× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইরান ও চীন যেভাবে যুদ্ধের চাল সাজিয়েছে

পেপে এসকোবার, দ্য ক্রেডল

প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬ ২২:৪৪ পিএম

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬ ১৬:৪৫ পিএম

ইরান যুদ্ধে রণক্ষেত্র মধ্যপাচ্য। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ইরান যুদ্ধে রণক্ষেত্র মধ্যপাচ্য। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

চীন এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া এপস্টাইন সিন্ডিকেট বা মার্কিন-ইসরায়েলির যুদ্ধের জবাব দিচ্ছে দুটি সমান্তরাল পথে—একটি কূটনৈতিক ও অন্যটি সামরিক মুখপাত্রের মাধ্যমে। এর সহজ মানে হলো, চীন এই যুদ্ধকে একইসঙ্গে চরম রাজনৈতিক-কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং একটি সামরিক হুমকি হিসেবে দেখছে।

চীনের সামরিক মুখপাত্র, যিনি পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) একজন কর্নেল, তিনি রূপক ব্যবহার করে কথা বলেন। তিনিই স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘যুদ্ধে আসক্ত’; তাদের ২৫০ বছরের ইতিহাসে মাত্র ১৬ বছর তারা শান্তিতে ছিল। তিনি খুব পরিষ্কারভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। এবং অবশ্যই, একটি নৈতিক হুমকি হিসেবেও।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মার্ক্সবাদ ও কনফুসীয়বাদের মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক স্থাপনের দিকে গভীরভাবে মনোনিবেশ করছেন। রাজনৈতিক চিন্তাধারায় কনফুসিয়াসের প্রধান অবদান হলো ভাষার সঠিক ব্যবহার। কেবল তিনিই একটি রাষ্ট্র শাসন করতে সক্ষম, যিনি সঠিক রূপক ও নৈতিক ওজন নিয়ে কথা বলতে পারেন।

তাই ইরানের ওপর এই চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে চীন খুব সাবধানে একটি স্থির নৈতিক ও নীতিগত সমালোচনা গড়ে তুলছে। তারা জোর দিয়ে বলছে, এটি এমন একটি জাতির আক্রমণ, যারা তাদের নৈতিক দিকনির্দেশনা হারিয়ে ফেলেছে। গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ গোলার্ধের উন্নয়নশীল দেশগুলো এই বার্তা পুরোপুরি বুঝতে পারছে।

পাশাপাশি, রণক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র দেখাচ্ছে যে চীন ইরানের যুদ্ধের নিয়মগুলোও বদলে দিয়েছে। ইরানের বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন পুরোপুরি চীনের ‘বেইদু’ স্যাটেলাইট সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। এটিই ব্যাখ্যা করে—কেন ইরান এখন নিখুঁতভাবে আঘাত হানছে; আর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন চীনের তৈরি একটি ‘ডিজিটাল টেক’ দেয়ালের (কক্ষপথে ৪০টিরও বেশি বেইদু স্যাটেলাইট) মুখোমুখি হচ্ছে। এর ফলেই ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা বেড়েছে এবং জ্যামিং বা সংকেত বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টার বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়েছে।

চীন তাদের ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্বের অংশ হিসেবে ইরানকে দূরপাল্লার রাডার সরবরাহ করেছে, যা স্যাটেলাইট সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। এর প্রধান ফলাফল হলো—আগের ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় এখন ইরানের পাল্টা জবাব দেওয়ার সময় অনেক কমে গেছে।

রাশিয়াও সমান্তরালভাবে সাহায্য করেছে, যার ফলে ইউক্রেন যুদ্ধে প্যাট্রিয়ট ও আইআরআইএস-টি এর মতো পশ্চিমা সিস্টেম সম্পর্কে যা শিখেছে, ইরান এখন সেগুলো প্রয়োগ করতে পারছে। এটি কেবল ড্রোন দিয়ে ছেয়ে ফেলার কৌশল নয়; বরং ড্রোন ঝাঁকের সঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বয় করার ‘রুশ পদ্ধতি’ শেখার বিষয়। আর অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪-এর শেষ পর্যায়ে ঠিক এটাই বিধ্বংসী প্রভাব ফেলছে।

চালের লক্ষ্য পেট্রো-ইউয়ান  

এবার নজর দেওয়া যাক হরমুজ প্রণালীর সেই গুরুত্বপূর্ণ চালটির দিকে। মূল চালটি হলো—ইরান কেবল সেই সব তেল ট্যাঙ্কার চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে যেগুলোর তেলের দাম পেট্রো-ইউয়ানে শোধ করা হয়েছে। কোনো ডলার নয়। কোনো ইউরো নয়। শুধু ইউয়ান।

প্রকৃতপক্ষে, চীন ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসেই ব্রেটন উডস বা পেট্রোডলার সিস্টেমের সমাপ্তি টানার কাজ শুরু করেছিল, যখন বেইজিং উপসাগরীয় দেশগুলোকে (জিসিসি) সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জে তেল ও গ্যাস কেনাবেচার আমন্ত্রণ জানায়। এখন উপরের এই সবকিছুর সঙ্গে বেইজিংয়ে সদ্য অনুমোদিত চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটি মিলিয়ে দেখুন।

এটি একটি গভীর পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গি। খুব সামগ্রিকভাবে বেইজিংয়ের পরিকল্পনাকারীরা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে নির্ধারণ করেছেন; ডিজিটাল অর্থনীতিকে জিডিপির ১২.৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া; সবুজ জ্বালানি ২৫ শতাংশে; পানির গুণমান ৮৫ শতাংশে; এবং বিপুল পরিমাণ উচ্চ-মূল্যের পেটেন্ট—এই সবকিছুর জন্য ২০৩০ সাল পর্যন্ত কঠোর লক্ষ্যমাত্রা ও বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।

এর মানে হলো চীনারা অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে একটি সুস্থ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মতো বিবেচনা করছে। এভাবেই নগরায়ন উৎপাদনশীলতাকে বাড়ায়—গবেষণায় প্রচুর বিনিয়োগ পেটেন্ট তৈরি করে; পেটেন্ট ডিজিটাল অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে; আর সবুজ জ্বালানি কৌশলগত স্বাধীনতা দেয়।

সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটি চূড়ান্তভাবে দেখাচ্ছে যে চীন কীভাবে মেটিকুলাস বা সূক্ষ্ম পরিকল্পনার মাধ্যমে আগামী দিনের প্রযুক্তির নেতা হতে চাইছে। আর এটি কেবল ২০৩০ নয়, বরং এই শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত লক্ষ্য নিয়ে করা।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বর্তমান ব্যবস্থা পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়ায় পেট্রোডলার ধ্বংস করা যে একটি মূল ভূমিকা পালন করছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ইরান এখন এটি চীনের হাতে থালায় সাজিয়ে তুলে দিচ্ছে—বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ, যেখান দিয়ে ২০ শতাংশ তেল যায়, সেখানে পেট্রোডলারের বদলে পেট্রো-ইউয়ান চালু করে।

ইরানের এই চালটি সামরিক নয়; এটি অর্থনৈতিকভাবে ‘পারমাণবিক’। ব্যাপারটি আরও সহজ হয়ে গেছে কারণ ইরান ইতিমধ্যেই গ্লোবাল সাউথের বাকি দেশগুলোর জন্য একটি মডেল তুলে ধরেছে। তেহরানের অশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এখন সুইফটের বিকল্প চীনের নিজস্ব আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম- সিআইপিএসের মাধ্যমে ইউয়ানে শোধ করা হয়।

গ্লোবাল সাউথ শেষ পর্যন্ত এই সহজ মডেলটি গ্রহণ করতে পারে। তেহরান বলছে না যে হরমুজ প্রণালী বন্ধ। এটি কেবল বৈরী এপস্টাইন সিন্ডিকেট অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের অনুসারীদের জন্য বন্ধ যারা পেট্রোডলারে ব্যবসা করে। জাহাজ চলাচলের পথগুলো এখন রিয়েল টাইমে রাজনৈতিক ফিল্টারে পরিণত হচ্ছে। গ্লোবাল সাউথ যখন পেট্রো-ইউয়ানের দিকে ঝুঁকবে, তখন ১৯৭৪ সাল থেকে চলা আধিপত্যশালী পেট্রোডলার মুখ থুবড়ে পড়বে।

এতদিনে পৃথিবীর প্রতিটি ব্যবসায়ী জানে পেট্রোডলার কীভাবে কাজ করে। ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের পর, ১৯৭৪ সালে ওপেকের দেশগুলো রাজি হয়েছিল যে তেলের লেনদেন শুধু মার্কিন ডলারে হবে। তেল রপ্তানিকারকদের অবশ্যই তাদের ডলারের মুনাফা পুনরায় মার্কিন ট্রেজারি বন্ড ও শেয়ারে বিনিয়োগ করতে হয়। এটি রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ডলারের ভূমিকাকে শক্তিশালী করে; যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও সামরিক শিল্পকে অর্থায়ন করে; তাদের চিরস্থায়ী যুদ্ধগুলোকে সাহায্য করে; এবং সবচেয়ে বড় কথা, যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত ঋণের বোঝা বইতে সাহায্য করে।

চীন, রাশিয়া ও ইরান—ব্রিকস সদস্য হিসেবে বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম তৈরির অগ্রভাগে রয়েছে; যার প্রধান কাজ হলো পেট্রোডলারকে এড়িয়ে চলা। তাই এটি কেবল তেলের নিয়ন্ত্রণের চেয়েও বড় কিছু—যে তেলের দোহাই দিয়ে ইরানের ওপর এই অপরিকল্পিত ‘অভিযান’ (ট্রাম্পের ভাষায়) চালানো হচ্ছে।

বাস্তবিকভাবে দেখলে, মাঠের পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই ‘বিরাট ব্যর্থতা’ হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে। পাল্টা আঘাতটি একদম অন্য স্তরে পৌঁছে গেছে।

সুন জুর কৌশল ব্যবহার আইআরজিসির

হরমুজ প্রণালীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা মূলত প্রাচীন চীনের একজন সমরনায়ক ও দার্শনিক সুন জুর কৌশল, যা ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) নিজেদের মতো করে সাজিয়েছে। এখন যাতায়াত করিডোর হরমুজ প্রণালী ও মুদ্রা ইউয়ান—উভয়ই সাম্রাজ্য ধ্বংসের অস্ত্র। এখন আর কার পারমাণবিক বোমার দরকার?

এখানে আসল লড়াই হলো ২০৩০ এবং তার পরের বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। আমরা যা দেখছি তা হলো পারস্যরা দাবা খেলছে, যাতে তারা পারদর্শী; তবে তার সঙ্গে চীনের ‘ওয়েই-ছি’ বা গো গেমের উপাদান মিশিয়ে।

‘গো’ খেলাটি হলো ধীরস্থির ও জৈবিক। এই খেলায় ব্যবহৃত ছোট পাথরগুলো যখন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তারা পুরো বোর্ডে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে। আমাদের ক্ষেত্রে এটি ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক দাবার বোর্ড। এটি পুরোটাই অবস্থান নেওয়া, ধৈর্য ধরা, সুবিধা বাড়ানো ও কৌশল পরিচালনার বিষয়।

এটাই হলো সেই ‘গোপন রহস্য’ যে কেন ইরানের এই যুদ্ধ এখন চীনকে এক চূড়ান্ত চাল দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। বেইজিং বছরের পর বছর ধরে অসীম ধৈর্যের সঙ্গে এই দাবার বোর্ড সাজিয়েছে—বিভিন্ন বহুপাক্ষিক সংস্থা তৈরি করা; ব্রিকস ও এসসিওতে মূল ভূমিকা রাখা; নিউ সিল্ক রোড (বিআরআই) তৈরি করা; বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা এবং তাদের কূটনীতিকে শক্তিশালী করা।

‘গো’ খেলাটি অত্যন্ত যুক্তিচালিত। আপনি যদি বোর্ডটি সঠিকভাবে সাজান, তবে আপনি ব্যর্থ হবেন না। গেমটি নিজেই নিজেকে চালিয়ে নেবে। আমরা এখন ঠিক সেই পর্যায়ে আছি। আর একারণেই সেই সাম্রাজ্যবাদী বাগাড়ম্বরকারী মার্কিন প্রশাসন, তার চাটুকার ও অনুসারীরা স্তম্ভিত এবং পাথরের মতো জমে গেছে; তারা আসলে নিজেদের ঔদ্ধত্যের চোরাবালিতে বন্দী। 

[পেপে এসকোবার দ্য ক্রেডলের একজন কলামিস্ট, এশিয়া টাইমসের এডিটর-অ্যাট-লার্জ এবং ইউরেশিয়া বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একজন স্বাধীন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে তিনি লন্ডন, প্যারিস, মিলান, লস অ্যাঞ্জেলেস, সিঙ্গাপুর ও ব্যাংককে বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে বসবাস ও কাজ করেছেন। তিনি অসংখ্য বইয়ের লেখক; তার সর্বশেষ বইটির নাম ‘রেইজিং টোয়েন্টিজ।] 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা