প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬ ১১:১৭ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে দেশটির নৌবাহিনী।
প্রাথমিকভাবে আগুনের কারণ অজানা থাকলেও, নাশকতার সম্ভাবনাও এখন তদন্তের আওতায় এসেছে।
জাহাজটিতে গত বৃহস্পতিবার আগুন লাগার পর নিয়ন্ত্রণে আনতে ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। পথ ধরেছে বলে জানায় যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস।
আগুনের ঘটনা ও তাৎক্ষণিক প্রভাব
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, জাহাজের মূল লন্ড্রি কক্ষ থেকেই আগুনের সূত্রপাত। এতে অন্তত তিনজন নাবিক আহত হন, যাদের মধ্যে একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, আগুনটি সংঘাত-সম্পর্কিত নয় এবং পরে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
তবে পরবর্তী প্রতিবেদনে জানা যায়, আগুনটি জাহাজের বায়ুচলাচল ব্যবস্থার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং আবাসিক অংশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে। ধোঁয়ার কারণে বহু নাবিক শ্বাসকষ্টে ভুগেছেন।
দীর্ঘ মোতায়েন ও মানসিক চাপ
নিয়ম অনুযায়ী গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপিয়ান কমান্ডের অধীনে মোতায়েন হয় জেরাল্ড ফোর্ড। কিন্তু অক্টোবরে হুট করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ রণতরীটিকে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে যেতে নির্দেশ দেন, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘সাউদার্ন স্পিয়ার ‘ অভিযানে সহায়তা করতে।
ওই অভিযানে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পর ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ক্রুদের জানানো হয়, মার্চের শুরুর দিকেই তারা বাড়ি ফিরতে পারতে পারবেন।
কিন্তু এর ১২ ঘণ্টার মধ্যেই নির্দেশ বদলে যায়। রণতরীটিকে এবার পাঠানো হয় ভূমধ্যসাগরে, পরে লোহিত সাগরে, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে সহায়তা দিতে।
তাদের মোতায়েনকাল ১১ মাসে পৌঁছাতে পারে বলে সেনেটের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটিকে বলেছিলেন ভাইস চিফ অব নেভাল অপারেশনস অ্যাডমিরাল জেমস কিলবি; ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর আর কোনো রণতরীকে এতটা দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটাতে হয়নি।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে বেশি সময় সমুদ্রে মোতায়েন থাকার রেকর্ড আপাতত ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের, ২৯৪ দিন। ১২ মার্চ আগুন লাগার দিন ফোর্ডের মোতায়েনকাল চলছিল ২৬২ দিন; মে-র শুরু পর্যন্ত থাকলে এটি ৩৩০ দিনের কাছাকাছি পৌঁছে যেত, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে পারত যুদ্ধকালীন টনকিন উপসাগরে মোতায়েন থাকা রণতরীর রেকর্ডের সঙ্গে।
তবে প্রস্তুতিবিহীন এ দীর্ঘ সময় যে বেশ ক্ষতিকর, জানুয়ারিতেই সারফেস নেভি অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সিম্পোজিয়ামে সতর্ক করেছিলেন নেভাল অপারেশনসের প্রধান অ্যাডমিরাল ডেরিল কডলে।
“মেয়াদ বাড়ানোর ভক্ত নই আমি। প্রথমত, আমি নাবিক-প্রথম সিএনও (নেভাল অপারেশনস প্রধান)। ৭ মাসের মোতায়েনে যাওয়ার আগে লোকজন কিছু নিশ্চয়তা চায়। ওই সময়সীমা পেরিয়ে গেলে তা জীবনযাত্রায় ছন্দপতন ঘটায়। কোথাও শেষকৃত্য, কোথাও বিয়ের পরিকল্পনা, বাচ্চা নেওয়া সবখানেই ব্যাঘাত ঘটে,” সাংবাদিকদের এমনটাই বলেছিলেন তিনি।
তবে তার এসব আপত্তি ধোপে টেকেনি।
দীর্ঘকাল সমুদ্রে অবস্থান যে নাবিকদের মনস্তত্ত্বেও বিরাট প্রভাব ফেলে তা স্বীকার করে নিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ টুয়েলভের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল পল লানজিলোতাও।
“ক্লান্তি জমতে থাকে এবং বাড়ি থেকে দূরে থাকার ভার নাবিকদের উপর চাপ সৃষ্টি করে। নেতা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের সহায়তা নিশ্চিত করা—যেন জাহাজে থাকা অবস্থায় তারা সব ধরনের সেবা পান, স্পষ্ট যোগাযোগ, নিয়মিত আলোচনা করা,” ফেব্রুয়ারিতে এক বিবৃতিতে এমনটাই বলেছিলেন লানজিলোতা।
আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর জেরাল্ড ফোর্ডে থাকা এক নাবিকের অভিভাবক ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওকে (এনপিআর) বলেছিলেন, “তারা ক্লান্ত। আগুন অবশ্যই তাদের মনোবলে প্রভাব ফেলেছে, শেষবার মেয়াদ বৃদ্ধির তুলনায় মনোবল অনেক কমিয়েছে।
দেশটির নৌবাহিনীর কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকা নাবিকদের মনোবল কমিয়ে দেয় এবং কর্মক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে। এক নাবিকের অভিভাবক সংবাদমাধ্যমকে জানান, “তারা খুব ক্লান্ত। এই আগুন তাদের মনোবল আরও ভেঙে দিয়েছে।”
নাশকতার সন্দেহ কেন?
তদন্তে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই আগুন কি ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়েছিল? কিছু সূত্র বলছে, দীর্ঘ মোতায়েনের চাপ থেকে মুক্তি পেতে কোনো ক্রু সদস্য ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগিয়ে থাকতে পারেন।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কিছু বলেনি, তবে তারা নিশ্চিত করেছে যে আগুনের উৎস ও কারণ নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ এড়াতেই নাবিকরা ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগিয়েছে।
তবে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, এই দাবি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে এবং তা যাচাই ছাড়াই গ্রহণযোগ্য নয়।
জেরাল্ড ফোর্ডের অগ্নিকাণ্ডটি দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত নাশকতা—তা এখনও স্পষ্ট নয়। তদন্তের ফলাফলই নির্ধারণ করবে, এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা ছিল, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো কারণ লুকিয়ে আছে।