প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫১ এএম
আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৬ ১০:০১ এএম
তুরস্কের হাতাই প্রদেশের দোরতইওল এলাকায় পড়ে থাকা ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষ। ইরান থেকে নিক্ষেপ করা একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সময় এটি পড়ে যায়। ছবিটি ৪ মার্চ ২০২৬ তারিখে তোলা। ছবি: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্থাপনায় সাম্প্রতিক হামলায় ইরান চীনের স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা ব্যবহার করে থাকতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কয়েকজন গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক।
তাদের ধারণা, চীনের উন্নত ‘বাইডো’ স্যাটেলাইট ব্যবস্থার সহায়তা নিয়ে ইরান নির্ভুলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
হামলায় ইরানের লক্ষ্যভেদের নির্ভুলতা
ফ্রান্সের সাবেক বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক আলাইন জুইলেট চলতি সপ্তাহে ফ্রান্সের স্বাধীন টোকসিন পডকাস্টে বলেন, চীন সম্ভবত ইরানকে তাদের ‘বাইডো’স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার দিয়েছে।
তার মতে, গত বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের একটি হলো—ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এখন আট মাস আগের তুলনায় অনেক বেশি নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদ করছে। এতে তাদের নির্দেশনা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রশ্ন উঠছে।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান পাল্টা আক্রমণে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে।
ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো এসবের অনেকগুলো প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তাদের নিজস্ব গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমে (জিপিএস) সিস্টেমের সংকেত সীমিত করতে পারে বা জ্যামিংয়ের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের ব্যবহার ব্যাহত করতে পারে। কিন্তু ইরান যদি চীনের ‘বাইডো’ স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ব্যবহার করে থাকে, তাহলে সেই সংকেত বাধাগ্রস্ত করা অনেক কঠিন হবে।
‘বাইডো’ স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা কী?
চীনের ‘বাইডো’ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএসের বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।
২০২০ সালে এই বৈশ্বিক নেভিগেশন ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয় এবং সেই বছরের জুলাইয়ে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
১৯৯৬ সালের তাইওয়ান সংকটের পর চীন নিজস্ব স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন বেইজিং আশঙ্কা করেছিল, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন হয়তো জিপিএস ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারে।
স্যাটেলাইট সংখ্যার দিক থেকেও ‘বাইডোবেশ শক্তিশালী।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার তথ্য বিশ্লেষণ ইউনিটের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস ব্যবস্থায় ২৪টি স্যাটেলাইট রয়েছে, আর চীনের ব্যবস্থায় রয়েছে ৪৫টি।
বিশ্বের অন্য দুটি বড় ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা হল: রাশিয়ার গ্লোনাস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যালিলিও। সেগুলোতেও ২৪টি করে স্যাটেলাইট আছে।
বাইডো ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এ ব্যবস্থায় তিনটি প্রধান অংশ রয়েছে - মহাকাশ, স্থল এবং ব্যবহারকারী অংশ।
স্থল অংশে বিভিন্ন ধরনের গ্রাউন্ড স্টেশন রয়েছে, যেমন- প্রধান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, সময় সমন্বয় ও আপলিংক স্টেশন, পর্যবেক্ষণ স্টেশন এবং আন্তঃস্যাটেলাইট সংযোগ পরিচালনার জন্য বিভিন্ন সুবিধা।
ব্যবহারকারী অংশে আছে বিভিন্ন ধরনের মৌলিক পণ্য, সিস্টেম ও সেবা। যেমন- চিপ, মডিউল, অ্যান্টেনা, টার্মিনাল, অ্যাপ্লিকেশন সিস্টেম এবং অ্যাপ্লিকেশন সার্ভিস।
অন্যান্য স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার মতো বাইডোও স্যাটেলাইট থেকে সময় সংকেত পাঠায়, যা মাটিতে থাকা বা যানবাহনে থাকা রিসিভার গ্রহণ করে। একাধিক স্যাটেলাইট থেকে সংকেত পৌঁছাতে কত সময় লাগছে তা মেপে রিসিভার সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয় করে।
ইরান কি সত্যিই ‘বাইডো’ ব্যবহার করছে?
ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কিছু নিশ্চিত করেনি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই বিকল্প নেভিগেশন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।
চীন–ইরান সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করা বিশ্লেষক থিও নেনচিনি আল-জাজিরাকে
জানান, ২০১৫ সালেই ইরান তাদের সামরিক অবকাঠামোয় বাইডো-২ যুক্ত করতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল।
এর লক্ষ্য ছিল জিপিএসের বেসামরিক সংকেতের তুলনায় বেশি নির্ভুল সিগন্যাল ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্রের পথনির্দেশনা উন্নত করা।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২১ সালে চীন-ইরান কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তির পর এই সহযোগিতা আরও গতি পায়। তখন চীন সম্ভবত ইরানকে বাইডোর এনক্রিপ্টেড সামরিক সংকেত ব্যবহারের অনুমতি দেয়।
এর পর থেকে ইরান ধীরে ধীরে তাদের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থায় এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে শুরু করে।
নিখুঁত লক্ষ্যভেদে ‘বাইডো’র সম্ভাব্য ভূমিকা
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থার কারণে ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদের নির্ভুলতা নাটকীয়ভাবে বাড়তে পারে।
আগে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র মূলত ‘ইনার্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম’ (আইএনএস)-এর ওপর নির্ভর করত। এই পদ্ধতি জাইরোস্কোপ ও সেন্সরের মাধ্যমে কাজ করে, তবে দীর্ঘ দূরত্বে সামান্য ত্রুটি তৈরি হয়।
স্যাটেলাইট সিগন্যাল সেই ত্রুটি সংশোধন করে ক্ষেপণাস্ত্রকে আরও নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞ ম্যাগনিয়ার আল জাজিরাকে ব্যাখ্যা করেন, আগে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র মূলত ‘ইনার্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম’-এর ওপর নির্ভর করত।
এই পদ্ধতিতে জাইরোস্কোপ ও সেন্সর ব্যবহার করা হয়, যা বাইরের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধী হলেও দীর্ঘ দূরত্বে লক্ষ্যভেদে সামান্য ত্রুটি তৈরি করে। স্যাটেলাইট সিগন্যাল এই ত্রুটি সংশোধন করে লক্ষ্যভেদকে অনেক বেশি নির্ভুল করে তোলে।
একাধিক স্যাটেলাইট সিস্টেম ব্যবহারের বড় সুবিধা হলো জ্যামিং বা সংকেত বিঘ্নিত করার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। যদি একটি সিস্টেম জ্যাম করা হয়, তবে অন্যটি কাজ চালিয়ে যেতে পারে।
চীনের বাইডো সিস্টেমের ‘মার্জিন অব এরর’ বা ভুলের মাত্রা এক মিটারেরও কম। তাছাড়া এটি লক্ষ্যবস্তু সরে গেলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের দিক পরিবর্তন করতে পারে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক প্যাট্রিসিয়া ম্যারিনস বলেন, ২০২৫ সালের সংঘাতে ইসরায়েল ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত জিপিএস সংকেত জ্যাম করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু বাইডো-৩-এর সামরিক সংকেত জ্যাম করা অনেক কঠিন।
এমনকি বাইডোতে রয়েছে শর্ট মেসেজ টুল, যার মাধ্যমে উৎক্ষেপণের পরও ২ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ পরিবর্তন করা সম্ভব।
কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এই প্রযুক্তি?
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরান সত্যিই বাইডো ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার পেয়ে থাকে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
গবেষক নেনচিনি মনে করেন, এর ফলে অনেক দেশ ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী নেভিগেশন ব্যবস্থার দিকে যেতে পারে।
অন্যদিকে চীনও এই যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের প্রযুক্তির কার্যকারিতা যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে পরীক্ষা করার সুযোগ পাচ্ছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার কত বড়?
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ ভাণ্ডার বলে মনে করা হয়।
জুইলেট বলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বহু স্থাপনা ধ্বংসের দাবি করলেও ইরানের প্রকৃত সক্ষমতা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি।
ইরান ফ্রান্সের চেয়ে তিনগুণ বড় একটি দেশ এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সারা দেশে ট্রাকের ওপর মোতায়েন থাকে। বিশাল এই এলাকায় সেই ট্রাকগুলো ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন।
তেহরান সম্ভবত বর্তমান যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার কথা মাথায় রেখে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখন আরও হিসেব কষে মোতায়েন করছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রেরও উদ্বেগ বাড়ছে—কারণ ইরানের তুলনামূলক সস্তা শাহেদ ড্রোন ভূপাতিত করতে গিয়ে তাদের অত্যন্ত দামী ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে।