আলজাজিরা
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ২০:২০ পিএম
আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ২১:১৬ পিএম
মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে শুক্রবার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে পার্লামেন্ট ভবন থেকে বের হওয়ার সময় হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন দেশটির নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং। ছবি: আলজাজিরা/এপি
মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানকারী নেতা সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার এবং দেশজুড়ে গৃহযুদ্ধ শুরুর পাঁচ বছর পর তিনি এই পদে আসীন হলেন।
মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে শুক্রবার নিজের অভিষেক ভাষণে তিনি দাবি করেন, “মিয়ানমার আবারও গণতন্ত্রের পথে ফিরে এসেছে এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে”। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন যে, দেশকে এখনও অনেক “চ্যালেঞ্জ অতিক্রম” করতে হবে।
এর আগে গত সপ্তাহে সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্টে একতরফা ভোটে জয়লাভের মাধ্যমে মিন অং হ্লাইং নিজের ক্ষমতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকাপোক্ত করেন। এই পদের জন্য মনোনীত তিন প্রার্থীর মধ্যে তিনি বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন; বাকি অন্য দুই প্রার্থী ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।
৬৯ বছর বয়সী এই জেনারেল ২০২১ সালে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি-র সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। সু চি-কে গ্রেপ্তারের পর মিয়ানমার জুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যা দেশটিকে চরম অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেয়।
সেই সময় অভ্যুত্থানের প্রতিবাদে দেশজুড়ে গণ-অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এর জবাবে সামরিক বাহিনী নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন চালায়, যার ফলে মিয়ানমারকে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সংস্থা (আসিয়ান) থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।
মিন অং হ্লাইং শুক্রবার তার ভাষণে বলেন, তারা এখন “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করবে এবং আসিয়ানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাবে”।
বার্তা সংস্থা এএফপি-এর তথ্যমতে, শুক্রবারের এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রতিবেশী চীন, ভারত ও থাইল্যান্ডসহ ২০টি দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
একতরফা সংসদীয় নির্বাচন
মিন অং হ্লাইংয়ের এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো ‘প্রহসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
নতুন প্রেসিডেন্ট সামাজিক পুনর্মিলন ও শান্তির স্বার্থে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি এবং প্রতিবাদী সরকারি কর্মকর্তাদের কাজে ফেরার যে আহ্বান জানিয়েছেন, সেটিকেও সমালোচকরা ‘লোকদেখানো’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সেনাপ্রধান থেকে বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিন অং হ্লাইংয়ের এই উত্তরণ মূলত গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত এক সংসদীয় নির্বাচনের ফল। সামরিক সমর্থিত দল সেই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেলেও পশ্চিমা বিশ্ব এবং সমালোচকরা একে ‘ভুয়া’ নির্বাচন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সেনাবাহিনী সমর্থিত ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ (ইউএসডিপি) ৮০ শতাংশের বেশি আসনে জয়লাভ করেছে। এছাড়া সংসদের ২৫ শতাংশ আসন আগে থেকেই সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, মিয়ানমারের একটি বিশাল অংশে কোনো ভোটগ্রহণই সম্ভব হয়নি, কারণ সেসব এলাকা বর্তমানে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে। বিদ্রোহীরা এই নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, যা মিন অং হ্লাইংয়ের ক্ষমতার বৈধতাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এদিকে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ এখনও অব্যাহত রয়েছে। অং সান সু চি-র দলের অবশিষ্টাংশ এবং জাতিগত সংখ্যালঘু সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে একটি সম্মিলিত ফ্রন্ট গঠন করেছে।
এই যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতি অপূরণীয় দাবি করেছে ইন্টারন্যাশনাল কনফ্লিক্ট মনিটর। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৯৬,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে অন্তত ৩৬ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।