প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬ ২২:৩০ পিএম
ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি। ছবি: এপি
আলি লারিজানি যদিও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হননি, আর এখনকার অন্তর্বর্তী সরকারেও তার কোনো আনুষ্ঠানিক পদ নেই, তাও তার হাতে যে পরিমাণ ক্ষমতা, তাতে তিনি এখন খতম হওয়ার তালিকার এক নম্বরে আছেন।
ইরানের এই নিরাপত্তা
প্রধান মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি একরকম হুমকিই
দিয়ে বসেছেন। তিনি ট্রাম্পকে সাবধান করে বলেছেন, ট্রাম্প যেন নিজেই “খতম” না হয়ে যান
সেদিকে খেয়াল রাখেন। তেহরান ট্রাম্পের এই “ফাঁপা হুমকিতে” একটুও ডরায় না।
ট্রাম্পকে ইঙ্গিত
করে এক্সে লারিজানি লিখেছেন, “ইরান আপনার ফাঁপা হুমকিতে ভয় পায় না। আপনার চেয়ে বড় বড়
রাঘব বোয়ালরাও ইরানি জাতিকে শেষ করতে পারেনি।” সঙ্গে আরও জুড়ে দিয়েছেন, “নিজের খেয়াল
রাখেন, যাতে নিজেই খতম হয়ে না যান।”
তেহরানের এই হুমকি
দেওয়ার মতো সক্ষমতা আসলেই আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও লারিজানিকে ছোট করে দেখার
উপায় নেই। লারিজানি যদিও সর্বোচ্চ নেতা হতে পারেননি, কিন্তু খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি
ক্ষমতায় বসার পর লারিজানি আবার ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার হর্তাকর্তা হয়ে উঠেছেন।
মোজতবার সঙ্গে তার
ঘনিষ্ঠতা বোঝা যায় যখন তিনি মোজতবার নিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে ইসরায়েল আর আমেরিকার “কলিজা শুকিয়ে গেছে”। লারিজানি
এখন নতুন সর্বোচ্চ নেতার একদম কাছের লোক। তার সঙ্গে এই বৃত্তে আছেন বিচার বিভাগীয়
প্রধান মোহসেনি-এজেই, স্পিকার গালিবাফ ও আইআরজিসির নতুন প্রধান আহমেদ ওয়াহিদি।
হরমুজ প্রণালী নিয়েও
তিনি কড়া কথা শুনিয়েছেন। লারিজানি বলেছেন, আমেরিকা আর ইসরায়েল হামলা করতে থাকলে তেলের
এই রাস্তা কখনোই শান্ত হবে না। এর জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, তেল আটকালে ইরানের ওপর ২০
গুণ বেশি কঠোর হামলা হবে। ট্রাম্প অবশ্য লারিজানিকে পাত্তাই দেননি। তিনি বলেছেন, “আমি
জানিও না এই লোকটা কে। সে কী বলছে তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”
লারিজানি আগে থেকেই বলে আসছেন- খামেনিকে হত্যার জন্য ট্রাম্পকে “চরম মূল্য” দিতে হবে। তিনি বলেছেন, “ওরা ইরানি জাতির কলিজা পুড়িয়েছে, আমরাও ওদের কলিজা পুড়িয়ে দেব। এটা শুধু মেরে কেটে পালিয়ে যাওয়ার বিষয় না, এর বদলা হবে আরও ভয়াবহ।”
লারিজানির ক্ষমতা
কোথা থেকে আসে?
৬৭ বছর বয়সী লারিজানি
বর্তমানে ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’-এর সেক্রেটারি। তাকে ইরানের রাজনৈতিক
ও নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আইআরজিসির একজন সাবেক
কমান্ডার হিসেবে তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় আইআরজিসিন চিফ অফ স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব
পালন করেছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে
লারিজানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের পরিবর্তে রাশিয়া, চীন ও পারস্য উপসাগরীয়
আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় খামেনির প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি ওয়াশিংটনের
সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনার আগে ওমানে গিয়েছিলেন তেহরানের রূপরেখা ও শর্তাবলী তুলে ধরতে।
হিজবুল্লাহ ও অন্যান্য
শিয়া প্রক্সি বাহিনী ইসরায়েলকে রুখতে ব্যর্থ হওয়ার পর, খামেনি লারিজানিকে লেবানন ও
ইয়েমেনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির দায়িত্ব দেন।
এই পদক্ষেপটি আইআরজিসির
বৈদেশিক কার্যক্রম শাখা কুদস ফোর্সের কমান্ডারের প্রতি একটি সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা
করা হয়েছিল, যেহেতু লারিজানি একজন বেসামরিক ব্যক্তি।
তেহরানে সাম্প্রতিক
বিক্ষোভের সময় দমন-পীড়নে লারিজানির ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যার ফলে ট্রাম্প
প্রশাসন তাকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল।
২০০৫ থেকে ২০০৭ সালের
মধ্যে লারিজানি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের অধীনে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি
কাউন্সিলের সচিব হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন এবং ইরানের পারমাণবিক ফাইল তদারকি করতেন। আহমাদিনেজাদের
সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে তিনি পদত্যাগ করেন বা তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ৫
আগস্ট তিনি পুনরায় এই পদে ফিরে আসেন।
লারিজানি ২০০৮ থেকে
২০২০ সাল পর্যন্ত ১২ বছর ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক আলোচনায় একজন প্রধান আলোচক ছিলেন, যিনি
২০১৫ সালের জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন (জেসিপিএ)-এ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন
করেছিলেন।
তিনি ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমের প্রধান ছিলেন এবং ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সংস্কৃতি ও ইসলামি দিকনির্দেশনা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দুইবার প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু গার্ডিয়ান কাউন্সিল উভয়বারই তার প্রার্থিতা প্রত্যাখ্যান করে।
বিশ্বাসী ও ক্ষমতাধর
পরিবার
লারিজানি একটি অভিজাত
আলেম পরিবার থেকে এসেছেন। তার বাবা ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ ধর্মীয় নেতা এবং তার শ্বশুর
মোর্তজা মোতাহারি ছিলেন একজন প্রধান বিপ্লবী তাত্ত্বিক ও আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির
ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তার ভাই সাদেক লারিজানি এক দশক ধরে ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে
দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০২০-এর দশকের শুরুর
দিকে লারিজানি ভাইদের নাম দুর্নীতির অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল জমি
দখল, ঘুষ এবং শত শত কোটি তোমান সম্বলিত ৬৩টি ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মালিকানা।
২০২১ সালে লারিজানিকে
চীনের সঙ্গে কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি ২৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত চুক্তি আলোচনার দায়িত্ব
দেওয়া হয়েছিল।
গত গ্রীষ্মের ১২
দিনের যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে লারিজানি দাবি করেন, ইসরায়েলিরা
“সেই যুদ্ধের সময় আমাকে ফোন করেছিল এবং বলেছিল আমার হাতে ১২ ঘণ্টা সময় আছে দেশ ছাড়ার
জন্য, নতুবা তারা আমাকে মেরে ফেলবে।”
ইউরোপীয় ইউনিয়ন
আইআরজিসিকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করার পর লারিজানি এক্সে লিখেছিলেন, সংসদীয়
প্রস্তাব অনুযায়ী “আইআরজিসির বিরুদ্ধে ২৭ সদস্যের এই ব্লকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে অংশগ্রহণকারী
দেশগুলোর সেনাবাহিনীকেও সন্ত্রাসী হিসেবে গণ্য করা হবে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন,
“এই পদক্ষেপের পরিণতি সেই ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর পড়বে যারা এমন পদক্ষেপ নিয়েছে।”
তার অনেক আত্মীয় পশ্চিমে বসবাস করেন, যার মধ্যে রয়েছেন এক ভাতিজা যিনি যুক্তরাজ্যে একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক এবং এক মেয়ে যিনি যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতা করতেন যতক্ষণ না ইরানি বিরোধী গোষ্ঠীগুলো তাকে তার প্রাতিষ্ঠানিক পদ ছেড়ে দিতে চাপ দেয়।
দর্শনের পণ্ডিত
লারিজানি কেবল একজন
ঝানু রাজনীতিবিদ বা দুর্ধর্ষ নিরাপত্তা প্রধানই নন, তিনি দর্শনের একজন গভীর পণ্ডিত
হিসেবেও পরিচিত। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ্চাত্য দর্শনে পিএইচডি করা লারিজানি
জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের তত্ত্বের ওপর বিশেষ দক্ষতা রাখেন এবং কান্টের গাণিতিক
দর্শনের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো নিয়ে বইও লিখেছেন।
এটি বেশ বিস্ময়কর,
একদিকে লারিজানি ইসলামিক বিপ্লবের কট্টর আদর্শ লালন করেন এবং পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে
কঠোর হুমকি দেন, অন্যদিকে তিনি সেই পশ্চিমা দর্শনের কঠিনতম যুক্তিবিদ কান্টের আদর্শ
নিয়ে পড়াশোনা করেছেন।
লারিজানি দর্শন ও
রাজনীতি মিলিয়ে অন্তত ৫টি প্রধান গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে ইমানুয়েল কান্টের
দর্শনের ওপর লেখা বইগুলোই সবচেয়ে বেশি সমাদৃত। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ হলো ‘ইমানুয়েল
কান্টের দর্শনে গাণিতিক অনুধাবন’, যেখানে তিনি কান্টের সূক্ষ্ম গাণিতিক ও দার্শনিক
যুক্তিগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। এ ছাড়া তিনি দার্শনিক ডেভিড হিউমের তত্ত্ব নিয়েও বই লিখেছেন
এবং ‘সততার রাজনীতি’ নামক একটি গ্রন্থে সমসাময়িক ইরানি রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে
তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
কান্টের জটিল যুক্তিবিদ্যা
ও দর্শন লারিজানিকে তেহরানের রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে একজন ধূর্ত এবং অত্যন্ত কৌশলী কূটনীতিবিদ
হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে বলে সমালোচকরাও মনে করেন।