প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০২৬ ১৯:৫৭ পিএম
আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৬ ১২:৫৭ পিএম
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান অস্থিরতার মধ্যে ভারত কৌশলগত ভারসাম্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ স্থাপন করেছে। সংলাপকে প্রাধান্য দিয়ে এবং কোনো একক শক্তির পক্ষে অবস্থান না নিয়ে, নয়াদিল্লি তার দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ভারতের এই অবস্থান দেশটির “স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি” বা স্বাধীন কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে তুলে ধরছে।
গত কয়েক বছরে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা জোরদার হলেও, বর্তমান সংকটে ভারত সরাসরি কোনো পক্ষ নেয়নি। বরং পুরো অঞ্চলের সঙ্গে সক্রিয় কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখেছে। কারণ, উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রায় এক কোটি ভারতীয় কর্মরত রয়েছেন, যা ভারতের জন্য অর্থনৈতিক ও মানবিক—উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন এবং মার্চের শুরুতে অনুষ্ঠিত ‘রাইসিনা ডায়ালগ’-এ ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ৯ মার্চ সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, উত্তেজনা প্রশমনে সংলাপ ও কূটনীতিই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একই সঙ্গে তিনি বিদেশে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন।
সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে ইতোমধ্যে হাজার হাজার ভারতীয়কে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসা রেমিট্যান্স ভারতের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, ফলে ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ভারতের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাও ভারতের এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের অন্যতম কারণ। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার, এবং এখান থেকেই আসে দেশের অধিকাংশ তেল ও গ্যাস। ফলে এ অঞ্চলে সংঘাত বৃদ্ধি পেলে তা ভারতের অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে ভিন্ন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে আকাশপথ ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। এর বিপরীতে, ভারত নিজস্ব স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং ইরানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো চালু রেখেছে।
ভারতের জন্য ইরানের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। ইরান মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান ও ইউরোপের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। ‘ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর’ এবং চাবাহার বন্দর প্রকল্প ভারতের আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রকল্প সচল রাখতে ভারত ইতোমধ্যে নিষেধাজ্ঞা শিথিলতার সুবিধাও পেয়েছে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান সংকটে ভারতের কৌশলগত ভারসাম্য, সংলাপভিত্তিক কূটনীতি এবং বহুমুখী সম্পর্ক রক্ষার নীতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি পরিপক্ব ও বাস্তবধর্মী অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।