প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১২:২১ পিএম
আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৩৫ পিএম
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত
যে যুদ্ধে কোনো পক্ষই জয়ী হতে পারেনি, সেখানে সবচেয়ে বড় ‘পরাজিত পক্ষ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইরানের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ বাধিয়ে জয়ী হওয়ার জন্য নেতানিয়াহু তার আওতায় থাকা সব ধরনের চেষ্টাই করেছেন। বছরের পর বছর তেহরানের শাসক বদলের হুমকি দিয়েছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তার কর্মকাণ্ডকে এখনও নাটকীয় বলা হয়। বিশ্ব মিডিয়ার সামনে তথাকথিত সব গোপন নথি তুলে ধরেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধে জড়াতে কূটনৈতিক চাপ দিয়েছেন। কিন্তু চলমান যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে তার সব চেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো শুরু থেকেই ইসরায়েলের ‘ইরানে শাসন পরিবর্তন বা বিপ্লব’ ঘটার ভবিষ্যদ্বাণীকে ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত তা-ই প্রমাণিত হয়েছে।
ইসরায়েলের ধারণা ছিল, এই যুদ্ধ বড়জোর কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হবে, কিন্তু সেই হিসাবও পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হলো। এমনকি যুদ্ধবিরতির দুই দিন আগেও নেতানিয়াহু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এটি স্বাক্ষর না করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে তার অবস্থান পরিবর্তন করে ইসরায়েলকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে কার্যত সরিয়ে রেখে সমঝোতায় পৌঁছেন।
ইসরায়েলের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ এক পোস্টে এই ঘটনাকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার মূল বিষয়ে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল, ইসরায়েল তখন আলোচনার টেবিল পর্যন্ত ছিল না। সেনাবাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করেছে, জনগণ ধৈর্য ধরেছে, কিন্তু নেতানিয়াহু রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তার অহংকার ও পরিকল্পনাহীনতার কারণে সৃষ্ট ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আমাদের বছরের পর বছর সময় লাগবে।’
একইভাবে বামপন্থী ডেমোক্র্যাট পার্টির নেতা ইয়ার গোলান এই যুদ্ধবিরতিকে ‘চরম কৌশলগত ব্যর্থতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, নেতানিয়াহু ঐতিহাসিক বিজয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে ফেলেছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হয়ে নেতানিয়াহু এখন দক্ষিণ লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখে তার কৃতিত্ব জাহির করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু হিজবুল্লাহর মতো দক্ষ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে স্থলযুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনী আরও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তার কট্টরপন্থী ছেলে। ট্রাম্পের ১০ দফা পরিকল্পনায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারও পরোক্ষভাবে স্বীকৃত হতে পারে বলে জল্পনা চলছে, যা ওবামা আমলের পরমাণু চুক্তির কাছাকাছি একটি অবস্থান, অথচ নেতানিয়াহু এই চুক্তিটি ধ্বংস করতেই এতদিন ধরে চেষ্টা করছিলেন।
ইসরায়েলি সংবাদ মাধ্যম ‘হারেৎজ’-এর সামরিক বিশ্লেষক আমোস হারেলের মতে, নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা ছিল অবাস্তব কল্পনাপ্রসূত এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের তোয়াক্কা না করে নেওয়া এক হঠকারী সিদ্ধান্ত। ফলে গাজা এবং লেবাননের পর এখন ইরানের ক্ষেত্রেও তার চূড়ান্ত বিজয়ের বুলি কেবল ফাঁকা প্রতিশ্রুতি হিসেবেই প্রমাণিত হলো।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধের কথা বলে নেতানিয়াহু টিকে ছিলেন, সেই যুদ্ধে মার্কিন সমর্থন নিয়ে এক মাস লড়াই করেও ব্যর্থ হওয়ার পর ইসরায়েলি জনগণের কাছে এখন বড় প্রশ্নÑ নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উপযোগিতা আর কতটুকু?