প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬ ১৩:১২ পিএম
আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৬ ০০:০৩ এএম
রেমিট্যান্স ও বিদেশি সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে এক বিপজ্জনক ফাঁদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে সাময়িক স্থিতি এলেও উৎপাদনমুখী উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশটি ধীরে ধীরে স্থবিরতার দিকে এগোচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানে রেমিট্যান্স এসেছে ৩.৪৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫.৪ শতাংশ বেশি। বর্তমানে রেমিট্যান্স দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশের সমান এবং অনেক সময় রপ্তানি আয়ের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করে।
গত তিন অর্থবছরে প্রবাসী পাকিস্তানিরা প্রায় ৯৬ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। এই অর্থ দেশের চলতি হিসাব ঘাটতি সামাল দিতে এবং রুপির মান স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর বড় অংশ উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ না হয়ে ভোগ্যপণ্য আমদানি, বিলাসপণ্য, গাড়ি ও ইলেকট্রনিকস ক্রয়ে ব্যয় হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার নিজেই শ্রম অভিবাসনকে উৎসাহিত করছে। ‘পাকিস্তান রেমিট্যান্স ইনিশিয়েটিভ’-এর মতো কর্মসূচির মাধ্যমে প্রবাসী আয়কে ব্যাংকিং চ্যানেলে আনতে বিপুল ব্যয় করা হচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা শক্তিশালী হলেও দেশের ভেতরে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। অনেক শিক্ষিত তরুণ বিদেশে নিম্ন বা মাঝারি দক্ষতার কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদের অপচয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রেমিট্যান্সের পাশাপাশি বিদেশি ঋণ ও সহায়তার ওপরও পাকিস্তানের নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। ১৯৫৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ২৬টি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে, যা বিশ্বে সর্বাধিক। সর্বশেষ ২০২৪ সালে শুরু হওয়া ৭ বিলিয়ন ডলারের এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে আইএমএফ থেকে আরও ১.২ বিলিয়ন ডলার ছাড় হয়েছে।
এদিকে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বন্যা ও জলবায়ু মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন সহায়তা দিচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সহায়তা মূলত বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যবহৃত হচ্ছে, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে নয়।
বর্তমানে পাকিস্তানের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১৩৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা জিডিপির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। সুদ পরিশোধেই সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৪৩ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে। একই সঙ্গে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০.৫ শতাংশে; বেলুচিস্তানে এই হার ৭০ শতাংশের কাছাকাছি।
চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং আইএমএফের সহায়তা ও আমানত মিলিয়ে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৬ সালের শুরুতে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থনীতির কৃত্রিম স্থিতি দেশটির দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য ঘাটতি—যা বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি—ঢেকে রাখছে।
উৎপাদন খাতেও দুর্বলতা স্পষ্ট। টেক্সটাইল রপ্তানি মাত্র ৪ শতাংশ হারে বাড়ছে, বন্যার পর খাদ্য রপ্তানি ৩৫ শতাংশ কমেছে এবং কৃষি খাতের দুর্বলতার কারণে পাকিস্তান এখন গম ও তুলা আমদানি করছে। শক্তিশালী রুপির কারণে সস্তা আমদানি বাড়ায় স্থানীয় শিল্প আরও চাপে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, রেমিট্যান্স ও বিদেশি সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিতে ‘ডাচ ডিজিজ’ ধরনের প্রভাব তৈরি করতে পারে, যেখানে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বাড়লেও উৎপাদনশীল খাত দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাদের মতে, টেকসই উন্নয়নের জন্য রেমিট্যান্সকে বিনিয়োগে রূপান্তর, রপ্তানি বাড়ানো, করব্যবস্থা সংস্কার এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় বৈদেশিক সহায়তা বা রেমিট্যান্স কমে গেলে পাকিস্তান নতুন করে অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারে।