প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫৩ পিএম
ইরানের হামলায় বিধ্বস্ত যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টারের ভগ্নাংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। আইআরজিসি তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে রবিবার এই ছবি প্রকাশ করে। ছবি: এএফপি
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানের কৌশল বিস্ময়ের পর বিস্ময় সৃষ্টি করে যাচ্ছে। আকাশপথে মার্কিন বিমানের যে গর্ব তা এরই মধ্যে খর্ব হয়েছে। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধকৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তাদের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র সিআইএর ওপর কার্যত ‘ওভারট্রাম্প’ করছে তেহরান। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সিআইএর দপ্তরে এক মিনিটের ব্যবধানে দুবার ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। এই হামলায় কারও মৃত্যু হয়েছে কি না, সেটা এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। তবে বেহুলার বাসর ঘরের চেয়েও সিআইএর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নিশ্ছিদ্র মনে করা হয় সেই স্থানে কীভাবে ড্রোন হামলা হয় তা নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। এদিকে ক্রমেই আরব বিশ্বে সমর্থন বাড়ছে ইরানের। শনিবার ইরাকের রাজধানী বাগদাদ ও অন্যান্য শহরে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লাখো মানুষ সমাবেশ করেছে। এদিকে যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রু সদস্যকে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে উদ্ধার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
গত শনিবার মধ্যরাতে এক মিনিটের ব্যবধানে পর পর দুটি ড্রোন হামলায় কেঁপে ওঠে সিআইএর দপ্তর। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমে হামলা চালানো হয় স্থানীয় সময় রাত দেড়টায়। তার এক মিনিটের মধ্যেই আরও একটি ড্রোন হামলা চালানো হয়। এই খবরের নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্সসহ বিশ্বের শীর্ষ গণমাধ্যম।
রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে রয়েছে সিআইএ দপ্তর। সেটি ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ইরানের দাবি। তবে সৌদির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, সিআইএ দপ্তরের খুব একটা ক্ষতি হয়নি। হামলার কারণে আগুন ধরে গিয়েছিল। তবে মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানিয়েছে, মার্কিন দূতাবাসের একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত শনিবার বাগদাদ ও অন্যান্য শহরে ইরাকি শিয়া নেতা মুকতাদা সাদরের হাজার হাজার সমর্থক ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিবাদে সমাবেশ করেছে। বাগদাদের তাহরির স্কোয়ারে নারীসহ বিশাল জনতার ঢল রাস্তায় নেমে আসে এবং ‘নো, নো ইসরাইল’ ও নো, নো আমেরিকা’ স্লোগান দেয়। চল্লিশোর্ধ্ব এক বিক্ষোভকারী সামির এএফপি সংবাদ সংস্থাকে বলেন, আজকের এই বিক্ষোভ শুধু ইরাকে নয়, সারা বিশ্বে আগ্রাসন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
এদিকে বোমাবর্ষণের পরেও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ইরান কীভাবে সচল রেখেছে সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
মার্কিন গোয়েন্দাদের রিপোর্টে কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। তবে এটা দাবি করা হয়েছে, ইরানের হাতে এখনও যথেষ্ট অস্ত্র মজুদ রয়েছে।
ইরানের পরমাণু কেন্দ্র বিশেষ করে নাতান্জ ও ইসফাহানে একের পর এক বোমাবর্ষণ করেছে আমেরিকা-ইসরায়েলে। এত হামলার পরেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ অটুট আছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের এই দক্ষতা চমকে দিয়েছে মার্কিন সমরবিদদের।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন গোয়েন্দাদের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বোমাবর্ষণের পরেও ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন এবং মজুদ কেন্দ্রগুলো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আবার সক্রিয় করা হচ্ছে, উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু করা হচ্ছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, ইরানে গত পাঁচ সপ্তাহে ১১ হাজার জায়গায় হামলা চালানো হয়েছে। তারপরও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা এতটুকু কমেনি। ইরানের অস্ত্রভান্ডারে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমছে, ট্রাম্পের এমন দাবির উল্টোটাই বলছে মার্কিন গোয়েন্দাদের রিপোর্ট।
এদিকে ইরানের আকাশে ভূপাতিত হওয়া যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রু সদস্যকে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে উদ্ধার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এই অভিযানকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে সাহসী ‘সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ’ মিশনগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, মার্কিন বাহিনী নিখোঁজ কর্মকর্তার অবস্থান শনাক্ত করতে টানা নজরদারি চালায়। একই সঙ্গে সিআইএ বিভ্রান্তিমূলক ক্যাম্পেইন চালায়, ইরানের ভেতরে ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে, ওই কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। এতে ইরানি বাহিনীর অনুসন্ধান প্রচেষ্টা বিভ্রান্ত হয় বলে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে কলা হয়েছে, উদ্ধার অভিযানটি মূলত রাতের অন্ধকারে পরিচালিত হয়। এতে অংশ নেয় মার্কিন বিশেষ বাহিনী, হেলিকপ্টার এবং সি-১৩০ পরিবহন বিমান।
হেলিকপ্টারগুলোকে পাহাড়ি ও প্রতিকূল ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে নিচু উচ্চতায় উড়তে হয়, অভিযানের সময় ইরানি বাহিনীর সঙ্গে তীব্র গোলাগুলির ঘটনা ঘটে, অন্তত দুটি মার্কিন হেলিকপ্টার গুলিবিদ্ধ হয় এবং কিছু সেনা আহত হন। উদ্ধার অভিযানের সময় মার্কিন বাহিনীকে সরাসরি সংঘর্ষে জড়াতে হয়। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্ধার নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র আকাশে শক্তিশালী যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছিল। এ সময় দুটো মার্কিন হেলিকপ্টার নিজেরাই ধ্বংস করে দেয় বলে জানিয়েছে ইরান।
রয়টার্স জানিয়েছে, শেষ পর্যন্ত নিখোঁজ ওই কর্মকর্তা (কর্নেল) সফলভাবে উদ্ধার হয়েছেন। তবে তিনি আহত হলেও বর্তমানে নিরাপদে আছেন এবং তাকে ইরানের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম সাহসী উদ্ধার মিশন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) বাহিনীও ওই কর্মকর্তাকে খুঁজতে অভিযান চালাচ্ছিল। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস। প্রথম ক্রু সদস্যকে দ্রুত উদ্ধার করার পর নিখোঁজ থাকা দ্বিতীয় জনকেও উদ্ধার করতে সমর্থ হয় মার্কিন বাহিনী। তবে মার্কিন অভিযান ব্যর্থ হয়েছে দাবি করেছে ইরান।
এদিকে ইসলামাবাদে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের আলোচনার প্রস্তাব নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে। গত কয়েক দিন ধরে চলা নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মুখ খুলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। মার্কিন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জনকে সরাসরি ‘ভুল ব্যাখ্যা’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেছেন, পাকিস্তান আয়োজিত শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে তেহরান কখনোই অসম্মত নয়।
শনিবার সামাজিক মাধ্যম এক্সের এক পোস্টে আরাগচি বলেন, ইসলামাবাদ যেতে আমরা কখনোই অস্বীকৃতি জানাইনি। আমাদের নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো যা ছড়াচ্ছে তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। তিনি জানিয়েছেন, আলোচনার চেয়েও ইরানের কাছে বড় বিষয় হলো, তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই ‘অবৈধ যুদ্ধ’ যেন চূড়ান্ত এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়।
এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ এবং পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকা দাবি করেছিল, ইরানের দিক থেকে সাড়া না পাওয়ায় শান্তি আলোচনা থমকে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই বিধ্বংসী যুদ্ধ থামাতে পাকিস্তান ও চীন একজোট হয়ে একটি ‘পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা’ নিয়ে কাজ করছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সম্প্রতি বেইজিং সফর করে আসার পর সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গেও এ নিয়ে টেলিফোনে আলোচনা করেছেন। ইসলামাবাদ চাইছে বেইজিংয়ের প্রভাব খাটিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনকে আলোচনার টেবিলে বসাতে।