প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬ ২০:২৮ পিএম
আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৬ ০১:২০ এএম
আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্তে চলমান সহিংস সংঘর্ষ পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ঠিক এই সময়েই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কর্মসূচির তৃতীয় পর্যালোচনার জন্য দেশটিতে অবস্থান করছে আইএমএফ-এর একটি প্রতিনিধি দল।
এই পর্যালোচনা সফল হলে পাকিস্তান আইএমএফের উদ্ধার তহবিলের পরবর্তী কিস্তি পেতে পারত এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারত। কিন্তু সীমান্তে বিমান ও ড্রোন হামলাসহ পাল্টাপাল্টি আক্রমণে কয়েক ডজন মানুষের প্রাণহানি এবং টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে সংঘর্ষ চলতে থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ উদীয়মান বাজার অর্থনীতিবিদ ক্যালি ডেভিস বলেন, “সাম্প্রতিক হামলার সময়টা অত্যন্ত অস্বস্তিকর। আইএমএফ কর্মকর্তারা এখন পাকিস্তানে অবস্থান করছেন এবং তৃতীয় পর্যালোচনা নিয়ে আলোচনা করছেন, যা পরবর্তী অর্থছাড়ের পথ খুলে দিতে পারে।”
উন্নতির পথে ছিল অর্থনীতি
গত কয়েক মাসে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল। মূল্যস্ফীতি কমছিল এবং দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা ফিরে আসছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষদিকে সীমান্তে গোলাগুলি শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আবার অস্থির হয়ে পড়ে।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পর তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসে। তখন ইসলামাবাদ ধারণা করেছিল যে নতুন কাবুল সরকারকে সমর্থন করলে পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালানো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে হামলার সংখ্যা বরং বেড়ে যায় এবং দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই উত্তেজনার দিকে এগোতে থাকে।
বাণিজ্য ও মূল্যস্ফীতিতে চাপ
গত অক্টোবর থেকে দুই দেশের প্রধান সীমান্ত পারাপার বন্ধ রয়েছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে এবং বাজারে মূল্যচাপ বেড়েছে। ২০২৪ সালে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা পাকিস্তানের মোট বাণিজ্যের প্রায় ২ শতাংশ। তবে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য যোগ করলে প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি। এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতিও আবার বাড়তে শুরু করেছে। ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৭ শতাংশ, যা আগের মাসে ছিল ৫.৮ শতাংশ।
এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সংঘাত বাড়ায় এশিয়াজুড়ে তেল ও গ্যাসের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে পরিবহন ব্যয় ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
আন্তর্জাতিক চাপ ও উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আইএমএফ কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা আবারও কমে যেতে পারে। পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার চীন ও সৌদি আরব এই কর্মসূচির সফলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। তারা কূটনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক উদ্বেগ
প্রতিবেশী ভারতও পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পতন হলে তার প্রভাব পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় পড়তে পারে। এদিকে সংঘর্ষের মানবিক প্রভাবও বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে কয়েক হাজার আফগান নাগরিক নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকলেও আফগানিস্তানের দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। পাশাপাশি পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার এবং দেশটিতে বসবাসরত বিপুল আফগান জনগোষ্ঠী পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে জলবায়ু অভিযোজন, কৃষি উন্নয়ন এবং গ্রামীণ জীবিকার মতো জরুরি খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে—যা দুই দেশের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।