প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৮ এএম
তৃতীয়বারের মতো ‘নো কিংস’ বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: দ্য আটলান্টিক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন তার বিরুদ্ধে তৃতীয়বারের মতো ‘নো কিংস’ বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। আগ্রাসী অভিবাসনবিরোধী নীতি এবং ইরানে যুদ্ধসহ ট্রাম্পের আরও কয়েকটি নীতির প্রতিবাদে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি, নিউইয়র্ক, শিকাগো, ভার্জিনিয়া, মিনেসোটা, লুইসভিল, ন্যাশভিলসহ বড় শহরগুলোতে এই ‘নো কিংস’ বিক্ষোভ মিছিল আয়োজিত হয়েছে।
এদিন যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যের ৩ হাজার ২০০টির বেশি জায়গায় বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আগের দুটো বিক্ষোভে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। তবে এবার সবচেয়ে বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় মিছিল হয়েছে নিউইয়র্ক, টেক্সাসের ডালাস, পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়া ও ওয়াশিংটনে, যদিও দুই-তৃতীয়াংশ মিছিলের আয়োজন হয়েছে বড় বড় শহরের বাইরে। আয়োজকরা বলেছেন, গত বছরের জুনে প্রথমবার ‘নো কিংস’ বিক্ষোভের তুলনায় ছোট ছোট শহরগুলোতে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
আয়োজকরা বলছেন, তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন, যার মধ্যে রয়েছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগ ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। তারা বলেছেন, ‘ট্রাম্প একজন স্বৈরাচারী হিসেবে আমাদের ওপর কর্তৃত্ব করতে চান। কিন্তু এটা আমেরিকা, আর ক্ষমতার মালিক জনগণÑ রাজা হতে চাওয়া কোনো ব্যক্তি কিংবা তাদের ধনকুবের বন্ধুদের হাতে ক্ষমতা থাকে না এখানে।’
মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের রাজধানী সেন্ট পলের বাইরে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাম্পের আগ্রাসী অবৈধ অভিবাসননীতির কারণে এ অঙ্গরাজ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সেখানে বিক্ষোভ মিছিলে অনেকেই নানা ধরনের পোস্টার উঁচিয়ে ধরেছিলেন। কারও কারও পোস্টারে রেনি গুড ও অ্যালেক্স প্রেটির ছবি দেখা গেছে। এ বছর মিনিয়াপলিসে ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা এই দুজনকে গুলি করে হত্যা করেন। জনসভায় মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালৎস বলেন, ট্রাম্প ও তার নীতির বিরুদ্ধে তারা যে প্রতিবাদ করছেন, সেটাই প্রমাণ করেÑ তারাই যুক্তরাষ্ট্রের ভালো দিকগুলোর আসল শক্তি। তিনি আরও বলেন, ‘তারা আমাদের কট্টরপন্থী বলেন। আপনারা একদম ঠিক বলেন, আমরা কট্টরপন্থী, আমরা সত্যই প্রভাবিত হয়েছিÑ মানবিকতা দ্বারা প্রভাবিত, শালীনতা দ্বারা প্রভাবিত, ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত, গণতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যা কিছু করা সম্ভব, তা করতে আমরা প্রভাবিত হয়েছি।’
ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও মিনেসোটায় বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এই দেশকে স্বৈরাচার বা অলিগার্কদের দিকে পতিত হতে দেব না। এদেশে জনগণের শাসন থাকবে।’
নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে এদিন প্রায় লাখো মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এখানে বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজকদের একজন ছিলেন বিখ্যাত হলিউড অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের আগে আর কোনো প্রেসিডেন্ট আমাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে এতটা অস্তিত্বের সংকটে ফেলেননি।’
৫৪ বছর বয়সী হলি বেমিস বলেন, তিনি ও নিউইয়র্কে প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণকারী অন্যরা সেই একই চেতনায় কাজ করছেন, যেভাবে তাদের পূর্বপুরুষেরা আমেরিকান বিপ্লবে লড়াই করেছিলেন। এই নারী বলেন, ‘আমরা রাজাদের শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছি এবং আমরা স্বাধীনতার জন্য লড়েছি। এখন আমরা আবারও ঠিক সেই কাজই করছি।’
ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলে প্রতিবাদে জড়ো হওয়া লোকজন গণতন্ত্রের সমর্থনে স্লোগান দেন। এ সময় তারা ট্রাম্পবিরোধী প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেন। মেরিল্যান্ডে একদল বয়স্ক মানুষ হুইলচেয়ারে বসে হাতে প্ল্যাকার্ড ধরে প্রতিবাদ জানান। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিলÑ ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন’, ‘গণতন্ত্র চাইলে আওয়াজ তুলুন’ এবং ‘ট্রাম্পকে বিদায় দিন’। ডালাসে অনুষ্ঠিত সমাবেশে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে ‘নো কিংস’ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে তাদের বিপরীতে অবস্থান নেওয়া দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রতিবাদে অংশ নেন অবসর জীবনে যাওয়া টেরেসা গানের। তিনি বলেন, তিনি এতে অংশ নিয়েছেন কারণÑ সবারই স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও লোভের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। টেরেসা বলেন, ‘ট্রাম্প যা কিছু করছেন, তার সবই নিজেকে আরও ধনী করতে এবং সাধারণ মার্কিনদের কাছ থেকে সম্পদ কেড়ে নিতে।’
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, প্রায় এক হাজার ‘দাঙ্গাকারী’ একটি ফেডারেল ভবন ঘিরে রাখার সময় দুজনকে ফেডারেল আইন প্রয়োগকারীদের ওপর হামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগ সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছে, ফেডারেল কারাগারের আশপাশের এলাকা থেকে সরে না যাওয়ার কারণে একাধিক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেখানে বিক্ষোভকারীরা একটি বেড়ার ওপার থেকে ইট-পাটকেল ছুড়লে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে।
এদিকে হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র এই প্রতিবাদকে ‘ট্রাম্প ডিরেঞ্জমেন্ট থেরাপি সেশন’ অর্থাৎ মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষের থেরাপি সেশন বলে অভিহিত করেছেন, এবং বলেছেন, একমাত্র সাংবাদিকরাই এ বিষয়টি নিয়ে আগ্রহীÑ ‘যাদেরকে সংবাদ প্রচারের জন্য টাকা দেওয়া হয়’।