× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পরমাণু কর্মসূচি ও ইরানের অস্ত্রভাণ্ডারের ইতিহাস

মো. নিজামুল হক

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬ ১৪:১৭ পিএম

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬ ১৪:২০ পিএম

ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ছবি: ইরনা

ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ছবি: ইরনা

ইরান বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র, বিশেষ করে তার পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে। বর্তমান সময়ে ইরানকে একটি ‘নিউক্লিয়ার থ্রেশহোল্ড স্টেট’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়Ñ অর্থাৎ দেশটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রধারী নয়, কিন্তু সেই অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, জ্ঞান এবং উপকরণ তাদের হাতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদেশগুলোর মতে, বহু বছর ধরে ইরান স্বাভাবিক পারমাণবিক গবেষণা কর্মসূচির আড়ালে গোপনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ ও পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সূচনা ১৯৭০-এর দশকে শাহ শাসনামলে। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সহায়তায় একটি বৃহৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ১৯৬৭ সালে তেহরানে একটি গবেষণা চুল্লি স্থাপন করা হয় এবং ১৯৭৪ সালে ২৩,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব এবং পরবর্তী ইরান-ইরাক যুদ্ধ এই অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়। যুদ্ধের ফলে পারমাণবিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিদেশি সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৯০-এর দশকে ইরান পুনরায় তার পারমাণবিক কর্মসূচি চালু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ইরান তা গোপনে পরিচালিত করে আসছে। রাশিয়া, চীন ও পাকিস্তানের সহায়তায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রযুক্তি সংগ্রহ করে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা অভিযোগ করে আসছে, ইরান পাকিস্তানের পরমানু বিজ্ঞানী ড. আবদুল কাদির খানের নেটওয়ার্ক থেকে গ্যাস-কেন্দ্রাতিগ যন্ত্রের নকশা ও উপকরণ সংগ্রহ করেছে। তাদের অভিযোগ ইরান ‘আমাদ পরিকল্পনা’ নামে একটি গোপন প্রকল্প চালু করে, যার উদ্দেশ্য ছিল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা। এই প্রকল্পের নেতৃত্বে ছিলেন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির জনক মোহসেন ফাখরিজাদেহ।

২০০২ সালে ইরানের দুটি গোপন পারমাণবিক স্থাপনাÑ নাতাঞ্জে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং আরাকে ভারী পানির প্রকল্প প্রকাশ পায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা তদন্ত শুরু করে এবং পশ্চিমা বিশ্বের ধারণানির্ভর ইরানের গোপন কার্যক্রম প্রকাশ্যে আসে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০০৩ সালে ইরান ‘আমাদ পরিকল্পনা’ বন্ধ ঘোষণা করলেও বাস্তবে অস্ত্র-সংক্রান্ত গবেষণা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার হয় এবং ২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্ব শক্তিগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সীমিত করতে সম্মত হয় এবং আন্তর্জাতিক তদারকি মেনে নেয়। এর বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত অনেক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায় এবং পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ধীরে ধীরে চুক্তির শর্ত মানা কমিয়ে দেয় এবং ২০২০ সালে ঘোষণা করে যে তারা আর কোনো সীমাবদ্ধতা মানবে না। একই বছরের ২৭ নভেম্বর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির জনক মোহসেন ফাখরিজাদেহকে হত্যার পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির গতি আরও বৃদ্ধি পায়।

এ ছাড়া ২০২২ সালে ইরানে বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সমর্থন দেওয়ার কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আরও খারাপ হয় এবং কূটনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।

এদিকে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখে এবং ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ করে। প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে প্রায় ০.৭ শতাংশ U-235 থাকে এবং ৯৯ শতাংশেরও বেশি থাকে U-238।

ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো অত্যন্ত বিস্তৃত এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য। নাতাঞ্জ ও ফোর্ডো কেন্দ্র ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য ব্যবহৃত হয়। ফোর্ডো কেন্দ্র পাহাড়ের নিচে অবস্থিত হওয়ায় এটি অত্যন্ত সুরক্ষিত। অন্যদিকে আরাকের ভারী পানির চুল্লি প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি করে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধে তাদের বিমান হামলায় এসব গবেষণা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে। 

জাতিসংঘের অধীন আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এখন বিপুল পরিমাণ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ করেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা ভূগর্ভস্থ স্থাপনাতেও সংরক্ষণ করছে। 

এই আশঙ্কা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায়। ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও দূতাবাসগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এদিকে দীর্ঘ এক মাসের যুদ্ধে ইরান তাদের শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা দেখিয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিমান হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতল্লাহ খামেনিসহ প্রায় ১৫ শতাধিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। 

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কতটা আধুনিক এবং সশস্ত্র?

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও বহুমুখী। অনেক ক্ষেপণাস্ত্র এত বড় যে এগুলোতে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র রাখা সম্ভব। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইরান ২০০৩ সালের শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি এবং তা শাহাব-৩ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা চালাচ্ছিল। বর্তমানে ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র নেই, কিন্তু তার ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ২,০০০ কিমি পর্যন্ত অস্ত্র বহন করতে সক্ষম। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়ায় (প্রায় ৪,০০০ কিমি দূরে) মার্কিন/ব্রিটিশ ঘাঁটিতে হামলার চেষ্টা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের আরও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে। 

ইরানের আধুনিক অস্ত্র কর্মসূচির সূচনা হয় ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়। প্রথম দিকে ইরান ছোট পরিসরের স্কাড ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র আমদানি ও উৎপাদনে মনোনিবেশ করেছিল। ১৯৮৫ সালে ইরান লিবিয়া, সিরিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং চীনের সঙ্গে সমঝোতা করে স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট উপাদান এবং প্রযুক্তি সংগ্রহ করে। ১৯৮৫ সালে স্কাড বি আমদানি করে লিবিয়া থেকে। পরিসর ২৮০-৩০০ কিমি, ওজন ৭৭০-১,০০০ কেজি। ১৯৯১ সালে স্কাড সি উত্তর কোরিয়া থেকে আমদানি করে। পরিসর প্রায় ৫০০ কিমি। প্রথমে ইরান ‘মুশক’ নামে স্বদেশি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে, যার পরিসর ১৩০-১৬০ কিমি। পরবর্তীতে দেশীয় গবেষণায় সেজ্জিল ও খোররামশাহরর মতো উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে। ২০০০-এর পর ড্রোন প্রযুক্তিতে অগ্রগতি ঘটে, যার ফল শাহেদ সিরিজ। বাভার-৩৭৩ একটি উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা শত্রু বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও ধ্বংস করতে পারে। এ ছাড়া খোরদাদ-১৫ মাঝারি পাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা একাধিক লক্ষ্যবস্তু একসাথে মোকাবিলা করতে সক্ষম। কিছু ক্ষেত্রে তারা রাশিয়ার এস-৩০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ব্যবহার করে, যা উচ্চ উচ্চতায় উড়ন্ত লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করতে কার্যকর।

২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ২,৫০০-৩,০০০, সঙ্গে অজানা সংখ্যক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অনুমান করেছিল প্রায় ২,৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র। কিছু স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বলছেন, এ সংখ্যা ৬,০০০ পর্যন্ত হতে পারে। 

ইরানের সামরিক শক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর, যারা এসব অস্ত্র পরিচালনা ও কৌশলগত অভিযান পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা পালন করে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা