প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৪৮ এএম
আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৫৪ এএম
ইরানের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কুয়েতের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বুধবার ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। ছবি: এফপি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে আবারও কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তেহরান কোনো সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি নয়; বরং পুরো যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তিই তাদের লক্ষ্য। যদিও বারবার যুদ্ধবিরতির কথা বলে আসছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা থামছে না। দিনে দিনে অগ্নিগর্ভে পরিণত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। ইরান বুধবার কুয়েতের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। ড্রোন হামলায় সেখানকার জ্বালানি ডিপোতে ভয়াবহ আগুন লাগে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে কুয়েত।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধবিরতি নয়, সম্পূর্ণ যুদ্ধের অবসান চাইÑ শুধু ইরানে নয়, গোটা অঞ্চলে।’ তার এই মন্তব্যে স্পষ্ট, তাৎক্ষণিক শান্তির বদলে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই জোর দিচ্ছে তেহরান।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল বুধবার নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এমন দাবি করেন।
তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট ঠিক কীভাবে বা কোন মাধ্যমে এই আগ্রহ দেখিয়েছেন, সে বিষয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত কিছু জানাননি। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির অনুরোধ সংক্রান্ত বক্তব্যকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রের বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক প্রতিবেদনে এই দাবি করা হয়েছে।
পরে ইরানের সংবাদ সংস্থা আইআরআইবি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধবিরতির কোনো প্রস্তাব দেয়নি।
এ বিষয়ে আরাগচি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি ইরান। এমনকি কোনো পাল্টা প্রস্তাব বা শর্তও উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের কাছ থেকে বার্তা পেলেও সেটিকে আনুষ্ঠানিক আলোচনার অংশ হিসেবে দেখছে না তেহরান।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গে আরাগচি বলেন, জলপথটি আপাতত খোলা রয়েছে। তবে যারা ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তাদের জন্য এটি কার্যত বন্ধ। তিনি আরও সতর্ক করে দেন, প্রয়োজনে স্থলযুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত রয়েছে ইরান, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে কিছুটা সংযত অবস্থান তুলে ধরেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, ইরান যুদ্ধ শেষ করতে প্রয়োজনীয় সদিচ্ছা রাখে, তবে এর জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ জরুরি, বিশেষ করে ভবিষ্যতে এমন সংঘাত আর না ঘটার নিশ্চয়তা।
ইরানের এই অবস্থানের পর আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় উত্থান হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বক্তব্য নতুন কিছু নয়; বরং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অচলাবস্থারই প্রতিফলন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার ইঙ্গিত দিলেও, দুই পক্ষের অবস্থানের পার্থক্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
কুয়েতে ড্রোন হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা কুয়েত নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, হামলায় জ্বালানি ট্যাংকগুলোতে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে। একই দিনে বাহরাইনেও একই ধরনের হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানি ড্রোন হামলার পর একটি বেসরকারি কোম্পানির স্থাপনায় আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দমকল বাহিনী কাজ করছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন ইরান যুদ্ধ বিরতিতে আগ্রহী বলে জানাচ্ছেন তখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরান অন্তত ছয় মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। এ সময় তাদের পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মঙ্গলবার আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন।
তেহরানে আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি জোর দিয়ে বলেন, ‘শত্রুদের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার তোয়াক্কা না করেই ইরান নিজেকে রক্ষা করতে সংকল্পবদ্ধ।’ ইরানের বাহিনী দীর্ঘমেয়াদি অভিযান পরিচালনায় সক্ষম বলে সতর্ক করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে তাদের আলোচনা চলছে এবং তারা ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে নিয়েছেÑ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় ‘আলোচনা’র একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা রয়েছে। আলোচনা বলতে এমন এক পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে দুই দেশ চুক্তিতে পৌঁছার জন্য একসঙ্গে বসে কথা বলে। বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এমন কোনো পরিস্থিতি নেই।
তবে আরাগচি স্বীকার করেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই ধরনের বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত আছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু বার্তা সরাসরি এবং কিছু আঞ্চলিক বন্ধুদের মাধ্যমে পাচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ইরান সেগুলোর জবাবও দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের দেশগুলোর দূরত্ব বাড়ছে। একসময়কার মিত্র ফ্রান্স ট্রাম্পের পাশ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সের কনিষ্ঠ প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যালিস রুফো বলেন, ‘ন্যাটো ইউরো-আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। এটি হরমুজ প্রণালীতে অভিযান পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয়নি। সেখানে এমন কিছু করা হবে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।’
ইরান বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। তা খুলতে মিত্রদেশগুলোকে সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু তারা সেই আহ্বানে সাড়া দেয়নি।
সাড়া না দেওয়ায় ন্যাটো নিয়ে কটাক্ষ করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ দেশটির অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তা। বুধবার যুক্তরাজ্যের সংবাদ মাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সামরিক জোটটি থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা তিনি গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন। এর আগে ন্যাটো মিত্রদের ‘ভীরু’ বলে বিদ্রূপ করেছিলেন তিনি। তিনি বলেন, এই সামরিক প্রতিরক্ষা জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে একবার প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ইরান যুদ্ধ শেষে সেটাতে যোগদানের কথা ‘পুনর্বিবেচনা’ করার প্রশ্নই আসে না।
হরমুজ প্রণালি খুলতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে আমিরাত
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য মিত্রদের সঙ্গে মিলিত হয়ে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী খুলতে সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পদক্ষেপের অনুমোদনের জন্য দেশটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাব আনার চেষ্টা করছে। আমিরাতের কূটনীতিকরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ-এশিয়ার সামরিক শক্তিগুলোর কাছে একটি জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেনÑ যাতে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে প্রণালীটি খুলে দেওয়া যায়।
আমিরাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা কীভাবে ‘সামরিক ভূমিকা’ রাখতে পারে, তা সক্রিয়ভাবে পর্যালোচনা করছে। এ ছাড়া ইউএই যুক্তরাষ্ট্রকে প্রণালীর কৌশলগত দ্বীপগুলো, যেমন আবু মুসা দখলের আহ্বান জানিয়েছে। বর্তমানে এই দ্বীপ ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আমিরাত দাবি করে তা নিজেদের। আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখা জরুরি। এ বিষয়ে বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত ঐকমত্য রয়েছে।