ইরানে যুদ্ধের প্রভাব
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:০৫ পিএম
আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:১৪ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ভারতে কনডমের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতীকী ছবি
ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বিশ্বে একাধিক শিল্প ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যে ভারতের লাইফস্টাইলের সঙ্গে যুক্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কনডমের মতো পণ্যও রয়েছে। কনডমের সংকট হলে ভারতে গর্ভধারণের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
কনডম উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত পেট্রো-কেমিক্যাল পণ্য, অ্যামোনিয়া ও সিলিকন অয়েলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ভারতে দাম বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে।
কনডম উৎপাদন শিল্পের সূত্রগুলো বলছে, ভারতের আট হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এই শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে অ্যামোনিয়ার দাম ৪০-৫০% শতাংশ বাড়তে পারে। যে কারণে সিলিকন তেলের দামও বাড়তে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বিবিসি হিন্দিকে বলেন, “কেউ ভাবেনি যে এই ইন্ডাস্ট্রিতে কোনো সমস্যা হবে। তবে কনডম এখন লাইফস্টাইল প্রোডাক্টে পরিণত হয়েছে এবং এই ব্যবসার যে কোনোরকম প্রভাব মানুষের উপরেও পড়ে।”
শিল্পখাতে এই সমস্যার প্রভাব জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্য গবেষণার (যেমন পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি এবং এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি) সঙ্গে জড়িতদের জন্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
কেন দাম বাড়তে পারে?
এইচএলএল লাইফ কেয়ার লিমিটেডের এক মুখপাত্র বিবিসি হিন্দিকে বলেন, “পিভিসি ফয়েল, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল, পলি কেমিক্যাল এবং প্যাকেজিং উপকরণের মতো মূল উপাদানের দাম ওঠানামার সঙ্গে কাঁচামাল সরবরাহ বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে উৎপাদন এবং অর্ডার অনুযায়ী পণ্য পৌঁছনোর কাজও প্রভাবিত হতে পারে।”
রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থা এখন প্রতি বছর প্রায় ২০০ কোটি কনডম তৈরি করে। সংখ্যাটা দেশে তৈরি মোট কনডমের প্রায় ৫০ শতাংশ।
এইচএলএল ২০২৫-২০২৬ সালে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি এবং জাতীয় এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির জন্য বিনামূল্যে ১০০ কোটি রুপির বেশি মূল্যের কনডম সরবরাহ করেছিল। এইচএলএল ৮৭টার বেশি দেশে তাদের তৈরি এই পণ্য রপ্তানি করে।
এক কর্মকর্তা বলেন, “জাহাজের কন্টেইনারের বৈশ্বিক সংকটের কারণে বিদেশে ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠাতে দেরি হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বড় জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় সমুদ্র পথে পরিবহনে বেশি সময় লাগছে।”
কিউপিড লিমিটেডের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার আর. বাবু বিবিসি হিন্দিকে বলেন, “সিলিকন অয়েল ও অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এই সময়ে ল্যাটেক্সের দামও সাধারণত বেড়ে যায়। ফলে, এটি উৎপাদন খরচের ওপর প্রভাব ফেলছে। সমস্যা হলো, আমরা এই বর্ধিত মূল্য সরবরাহকারীদের ওপর চাপাতে পারছি না, কারণ তারা এর জন্য প্রস্তুত নয়। তাই এটি একটি বড় সমস্যা।”
আর. বাবু বলেন, “আমরা আমাদের মোট উৎপাদনের ৮০ শতাংশ রপ্তানি করি, প্রধানত রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইউরোপ এবং ব্রাজিলে। এই জায়গাগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য জাহাজ পেতেও আমরা অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছি।”
কনডম শিল্পের উপর এর প্রভাব কতটা গুরুতর?
পরিবার পরিকল্পনা ক্ষেত্রে কনডমের মূল্যবৃদ্ধি বা এর উৎপাদন হ্রাস নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পপুলেশন ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়ার নির্বাহী পরিচালক পুনম মুত্রেজা বিবিসি হিন্দিকে বলেছন, “উন্নত স্বাস্থ্য ফলাফল অর্জনের জন্য গর্ভনিরোধকের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি করা এবং গর্ভনিরোধে পুরুষদের অংশগ্রহণকে স্বাভাবিক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কনডমের ঘাটতি বা এর মূল্যবৃদ্ধি গর্ভধারণের সংখ্যাও বাড়িয়ে দিতে পারে।”
পুনম মুত্রেজা বলেন, “ভারতে গর্ভনিরোধক বিকল্পগুলোর প্রসার ও সহজলভ্যতা বাড়ানো প্রয়োজন। সেই সঙ্গে কনডম ব্যবহার ও পরিবার পরিকল্পনায় পুরুষদের অংশগ্রহণও বাড়াতে হবে। দাম বাড়লে বা সহজলভ্যতা কমে গেলে কনডমের ব্যবহার কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে। এর ফলে এ পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতি ব্যাহত হতে পারে।”
তিনি বলেন, “এটি কেবল অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকিই বাড়ায় না, বরং নারীদের ওপর গর্ভধারণের অসম বোঝাকেও আরও তীব্র করে তোলে, যা নিরসনের চেষ্টা করছে ভারত।”
ভারতে কন্ডোম ব্যবহারের হার ‘খুবই কম’। পরিবার পরিকল্পনার একটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতি হিসেবে এর ব্যবহার বৃদ্ধি করা অপরিহার্য ছিল।
পুনম মুত্রেজা বলেছেন, “জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (এনএফএইচএস)-৫ থেকে জানা গেছে যে, বর্তমানে মাত্র ৯ শতাংশ বিবাহিত দম্পতি কনডমকে তাদের পরিবার পরিকল্পনার প্রধান পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করেন। এটি কনডমের গুরুত্ব এবং এর প্রসারের ব্যাপক সুযোগকে তুলে ধরে।”
তিনি বলেন, “ভারতের মতো দেশে, যেখানে জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলো গণ-সংগ্রহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, সেখানে কনডমের স্বল্পমেয়াদী ঘাটতিও বিনামূল্যে বা ভর্তুকিযুক্ত কনডমের ওপর নির্ভরশীলদের প্রাপ্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।”
অবশেষে প্রশ্ন হলো, ভোক্তাদের কনডমের জন্যও কবে আরও বেশি দাম দিতে হবে?
শিল্প খাতের কর্মকর্তারা এখন মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে মনে হচ্ছে। তাদের একজন বলেছেন, “এই যুদ্ধ যত তাড়াতাড়ি শেষ হবে, ততই সবার জন্য মঙ্গল হবে।”