মনাম) বয়ানে। তেহরানের পশ্চিম অংশে একটি ফ্ল্যাটে নিজের বিড়াল ‘ফান্দোগ’ (হাজেলনাট) কে নিয়ে একাকী যুদ্ধের দিনগুলো পার করেছেন এই অর্থনীতিবিদ ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ বিশ্লেষক।
সানার বর্ণনা অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে প্রথম মিসাইলটি তেহরানে আঘাত হানে। আগের বছরের (২০২৫ সালের জুন) যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এবার শহর ছেড়ে পালাবেন না। মা-বাবা ও প্রেমিকের শত অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি তার বিড়ালটিকে নিয়ে তেহরানেই থেকে যান।
যুদ্ধের দিনগুলো এক ক্লান্তিকর রুটিনে পরিণত হয়েছিল উল্লেখ করে সানা জানান, দিনের নির্দিষ্ট সময়ে বোমাবর্ষণ চলত। সুপারমার্কেট থেকে হোম ডেলিভারি আর মাঝে মাঝে প্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য দ্রুত বাইরে যাওয়া ছাড়া জীবন ছিল চার দেয়ালের মাঝে বন্দি। তবে সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল ইন্টারনেটের সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট। কোনো সার্চ ইঞ্জিন বা সোশ্যাল মিডিয়া কাজ করছিল না। খবর পাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল মাঝে মাঝে কাজ করা দামী ভিপিএন। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সময় কাটাতে তিনি বাগদাদ ডায়েরির মতো যুদ্ধের বই পড়ে নিজের জীবনের মিল খুঁজতেন।
সানার জীবনে ১৬ মার্চ ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ রাত। রাত ২টা ৩০ মিনিটে মেহরাবাদ বিমানবন্দরের কাছে একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণে পুরো শহর কেঁপে ওঠে। তিনি বলেন, “আলোর তীব্র ঝলকানিতে আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট ভরে গিয়েছিল। আমরা সোজা পার্কিং গ্যারেজের নিচের তলায় আশ্রয় নিই। মনে হচ্ছিল এবার বোধহয় আর বাঁচব না”।
সেই রাতে নিজের বিড়ালকে ফেলে জীবন বাঁচাতে নিচে নেমে যাওয়ার অপরাধবোধ তাকে এখনো তাড়া করে।
যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের অর্থনীতিতে ভয়াবহ ধস নামে। ৪ এপ্রিল সানা যখন দীর্ঘ বিরতির পর অফিসে ফেরেন, দেখেন তার ১৮ জন সহকর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। যুদ্ধের মধ্যে কাজ হারানো মানুষের কান্না তাকে ব্যথিত করে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করার হুমকি দিলে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। মানুষের মনে আশঙ্কা জাগে, হয়তো পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে যাবে।
অবশেষে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলে সানার মনে হয় ১০০ কেজি ওজনের কোনো বোঝা তার বুক থেকে নেমে গেছে। যুদ্ধের অবসান তাকে আবার স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ দেয়। যুদ্ধবিরতির পর প্রথম সকালে তিনি বিউটি পার্লারে গিয়ে চুল কাটান এবং দামী ভিপিএন কিনে দীর্ঘ সময় পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ক্রল করেন। সানার ভাষায়, “এগুলোই ছোট ছোট জিনিস যা আপনাকে আবার মানুষ হিসেবে অনুভব করতে সাহায্য করে”।
নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রতিবেদনে ব্যবহৃত নামগুলো পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে তেহরানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও যুদ্ধের ক্ষত এখনো সাধারণ মানুষের মনে স্পষ্ট।