প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬ ২৩:০০ পিএম
ইরানের তেহরানে ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর শাহরান তেল ডিপোতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। ছবি: আনাদোলু
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগুন ছড়িয়েছে সারা বিশ্বে। সেই লেলিহান শিখা আজ কেবল একটি অঞ্চলের ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। তা বিশ্ব অর্থনীতির ফুসফুস বলে পরিচিত জ্বালানি ও সুপেয় পানির অবকাঠামোয় সরাসরি আঘাত হেনেছে। এর প্রেক্ষিতে যুদ্ধের দশম দিনে তেলের বাজার আরও তেতে উঠেছে।
২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ মার্কিন ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমার ঠিক নিচে গিয়ে ঠেকেছে। সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড এবং যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত উচ্চমানের অপরিশোধিত তেল ডব্লিউটিআই উভয়ের দামই একলাফে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে বিশ্বজুড়ে চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে। এটি কেবল একটি গাণিতিক বা সংখ্যার পরিবর্তন নয়, বরং আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা ও গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের জন্য এক চূড়ান্ত অশনিসংকেত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সোমবারের বাজার বিশ্লেষণ
করলে দেখা যায়, জ্বালানি তেলের ইতিহাসে এক দিনে এত বড় ‘নিরেট মূল্যবৃদ্ধি’ আর কখনো
ঘটেনি। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্স ১৩.০২ ডলার বেড়ে ১০৫.৭১ ডলারে স্থির হলেও দিনের শুরুতে
তা ১১৯.৫০ ডলারে পৌঁছেছিল। অন্যদিকে, মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)
এক পর্যায়ে ১১৯.৪৮ ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তেলের দাম বাড়তে শুরু করলেও গত এক সপ্তাহে ব্রেন্ট ২৮ শতাংশ
এবং ডব্লিউটিআই ৩৬ শতাংশ বাড়ার পর সোমবারের এই প্রলয়ঙ্করী উল্লম্ফন বিশ্ব অর্থনীতিকে
এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে,
এই অস্থিরতার নেপথ্যে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এক গভীর যৌথ রণকৌশল।
তাদের মূল লক্ষ্য হলো ‘ইরানভীতি’কে পুঁজি করে আরব দেশগুলোকে সরাসরি তেহরানের বিরুদ্ধে
একটি অভিন্ন সামরিক ফ্রন্টে দাঁড় করানো। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আরব দেশগুলোতে অবস্থিত
মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে, যাতে পাল্টা জবাবে ইরান
ওই দেশগুলোর জ্বালানি ও পানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে। এতে করে আরব রাষ্ট্রগুলো
অনিচ্ছাসত্ত্বেও ইসরায়েলের নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হতে বাধ্য হয়। মূলত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসকে
সামরিক রূপ দেওয়া এবং ফিলিস্তিন ইস্যুকে আড়াল করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব খর্ব
করার মাধ্যমে ইসরায়েলি আধিপত্য ও মার্কিন পেট্রোডলারের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই এই কৌশলের
মূল উদ্দেশ্য।
বাহরাইনের প্রধান
তেল শোধনাগারে ইরানের ড্রোন হামলা এবং বিপরীতে ইরানি তেল স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলায়
ওয়াশিংটন ওপরতলায় ‘বিরক্তি’ প্রকাশ করলেও, একে আরব দেশগুলোকে যুদ্ধে জড়ানোর সুপরিকল্পিত
ছক হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ইরানের নতুন নেতৃত্বের অধীনে প্রতিবেশী দেশগুলোর
মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সংলগ্ন তেল শোধনাগার, পাইপলাইন ও এলএনজি অবকাঠামোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু
করায় সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। সস্তা ড্রোনের নিখুঁত নিশানায় বিলিয়ন
ডলারের রাডার ও শোধনাগার অকেজো হওয়ায় সমরবিদ্যার পাশাপাশি যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যাকরণও
বদলে গেছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি
ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং দৈনিক ২ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল ও এলএনজি সরবরাহকারী
হরমুজ প্রণালী বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে কার্যত অবরুদ্ধ। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী
এই সরু নৌপথটির সংকীর্ণতম অংশ মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত হওয়ায় এটি সামরিকভাবে অত্যন্ত
সংবেদনশীল।
ইরানের হামলার হুমকির
মুখে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরাকের মতো বড় উৎপাদকদের তেল উৎপাদন ইতোমধ্যে ৭০
শতাংশ হ্রাস পেয়ে মাত্র ১.৩ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে। মেরিন ট্রাফিক প্ল্যাটফর্মের
শিপ-ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, বর্তমানে অন্তত ২০০টি বিশালাকার ট্যাঙ্কার ও কার্গো জাহাজ
প্রণালীর বাইরে আটকা পড়ে আছে। বিমা প্রিমিয়াম বহুগুণ বাড়লেও নাবিকদের নিরাপত্তার অভাবে
সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ওপেকের প্রধান দেশগুলোর এশীয় বাজারে তেল রপ্তানির
এই একমাত্র ধমনীটি বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বিশ্বজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক
মন্দার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইরাক ছাড়াও কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন উৎপাদন কমিয়ে
‘ফোর্স মজিউর’ ঘোষণা করেছে। কাতার তাদের এলএনজি অবকাঠামোতে হামলার পর উৎপাদন পুরোপুরি
বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি সৌদি আরামকো তাদের রপ্তানি রুট রুদ্ধ হওয়ায় বিরল টেন্ডারের
মাধ্যমে ৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ
তেল শিল্প এলাকায় ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে
তুলেছে।
জ্বালানি অবকাঠামোর
পাশাপাশি সুপেয় পানির উৎসগুলোকে যুদ্ধের টার্গেট হিসেবে ব্যবহার করা বর্তমান বিশ্ব
পরিস্থিতিতে এক ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনছে। মরুভূমি প্রধান মধ্যপ্রাচ্যে
পানির প্রধান উৎস হলো বিশাল সমুদ্র উপকূলীয় ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট, যা এখন সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র
ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু। এই প্ল্যান্টগুলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়
শোধনাগারে হামলার প্রভাবে অনেক জায়গায় পানি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের
লাখ লাখ মানুষ সুপেয় পানির তীব্র সংকটে পড়েছে। পানির এই হাহাকার কেবল তৃষ্ণা নয়, বরং
কৃষি উৎপাদন ও কলকারখানা সচল রাখাও অসম্ভব করে তুলছে, যা খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে অর্থনৈতিক
ধসকে ত্বরান্বিত করছে। এই ‘পানি যুদ্ধ’ বা ওয়াটার পলিটিক্স শেষ পর্যন্ত গণ-উদ্বাস্তু
সমস্যা এবং মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই চরম অস্থিতিশীল
পরিস্থিতির মধ্যেই তেহরান থেকে আসা রাজনৈতিক খবরটি যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নিহত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন
‘সর্বোচ্চ নেতা’ নির্বাচিত করার মাধ্যমে ইরান বার্তা দিয়েছে যে, তারা কোনোমতেই নতি
স্বীকার করবে না। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নির্বাচনে মার্কিন
হস্তক্ষেপের দাবি জানালেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির
পুতিন ইতিমধ্যেই মোজতবাকে অভিনন্দন জানিয়ে পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন, যা এই সংঘাতকে
একটি বৈশ্বিক প্রক্সি যুদ্ধের রূপ দিচ্ছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা গ্যালনপ্রতি প্রায় ৩.২২ ডলার। সামনে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় এই পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মার্কিন সিনেটররা ‘কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ থেকে তেল ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর সোমবার জরুরি বৈঠকে বসার কথা। তবে জ্বালানি যুদ্ধের এই ডামাডোলে বিশ্বশক্তির লড়াই এখন ভেনেজুয়েলা থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য হলো ভেনেজুয়েলায়
নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে মার্কিন শোধনাগারগুলোকে সচল রাখা এবং পেট্রোডলারের আধিপত্য
নিশ্চিত করা। কিন্তু এই কৌশল চীনকে জ্বালানি সংকটে ফেলার একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক
অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে। কারণ চীন বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক এবং তাদের শিল্প
সচল রাখতে প্রতিদিন ১৬ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল প্রয়োজন। ইউরোপীয় বাজারের পরিস্থিতিও
ভয়াবহ; ইউরোজোনের বিনিয়োগকারীদের মনোবল মাইনাস ৩.১ পয়েন্টে নেমে এসেছে। জার্মানির
১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জ্বালানি
বিশ্লেষক ক্লাইড রাসেলের মতে, অপরিশোধিত তেলের চেয়েও পরিশোধিত জ্বালানি যেমন গ্যাসোলিন,
ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দাম দ্রুত বাড়ছে, যা বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে।
ইরানকে বিভক্ত করে
তেল লুটের মার্কিন পরিকল্পনার অভিযোগ এবং তুরস্ক, সাইপ্রাস ও আজারবাইজানে হামলার দায়
তেহরান অস্বীকার করলেও, পরিস্থিতি এখন চরম উত্তেজনার তুঙ্গে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে
স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে সেনাদের ছুটি বাতিল করে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, অন্যদিকে এই
মহাপ্রলয় রুখতে চীনের বিশেষ দূত মধ্যস্থতার আশায় সৌদি আরবে জরুরি সফরে রয়েছেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু
হওয়া এই যুদ্ধ যদি দ্রুত শেষও হয়, তবু শোধনাগার ও পাইপলাইন মেরামতে দীর্ঘ সময় লাগবে
এবং লজিস্টিকস বিপর্যয়ের কারণে বিশ্ববাসীকে দীর্ঘ সময় উচ্চমূল্যের ঘানি টানতে হবে।
ফলে বিশ্ববাসী এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে।
পারস্য উপসাগরে আটকা
পড়া জাহাজগুলো কেবল জ্বালানি নয়, বহন করছে বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। কাতার ও কুয়েতের
জ্বালানি মন্ত্রীদের সতর্কতা অনুযায়ী, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতি এমন
এক মহাধসের সম্মুখীন হবে, যা আধুনিক ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে।
তেলের দাম যদি চড়তে
চড়তে ১৫০ ডলারের দিকে যায়, তবে বুঝতে হবে বিশ্ব এক দীর্ঘ অন্ধকার মন্দার যুগে প্রবেশ
করতে যাচ্ছে। সুপেয় পানির উৎস থেকে শুরু করে জ্বালানি সরবরাহ লাইন পর্যন্ত যে পরিকল্পিত
ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে, তা কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক
মহাপ্রলয়ের পূর্বাভাস।