প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬ ১১:০৭ এএম
আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৬ ১১:২১ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোলান্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ছবি: রয়টার্স
ইরানে হামলার শুরু থেকে বিশেষভাবে নজরে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নীরবতা। অতীতে সামরিক অভিযানে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়া ভ্যান্স এবার যেন অনেক বেশি সতর্ক।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরবতার পেছনে থাকতে পারে রাজনৈতিক কৌশল, মতপার্থক্য কিংবা ভবিষ্যৎ রাজনীতির হিসাব।
পূর্বের অভিযানে উচ্ছ্বাস, এবার নীরবতা
গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালানোর পরপরই টেলিভিশনের একটি সানডে শোতে উপস্থিত হয়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সে সময় তিনি অভিযানকে অত্যন্ত সফল হিসেবে তুলে ধরেন। এমনকি এক মিনিটেরও কম সময়ে চারবার ‘অবিশ্বাস্য’ বা ‘অবিশ্বাস্যভাবে’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।
একইভাবে গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে পরিচালিত অভিযানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সেটিকে বৈধ ও প্রয়োজনীয় বলে সমর্থন করেছিলেন।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ইরানে হামলার দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তিনি এখনো প্রকাশ্যে জোরালো সমর্থন জানাননি।
প্রশ্নে এড়িয়ে উত্তর
নর্থ ক্যারোলাইনায় শুক্রবার এক সংবাদকর্মী ভ্যান্সকে প্রশ্ন করেন, যুদ্ধের শুরুতে ও সাম্প্রতিক সময়ে তিনি প্রেসিডেন্টকে কী পরামর্শ দিয়েছেন।
জবাবে ভ্যান্স দীর্ঘ কথা বললেও নিজের মতামত স্পষ্ট করেননি। তিনি বলেন, আমি আপনাদের হতাশ করতে চাই না তবে এখানে সবার সামনে বলতে পারি না যে সেই গোপন কক্ষে ঠিক কী বলেছিলাম।

তিনি আরও বলেন, “একটি কারণ হলো আমি জেলে যেতে চাই না। আরেকটি কারণ হলো, প্রেসিডেন্টকে তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে দেওয়াটা জরুরি, যতক্ষণ না পরামর্শদাতারা সেই কথাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করেন।”
যুদ্ধ নিয়ে ভ্যান্সের অবস্থান
ভ্যান্সের আগের মন্তব্যগুলো দেখলে বোঝা যায়, তিনি সাধারণত বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।
২০২৩ সালে সিনেটর থাকাকালে এক বিশ্লেষণধর্মী লেখায় তিনি বলেন, ট্রাম্পকে অনেক দিক থেকে সফল প্রেসিডেন্ট বলা যায়, কারণ তার আমলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো বড় যুদ্ধে জড়ায়নি।
২০২৪ সালেও ভ্যান্স মন্তব্য করেছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয় এবং এতে বিপুল অর্থ ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হবে।
এর আগে ২০২০ সালে ট্রাম্প যখন এক ইরানি কমান্ডারকে হত্যার নির্দেশ দেন, তখনও সম্ভাব্য যুদ্ধের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন ভ্যান্স।
এমনকি গত বছর ‘সিগন্যাল গেট’নামে আলোচিত ব্যক্তিগত বার্তাগুলোতে দেখা গেছে, তিনি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে হামলার বিষয়ে অনীহ ছিলেন।
সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, ভ্যান্স শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধে জড়ানোর বিরুদ্ধে বলেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে ট্রাম্প সেনা অভিযানকে সমর্থন করছেন, তখন তিনি অবস্থান বদল করেন এবং প্রেসিডেন্টকে দ্রুত ও কঠোর হামলা চালাতে উৎসাহিত করেন।
ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নতুন বাস্তবতা
বর্তমানে ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট। আর ট্রাম্প প্রশাসনে সাধারণত প্রত্যাশা থাকে—ভাইস প্রেসিডেন্টসহ ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা প্রেসিডেন্টের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য দেখাবেন।
এই বাস্তবতায় ভ্যান্সকে প্রকাশ্যে মন্তব্য করা থেকে অনেকটা বিরত থাকতে দেখা যাচ্ছে। তিনি যখনই কথা বলছেন, নিজের মত প্রকাশ না করে বারবার প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের কথাই তুলে ধরছেন।
যেমন—“প্রেসিডেন্ট দেখছেন”, “প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছেন”, “প্রেসিডেন্ট খুব স্পষ্ট”—এ ধরনের বক্তব্যই বেশি শোনা যাচ্ছে তার মুখে।
রাজনৈতিক হিসাবের ইঙ্গিত?
সমালোচকদের মতে, ভ্যান্সের এই সতর্ক অবস্থানের পেছনে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক হিসাব থাকতে পারে।
অনেকেই মনে করেন, তিনি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছেন।
যুদ্ধের শুরু থেকে তার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টেও খুব কম পোস্ট দেখা গেছে।
গত দুই সপ্তাহে তিনি মাত্র আটটি পোস্ট করেছেন, যার বেশির ভাগই নিহত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো বা ট্রাম্পের বক্তব্য শেয়ার করা।
তবে এটাও সত্য যে যুদ্ধ শুরুর আগেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলনামূলক কম সক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন।
মতপার্থক্যের আভাস?
ভ্যান্সের বিষয়ে ট্রাম্প ও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। দুজনের কেউই খুব জোর দিয়ে অস্বীকার করেননি যে ভ্যান্সের অবস্থান প্রেসিডেন্টের থেকে কিছুটা আলাদা।
এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আমি মনে করি না আমাদের মধ্যে বড় কোনো মতভেদ আছে। তবে চিন্তাভাবনার জায়গা থেকে তিনি আমার থেকে একটু ভিন্ন হতে পারেন।
“তিনি হয়তো এই যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়ে কিছুটা কম উৎসাহী ছিলেন, কিন্তু মোটেও অনিচ্ছুক ছিলেন না।”
অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে জেডি ভ্যান্সের এই নীরবতা আপাতত অনেক প্রশ্ন তৈরি করেছে। তিনি কি সত্যিই মতপার্থক্য এড়িয়ে চলছেন, নাকি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখছেন—সেটি হয়তো স্পষ্ট হবে যুদ্ধের সময় যত দীর্ঘ হবে।