প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ ২২:২১ পিএম
হরমুজ প্রণালীর কাছে গত ১১ মার্চ হামলায় আক্রন্ত থাই বাল্ক ক্যারিয়ার মায়ুরি নারি থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। ছবি: এএফপি
মধ্যপ্রাচ্যের এবারের যুদ্ধে সামরিক শক্তির আস্ফালনের চেয়ে কৌশলের লড়াই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের ১২তম দিনে এসে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নজিরবিহীন বিমান হামলা ও গোয়েন্দা তৎপরতার মুখেও ইরান তাদের সামরিক কৌশলে আমূল পরিবর্তন এনেছে।
পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, ইরানের সেনাবাহিনী এখন আর সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি নিচ্ছে না; বরং তারা ‘অ্যাট্রিশন’ বা ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের পথে হাঁটছে। ইরানের মূল লক্ষ্য এখন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সীমিত মজুতের ইন্টারসেপ্টর মিসাইলগুলোকে লক্ষ্যহীনভাবে খরচ করানো।
গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র যে থাড ও প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের ওপর ভরসা করে আসছিল, ইরান এখন সস্তা ড্রোন এবং ঝাঁকে ঝাঁকে সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে সেই প্রতিরক্ষা ব্যূহকে ফাঁকা করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ইসলামিক রেবল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা হামলার ৩৮তম ধাপ শুরু করেছে।
তাদের দাবি, কুয়েতের
আদিরি হেলিকপ্টার ঘাঁটি ও বাহরাইনের মিনা সালমান বন্দরে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র
ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি কুয়েতের কয়েকটি নৌঘাঁটি ও মার্কিন সেনাদের স্থাপনাতেও
আঘাত করা হয়েছে বলে তারা বলেছে। বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, শত্রুর পূর্ণ পরাজয় না
হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই শেষ হবে না।
ইরানের আধা-সরকারি
সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার রাতে আইআরজিসি ‘অপারেশন ট্রু
প্রমিজ ৪’-এর আওতায় এ যাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী হামলা চালিয়েছে। লাইলাতুল কদরের রাতে
‘ইয়া আলি ইবনে আবি তালিব’ কোড নামে পরিচালিত এই অভিযানে টানা তিন ঘণ্টা ধরে প্রচুর
‘খুররামশাহর’ ভারী মিসাইল ছোড়া হয়। হামলায় তেল আবিব, জেরুজালেম ও হাইফার সামরিক স্থাপনার
পাশাপাশি ইরাকের এরবিলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর মারাত্মক
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, শত্রু আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত এই
পাল্টা জবাব চলতেই থাকবে।
আইআরজিসির দাবি,
তারা কুয়েতের আল-উদাইরি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ১০০-র বেশি মার্কিন সেনাকে
জখম করেছে এবং বাহরাইনসহ বিভিন্ন নৌ-ঘাঁটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
একই সঙ্গে ইসরায়েলের ‘আমান’ ও ‘ইউনিট ৮২০০’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা দপ্তর ও
রাডার সিস্টেমে ড্রোন হামলা চালিয়ে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে দেওয়া
হয়েছে। এদিকে, তেলের ট্যাংকার পার করার মার্কিন দাবিকে ‘ভুয়া’ বলে করে ইরান উপহাস
করেছে।
ইরাকের ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স
দাবি করেছে, গত ১২ দিনে তাদের চালানো ২৯১টি অভিযানে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং বহু
জখম হয়েছে; যার মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টাতেই তারা ৩১টি হামলা চালিয়েছে।
এদিকে, যুদ্ধের প্রভাবে
অর্থনীতি সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন তেলের বাজার নিয়ে নানা ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে বলে
অভিযোগ উঠেছে। ট্রাম্প যুদ্ধ ‘প্রায় শেষ’ দাবি করলেও বাস্তবে হরমুজ প্রণালী ইরান পুরোপুরি
অচল করে রেখেছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ
করতে পারলেও পারস্য উপসাগর বা তেলের বাজারের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, যার ফলে মার্কিন
অর্থনীতি এখন চরম সংকটের মুখে।
ইরানের সমরকৌশল নিয়ে
জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ ভালি আর নাসর বলছেন, এটি একটি অত্যন্ত সুচিন্তিত ও বিস্ময়কর কৌশল।
যদি তারা ক্রমাগত হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মজুত শেষ করে দিতে পারে,
তবে পরবর্তীতে তাদের হাতে থাকা হাইপারসনিক ও আরও উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো
নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পথ পাবে। এই ‘প্রতিরক্ষা ক্ষয়ের’ খেলায় ইরান
নিজেকে দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করছে।
রণক্ষেত্রের উত্তেজনার
সমান্তরালে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, যুদ্ধ খুব শিগগির বা নির্ধারিত সময়ের আগেই
শেষ হতে পারে, কিন্তু বাজারের অস্থিরতা সেই আশ্বাসে পুরোপুরি শান্ত হচ্ছে না। তেলের
দাম একপর্যায়ে ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলারে উঠে গেলেও ট্রাম্পের কিছু ইতিবাচক মন্তব্যে
তা ৯০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। বিনিয়োগকারীরা এই আশায় বুক বাঁধছেন যে ট্রাম্প হয়তো
কোনো গোপন কূটনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে পারবেন। তবে মাঠের বাস্তবতা
সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেলের একমাত্র পথ হরমুজ প্রণালী এখন
কার্যত অচল।
ইরান স্পষ্ট জানিয়ে
দিয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের ওপর হামলা বন্ধ না হবে, ততক্ষণ এই নৌপথ দিয়ে একটি ট্যাংকারও
চলতে দেওয়া হবে না। পেন্টাগন হরমুজ প্রণালীর কাছে ১৬টি ইরানি মাইন স্থাপনকারী জাহাজ
ধ্বংস করার দাবি করলেও সাগরের তলদেশ মাইনমুক্ত করা এবং সাধারণ জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা
নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি সংকটের এই ধাক্কা শুধু পেট্রোল পাম্পে সীমাবদ্ধ
নেই; এটি এখন বৈশ্বিক কৃষি এবং প্রযুক্তি খাতের ওপর বড় আঘাত হানছে। সার উৎপাদনের অন্যতম
উপাদান ইউরিয়া ও সালফার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসায় সার সংকট শুরু হয়েছে, যার ফলে সয়াবিন,
তুলা ও ভুট্টার মতো ফসলের উৎপাদন খরচ রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সামরিক নেতৃত্বের
ক্ষেত্রে ইরান এক অদ্ভুত রহস্যময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির
মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণ করলেও এখন পর্যন্ত তাকে জনসমক্ষে
দেখা যায়নি। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দাবি করছে, মোজতবা খামেনি যুদ্ধের শুরুর
দিকেই গুরুতর আহত হয়েছিলেন, যে হামলায় তার পরিবারের সদস্যরা প্রাণ হারান। যদিও তেহরান
ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের পরিবার এই দাবি নাকচ করে তাকে ‘নিরাপদ’ বলছে,
কিন্তু রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তাকে ‘আহত যোদ্ধা’ হিসেবে বর্ণনা করা এবং কোনো সরাসরি বার্তা
না পাওয়া সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করছে। নেতৃত্বের এই অস্পষ্টতার মধ্যেও ইরানের সামরিক
কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া’ অত্যন্ত সক্রিয়। তারা এখন নতুন এক ফ্রন্ট খোলার হুমকি দিয়েছে, তা হলো
অর্থনৈতিক যুদ্ধ। তেহরানের সেপাহ ব্যাংকে হামলার প্রতিবাদে তারা পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে
মার্কিন এবং ইসরায়েলি ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা দিয়েছে। এটি সাধারণ মানুষের
মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেনে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি
করেছে। এর ফলে দুবাই, কাতার ও কুয়েতের মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর অর্থনীতি এখন থমকে
যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সাফল্যের বড় বড় বুলি
আওড়ালেও পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউস এখন দ্বিমুখী চাপে রয়েছে। একদিকে ইসরায়েলকে পূর্ণ সমর্থন
দিয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতি ধসে পড়ার
ভয়। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের কিছু নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা ভাবছে যাতে রাশিয়ার
তেল ভারতে পৌঁছাতে পারে এবং বাজারে তেলের জোগান বেড়ে দাম কমে। কিন্তু এই কৌশলটি ইউক্রেন
যুদ্ধে রাশিয়ার ওপর দেওয়া চাপকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এছাড়া ন্যাটোর সদস্য তুরস্কের আকাশসীমা
লঙ্ঘনের ঘটনা এবং মার্কিন মিত্র দেশগুলোর ওপর ইরানের ড্রোনের বৃষ্টির মতো হামলা পেন্টাগনের
হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছে। সমরবিদরা মনে করছেন, ইরান হয়তো বড় কোনো মরণকামড় দেওয়ার
জন্য উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ধরে রেখেছে।
যুদ্ধের রণাঙ্গন
কেবল সামরিক বাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে একটি স্কুলে হামলায়
১৭০ জন শিশুর প্রাণহানি বিশ্ববিবেকের কাছে এক বড় প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে,
১২তম দিনে এসে মধ্যপ্রাচ্য এমন এক অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে যেখানে দ্রুত শান্তি
ফেরার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং অর্থনৈতিক মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কাই প্রবল হয়ে উঠছে।
তেহরানের শীর্ষ যৌথ
সামরিক কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া’র সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি জানিয়েছেন,
ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের অংশীদারদের কাছে ‘এক লিটার
তেল’ও পৌঁছাতে দেবে না। তাদের উদ্দেশ্যে যাওয়া যেকোনো জাহাজ বা ট্যাংকার এখন থেকে ইরানের
বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য হবে।’ ইরানের এ মুখপাত্র হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘তেল আমদানিকারকেরা
প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ২০০ ডলার হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন। কারণ এই অঞ্চলের নিরাপত্তার
ওপর তেলের দাম নির্ভর করে, যা আপনারা অস্থিতিশীল করে তুলেছেন।’
বিবিসি জানিয়েছে,
জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল করতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের ইতিহাসে
সবচেয়ে বেশি পরিমাণে মজুত তেল ছাড়ার পরিকল্পনা করছে। জার্মানির অর্থমন্ত্রী ক্যাথরিনা
রাইখে এই পরিকল্পনার কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আইইএর ৩২টি সদস্য দেশকে সম্মিলিতভাবে
৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। এটি দেশগুলোর মোট মজুতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
এদিকে জাপানও তাদের
তেলের মজুত ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাচি বলেন, আইইএর
আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায় না থেকে জাপান নিজে ১৬ মার্চ থেকে বেসরকারি খাতের ১৫
দিনের এবং রাষ্ট্রীয় মজুতের এক মাসের তেল বাজারে ছাড়বে। এ ছাড়া অস্ট্রিয়াও নীতিগতভাবে
এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানাবে বলে জানিয়েছে।