প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬ ০৯:১৩ এএম
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধ ভাঙার প্রচেষ্টায় শক্তিশালী সামরিক সহায়তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ন্যাটো মিত্র ও অংশীদারদের সমালোচনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হরমুজ প্রণালীর জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর নতুন প্রটোকল বা চুক্তিনামা তৈরি করা উচিত বলে মনে করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। আলজাজিরাকে বুধবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেছেন, এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে এবং যাতে ইরান ও আঞ্চলিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্দিষ্ট শর্তাধীনে পরিচালিত হয়, সেজন্য এটি করা উচিত। আর ইরানের পরমাণু নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেও জানান তিনি।
ইসরায়েলি হামলায় নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি ও আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ কমান্ডার গোলামরেজা সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর ইরান ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে বলে জানান আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেন, তেহরানের রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থা এখনও শক্তিশালী আছে।
ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলো সৌদি আরব, কুয়েত ও জর্ডানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোয় এই সংঘাত ক্রমেই পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। আলজাজিরা জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার হামলায় ইসরায়েলের রামাৎ গানে দুজন নিহত হওয়ার পর যুদ্ধের ১৯তম দিন বুধবার দেশটিতে ইরান আরও হামলা চালালে সেখানে সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বুধবার জানিয়েছেন, রাতভর এক হামলায় ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খাতিবকে হত্যা করা হয়েছে। তবে এই মৃত্যুর খবরের বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখনও কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে রয়টার্স জানিয়েছে। কাৎজ আরও বলেছেন, তিনি ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সামরিক বাহিনীকে অনুমতি দিয়েছেন, লক্ষ্যবস্তুতে থাকা অন্য যেকোনো ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তাকে হত্যার জন্য নতুন করে আর কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই।
এদিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সচল করার লক্ষ্যে প্রথম বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোতে শক্তিশালী ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের উপকূলরেখা বরাবর অবস্থিত সুসংহত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি লক্ষ্য করে ৫০০০ পাউন্ড (প্রায় ২২৬৮ কেজি) ওজনের একাধিক ‘ডিপ পেনিট্রেটর’বা বাঙ্কার বাস্টার বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে, কারণ দেশটির ঊর্ধ্বতন কাউন্টার-টেরোরিজম কর্মকর্তা জো কেন্ট পদত্যাগ করেছেন এবং বলেছেন, “আমরা এই যুদ্ধ শুরু করেছি ইসরায়েল এবং তাদের শক্তিশালী আমেরিকান লবির চাপে।”
এদিকে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধ ভাঙার প্রচেষ্টায় শক্তিশালী সামরিক সহায়তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো মিত্র ও অংশীদারদের সমালোচনা করেছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে একের পর এক ইরানের শীর্ষ নেতা ও কর্মকর্তাদের হত্যা করে চলেছে ইসরায়েল। মঙ্গলবার দেশটির হামলায় ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি, বাসিজ কমান্ডার গোলামরেজা সোলেইমানি এবং যুদ্ধের ১৯তম দিন বুধবার গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খাতিব নিহত হওয়ার পর তেহরান কঠোর প্রতিশোধের অঙ্গীকার করেছে। বিশেষ করে লারিজানির মতো একজন অভিজ্ঞ ও মধ্যস্থতাকারী নেতাকে হারানোয় যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এবং পার্শ্ববর্তী উপসাগরীয় দেশগুলোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। সৌদি আরব, কুয়েত ও জর্ডানেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ ও সমুদ্রপথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মতো সংস্থাগুলো তাদের ফ্লাইট স্থগিত করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তারা এই প্রণালীর জন্য একটি ‘নতুন প্রটোকল’ বা চুক্তিনামা দাবি করবে, যা আগের অবস্থার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে এবং তাদের শর্তসাপেক্ষে পরিচালিত হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও অস্থিরতা তুঙ্গে; শীর্ষ কাউন্টার-টেরোরিজম কর্মকর্তা জো কেন্ট ইসরায়েলি লবির চাপে এই যুদ্ধ শুরু করার অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ন্যাটো মিত্রদের ওপর সামরিক সহায়তা না দেওয়ার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও জার্মানি ও ফ্রান্স সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকার করেছে এবং কেবলমাত্র যুদ্ধবিরতির পর কূটনৈতিক সমাধানে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
মানবিক দিক থেকে পরিস্থিতি অবর্ণনীয়; ইরানে অন্তত ১,৪৪৪ জন নিহত ও ১৮ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলি স্থল অভিযানের ফলে ১০ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে মারাত্মকভাবেÑ অপরিশোধিত তেলের দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করছে। চীন ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসেই ব্রেটন উডস বা পেট্রোডলার সিস্টেমের সমাপ্তি টানার কাজ শুরু করেছিল, যখন বেইজিং উপসাগরীয় দেশগুলোকে (জিসিসি) সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জে তেল ও গ্যাস কেনাবেচার আমন্ত্রণ জানায়। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চীন পেট্রোডলারের আধিপত্য খর্ব করে ‘পেট্রো-ইউয়ান’ এবং নিজস্ব পেমেন্ট সিস্টেম সিআইপিএস প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার মানচিত্র বদলে দিতে পারে।
রণক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র দেখাচ্ছে, চীন ইরানের যুদ্ধের নিয়মগুলোও বদলে দিয়েছে। ইরানের বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন পুরোপুরি চীনের ‘বেইদু’ স্যাটেলাইট সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। এটিই ব্যাখ্যা করেÑ কেন ইরান এখন নিখুঁতভাবে আঘাত হানছে; আর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন চীনের তৈরি একটি ‘ডিজিটাল টেক’ দেয়ালের (কক্ষপথে ৪০টিরও বেশি বেইদু স্যাটেলাইট) মুখোমুখি হচ্ছে। এর ফলেই ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা বেড়েছে এবং জ্যামিং বা সংকেত বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টার বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়েছে।
চীন তাদের ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে ইরানকে দূরপাল্লার রাডার সরবরাহ করেছে, যা স্যাটেলাইট সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। এর প্রধান ফলাফল হলোÑ আগের ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় এখন ইরানের পাল্টা জবাব দেওয়ার সময় অনেক কমে গেছে। রাশিয়াও সমান্তরালভাবে সাহায্য করেছে, যার ফলে ইউক্রেন যুদ্ধে প্যাট্রিয়ট ও আইআরআইএস-টি এর মতো পশ্চিমা সিস্টেম সম্পর্কে যা শিখেছে, ইরান এখন সেগুলো প্রয়োগ করতে পারছে।