প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬ ২২:০৮ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিত্রদের বলেছেন, জ্বালানি কমে গেলে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘জেট ফুয়েল’ কিনতে পারবে। ছবি: শাটারস্টক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের ৩২তম দিনে ইরানের ওপর একের পর এক শক্তিশালী হামলা চালিয়েছে। ইরানের ইসফাহানে গোলাবারুদের ডিপোতে ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা হামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানির দাম যখন চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়েছে, তখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সহযোগীদের বলেছেন, হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত না হলেও তিনি চলমান যুদ্ধ শেষ করতে চান। অসহযোগী মিত্রদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেছেন, ‘নিজেদের তেল, নিজেরা সংগ্রহ কর’। আর এদিনই ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের ওপর টোল বা শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। ইরানের পার্লামেন্টারি কমিটির এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে এই প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে ইরানি মুদ্রা রিয়ালে ফি দিতে হবে। তবে সবচেয়ে কড়া পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জাহাজ এবং ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞায় অংশ নেওয়া দেশগুলোর জাহাজ চলাচলে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট সংবাদ সংস্থা ফারস জানিয়েছে, ওমানের সহযোগিতায় এই টোল ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। যুদ্ধের আগে এই পথটি উন্মুক্ত থাকলেও এখন তেহরান একে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
এদিকে রণক্ষেত্রে মার্কিন
বাহিনীর তৎপরতা এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের
সেনাবাহিনীর অভিজাত ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের কয়েক হাজার প্যারাট্রুপার মধ্যপ্রাচ্যে
পৌঁছতে শুরু করেছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ইরানের ভেতরে স্থলসেনা মোতায়েনের
সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না এবং এই প্যারাট্রুপাররা ইতোমধ্যে সেখানে থাকা হাজার হাজার
মেরিন ও স্পেশাল ফোর্সের সঙ্গে যুক্ত হবেন। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন
লেভিট দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত ইরানের ১১ হাজারেরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তু
ধ্বংস করেছে এবং তাদের নৌবাহিনীর ১৫০টিরও বেশি জাহাজ নিমজ্জিত করেছে। তিনি সতর্ক করেছেন,
ইরান যদি চুক্তির এই ‘সুযোগ’ হারায়, তবে তাদের চরম মূল্য দিতে হবে। তবে মজার বিষয়
হলো, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে যে ট্রাম্প তার সহযোগীদের বলেছেন, হরমুজ প্রণালী
পুরোপুরি উন্মুক্ত না হলেও তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শেষ করতে আগ্রহী। ট্রাম্পের
অগ্রাধিকার এখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌ-মজুদ ধ্বংস করা, যাতে যুদ্ধ তার নির্ধারিত
৪-৬ সপ্তাহের সময়সীমা ছাড়িয়ে না যায়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মঙ্গলবার
বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আগামী কয়েক দিন নির্ণায়ক হবে। তেহরানকে সতর্ক করে
তিনি বলেছেন, যদি তারা কোনো চুক্তিতে না আসে তবে সংঘাত আরও তীব্র হবে।
যুদ্ধের ভয়াবহতা এখন কেবল
সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং ইরানের বেসামরিক জনজীবন ও অবকাঠামো মারাত্মকভাবে
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ৩০০টিরও বেশি
চিকিৎসাকেন্দ্র, ৭৬০টি স্কুল এবং প্রায় ৯০ হাজার আবাসিক ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ
করে, মঙ্গলবার ইরানের একটি বড় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে, যেখানে ক্যানসার
ও অ্যানেস্থেটিক ওষুধ তৈরি হতো। এ ছাড়া ইসফাহানে একটি বিশাল গোলাবারুদের ডিপোতে যুক্তরাষ্ট্র
২ হাজার পাউন্ডের ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা দিয়ে হামলা চালিয়েছে, যার বিশাল বিস্ফোরণের
ভিডিও ট্রাম্প নিজেই কোনো ক্যাপশন ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। অন্যদিকে
হরমুজ প্রণালীর কেশম দ্বীপে একটি লবণাক্ত পানি শোধনাগারে হামলার ফলে সেটি অচল হয়ে পড়েছে,
যা ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের পানির সংকটে ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই যুদ্ধ
নিয়ে চরম অস্থিরতা ও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার মিত্র
দেশগুলোর কঠোর সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে ফ্রান্সের ওপর তিনি চরম ক্ষুব্ধ, কারণ দেশটি
ইসরায়েলগামী মার্কিন রসদবাহী বিমানকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেয়নি। ট্রাম্প
ফ্রান্সকে ‘অসহযোগী’ আখ্যা দিয়ে এর পরিণাম মনে রাখার হুমকি দিয়েছেন। এমনকি যুক্তরাজ্যের
মতো দেশগুলোকেও তিনি খোটা দিয়ে বলেছেন, জ্বালানি সংকটে পড়লে তারা যেন নিজেদের লড়াই
নিজেরা করা শেখে এবং সাহস করে হরমুজ প্রণালীতে গিয়ে নিজেদের তেল নিজেরা সংগ্রহ করে।
ট্রাম্পের এই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ফলে মিত্রদের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের
ভেতরেও এই যুদ্ধের উত্তাপ অনুভূত হচ্ছে; সেখানে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি গ্যালন ৪
ডলারে পৌঁছেছে, যা গত ৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোও
এই আগুনের আঁচ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। দুবাই বন্দরে নোঙর করা অবস্থায় কুয়েতের একটি তেলবাহী
ট্যাংকার ইরানি হামলার শিকার হয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুতিরাও সক্রিয়
হয়ে উঠেছে। জর্ডান, ইরাক ও সৌদি আরব ক্রমাগত মিসাইল ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ছে। সৌদি
আরবের উদ্দেশে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বার্তায় বলেছেন, এটিই দেশটিতে
থাকা মার্কিন বাহিনীকে বিতাড়িত করার উপযুক্ত সময়। তিনি সৌদি আরবকে ‘ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ’
হিসেবে সম্বোধন করে আশ্বস্ত করেছেন যে ইরানের অভিযান কেবল আগ্রাসনকারীদের বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘সারায়া আউলিয়া আল-দাম’ গত ২৪ ঘণ্টায় মার্কিন ঘাঁটিতে
৫টি হামলার দায় স্বীকার করেছে।
এত রক্তপাত ও ধ্বংসের মাঝেও
আলোচনার টেবিল নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। হোয়াইট হাউস দাবি করছে, ইরানের সঙ্গে তাদের আলোচনা
‘ভালোভাবে এগোচ্ছে’, কিন্তু ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই
দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোনো আলোচনা হয়নি, বরং পাকিস্তান ও অন্যান্য
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আসা মার্কিন প্রস্তাবগুলো তারা কেবল গ্রহণ করেছেন। বাঘাই
আরও স্পষ্ট করেছেন যে ইরান এনপিটি চুক্তিতে থাকলেও বর্তমানে তাদের অস্তিত্ব রক্ষাই
প্রধান লক্ষ্য এবং তারা কোনো পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না। তবে যুদ্ধের এই ঘোলাটে
পরিস্থিতিতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে, হরমুজের এই অচলাবস্থা
কোভিড-১৯ বা ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও বড় সরবরাহ সংকট তৈরি করেছে, যার ফলে আগামী জুনের
মধ্যে বিশ্বে আরও ৪৫ মিলিয়ন মানুষ চরম ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে।