প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৯:১১ এএম
তেল আবিবের শোহামে ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বসতবাড়ি। ছবি: এএফপি
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসী অভিযান তৃতীয় সপ্তাহে ভয়াবহ ও চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। ১৫তম দিন শনিবার ইরানের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত খারগ দ্বীপ, যেখান থেকে দেশটির ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করা হয়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালিয়েছে। এরপর দুপক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা আরও তীব্রতর হয়েছে।
ইরানের খারগ দ্বীপের সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, দ্বীপের তেল স্থাপনাগুলো এখনও ধ্বংস করা হয়নি, তবে ইরান যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়, তবে সেসব স্থাপনাও গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
এদিকে তেহরান হুঁশিয়ার করে বলেছে, তার জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে যেকোনো হামলা আঞ্চলিক তেল অবকাঠামো এবং মার্কিন-জোটবদ্ধ সম্পদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের সূত্রপাত করবে, যা উপসাগরজুড়ে আরও বিস্তৃত জ্বালানি ও নিরাপত্তা সংকটের আশঙ্কা সৃষ্টি করবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইরানে এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৪৪৪ জন নিহত এবং ১৮ হাজার ৫৫১ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হামলায় আহত এবং সম্ভবত বিকৃত হয়ে গেছেন। খামেনি ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের তথ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ১০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে।
ইরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। হিজবুল্লাহর সঙ্গে সমন্বয় করে তারা ইসরায়েলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র তেল আবিবে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোও ইরানের নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে সৌদি আরব, কাতার ও বাহরাইনে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সৌদি আরব তাদের আকাশসীমায় ৬টি ড্রোন ধ্বংস করেছে এবং কাতারের সশস্ত্র বাহিনী একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বাহরাইন ও সৌদি আরবে আসন্ন ফর্মুলা ওয়ান রেস বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী এ পর্যন্ত ইরানে ৭ হাজার ৬০০টি এবং লেবাননে ১ হাজার ১০০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৭৭৩ ছাড়িয়েছে। সেখানে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলায় ১২ জন চিকিৎসক ও নার্স নিহত হয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছে। এমনকি দক্ষিণ লেবাননে নেপালি শান্তিরক্ষীদের একটি জাতিসংঘ ঘাঁটিও ইসরায়েলি গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরাকে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে, যাতে তাদের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ধ্বংস হয়ে গেছে।
এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট চরম আকার ধারণ করেছে এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএর সমন্বিত প্রচেষ্টায় কানাডা ২৩.৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে।
বিমান চলাচলের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভারতের মতো দেশগুলোতে টিকিটের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরিবর্তন হলোÑ ভারত, ফ্রান্স ও ইতালির মতো দেশগুলো এখন ওয়াশিংটনকে এড়িয়ে সরাসরি তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে যাতে তাদের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নিরাপদে হরমুজ প্রণালী পার হতে পারে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রভাব কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যাকে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘জেদের ফাঁদ’ বা উত্তেজনার গোলকধাঁধা। তারা বলছেন, জেদের ফাঁদে পড়লে ইরান যুদ্ধ আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠতে পারে। কারণ যুদ্ধের বর্তমান ধাপটি সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির দুটি ভিন্ন কৌশলের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে, যার প্রতিটিই একেকটি ফাঁদ হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যুদ্ধের শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি ও শীর্ষ কমান্ডারদের হত্যা করলেও তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা ভেবেছিলেন নেতৃত্বহীন ইরান তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে, কিন্তু ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা এখনও টিকে আছে। উল্টো ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ এখনও তাদের নাগালের বাইরে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এখন বিমান হামলার তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু তাতে রাজনৈতিক কোনো বিজয় আসছে না।
ইরান সরাসরি যুদ্ধে না জিতে ‘হরিজন্টাল এসক্যালেশন’ বা যুদ্ধের পরিধি ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। তারা এই সংঘাতকে কেবল নিজেদের সীমানায় আটকে না রেখে পুরো পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে ছড়িয়ে দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত করে তারা বিশ্ব অর্থনীতি আর জ্বালানি বাজারে এমন এক চাপ তৈরি করছে, যার খরচ সামলানো ওয়াশিংটনের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। ইরানের লক্ষ্য হলোÑ উপসাগরীয় দেশগুলোর সাধারণ মানুষের মনে এই প্রশ্ন জাগিয়ে তোলা যে, ইসরায়েলের জেদের কারণে কেন তারা এই যুদ্ধের মাসুল দেবে?
আকাশপথের শক্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ে গবেষণা করা এবং একাধিক মার্কিন প্রশাসনকে পরামর্শ দেওয়া ইতিহাসবিদ রবার্ট পেপ বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন প্রাথমিক আক্রমণে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের অস্ত্রের নিখুঁত নিশানার ওপর ভিত্তি করে ‘নিয়ন্ত্রণের বিভ্রম’ তৈরি হয়েছিল। এই সবকিছুই তেহরানকে তাদের নিজস্ব উত্তেজনার মডেলের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে অনেক বেশি বলে মনে করছেন পেপ ও অন্য সমালোচকরা। তারা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো ও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর মাধ্যমে ইরান প্রমাণ করেছে, তারা ওয়াশিংটনের জন্য যুদ্ধের ব্যয় এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে যা সরাসরি মার্কিন-ইসরায়েলি আক্রমণ মোকাবিলা করার সামরিক সক্ষমতার চেয়েও অনেক বেশি।
ইরানে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন দূত ও তেহরানের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী রবার্ট ম্যালি মনে করেন, এই যুদ্ধ কতটা বাড়বে তা নির্ভর করছে ট্রাম্পের মেজাজের ওপর। ট্রাম্প যদি ইরানের অবকাঠামো ধ্বংস বা কুর্দি বিদ্রোহীদের দিয়ে গৃহযুদ্ধ বাধানোর চেষ্টা করেন, তবে ইরানও চুপ থাকবে না। তারা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা আমেরিকানদের ওপর সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে হামলা চালাতে পারে। ট্রাম্প হয়তো বিজয়ের মালা পরে যুদ্ধ শেষ করতে চান, কিন্তু ইরানিরা তাকে এত সহজে সেই সুযোগ দেবে না।
রবার্ট ম্যালি বলেন, ‘আমি ধরে নিচ্ছি কোনো এক পর্যায়ে প্রস্থানের পথ থাকবে, কিন্তু আমি কল্পনা করতে পারি যে উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে যা আমরা এক মাস আগেও ভাবিনি... স্থল সেনা পাঠানো, মৌলিক অবকাঠামো ধ্বংস করা, ইরানের কিছু অংশ দখল করা, কুর্দি বা অন্যান্য জাতিগত গোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করাÑ এই সবই ভিন্নভাবে উত্তেজনা বাড়াবে।’
বিশেষজ্ঞ রবার্ট ডি কাপলান সতর্ক করেছেন, ইরান যুদ্ধ ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধের’ মতো দীর্ঘমেয়াদি ফাঁদে রূপ নিতে পারে। শুরুতে হয়তো ছোট ছোট দল পাঠানো হবে, কিন্তু ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে এমনভাবে জড়িয়ে পড়বে যে বের হওয়ার পথ থাকবে না। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা মহলের একটি বড় অংশ চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে ইরান থেকে দ্রুত হাত গুটিয়ে নিতে চাইলেও ট্রাম্পের ‘জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণের’ ইচ্ছা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
রবার্ট ডি কাপলান ফরেন অ্যাফেয়ার্সে লিখেছেন, ‘যদি ইরানে গৃহযুদ্ধ বা অনুরূপ কিছু শুরু হয়, তবে (ট্রাম্প) প্রশাসন এক পক্ষকে সাহায্য করার জন্য স্পেশাল ফোর্সেস ও উপদেষ্টা পাঠাতে বাধ্য করতে পারে। এবং সেখান থেকেই উত্তেজনার ঝুঁকি সর্পিল আকারে বাড়তে থাকে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ একটি মাঝারি আকারের যুদ্ধে রূপ নিতে কয়েক বছর সময় নিয়েছিল... ইরানের পরিস্থিতিও একই পথ অনুসরণ করতে পারে।’