প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩৭ এএম
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাতে বৃহস্পতিবার একটি শিল্প অঞ্চলে বিস্ফোরণের পর ধোঁয়া উড়ছে। ছবি: গেটি ইমেজেস
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধে নাচার বা অক্ষম হয়ে পড়তে পারে ইসরায়েল। যদিও তাকে সহায়তাকারী যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম বলে দাবি করেছে। এরই মধ্যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধানোর ষষ্ঠ দিন পার করেছে ইসরায়েল। এ সময়ে এসেও যুদ্ধ বন্ধের উল্লেখযোগ্য তৎপরতা দেখায়নি কোনো পক্ষ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ষষ্ঠ দিনে ইরানের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্ফোরণ হয়েছে, যেখানে তেহরানে নতুন করে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইসরায়েল।
ইরানজুড়ে শনিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরামহীন এ হামলায় কমপক্ষে ১ হাজার ২৩০ ইরানি প্রাণ হারিয়েছে। একই সঙ্গে লেবাননেও তাণ্ডব চালাচ্ছে ইসরায়েল। এমন বাস্তবতায় যুদ্ধ থামানো তো দূরের কথা, এ যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পকে থামানোর একটি প্রস্তাব আটকে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট। অন্যদিকে তেহরানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কুর্দি বাহিনীগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে জানান, ইরাক সীমান্তে সন্ত্রাসীদের আনাগোনা দেখা গেছে। তিনি সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের দাবি, যুদ্ধে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ শতাধিক সেনা। ইসরায়েলের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে দেশটি।
তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চোখ অন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দেশ দুটির ওপর পাল্টা হামলা চালানো ছাড়া উপায় ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ইসলামী প্রজাতন্ত্রটির ভাষ্য, যুদ্ধজাহাজ ডুবানোর জন্য ভুগতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।
চলমান সংঘাতে এরই মধ্যে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের সরবরাহব্যবস্থা উলটপালট হয়ে গেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর-আইআরজিসি হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণার পর গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি এড়িয়ে চলছে কার্গো জাহাজগুলো।
এই যখন সামগ্রিক পরিস্থিতি, তখন ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসলামী প্রজাতন্ত্রটিতে শুরুতে হামলাকারী ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের ভাষ্য, যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হওয়াটা সমস্যা নয় এবং বর্ধিত যুদ্ধ মোকাবিলার সামর্থ্য আছে দেশটির সামরিক বাহিনীর, তবে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের ক্ষেত্রে বিষয়টি একই রকম নয়। গাজায় গণহত্যা, লেবানন, সিরিয়ায় দীর্ঘ সামরিক অভিযান এবং ইতঃপূর্বে ইরানের সঙ্গে প্রায় দুই সপ্তাহ যুদ্ধ চালিয়ে পরিশ্রান্ত দেশটির জন্য ইরানে নতুন দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান হতে পারে অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
ইরানে হামলা শুরুর পর একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে ইসরায়েল। এর ফলে দেশজুড়ে আকাশসীমায় হামলার সাইরেন বাজানোর পাশাপাশি স্কুল বন্ধ ও হাজারো রিজার্ভ সেনাকে সক্রিয় করতে হয়েছে তেল আবিবকে। অব্যাহত হামলার শিকার হতে হয়েছে হাইফা ও তেল আবিবের মতো ইসরায়েলি শহরগুলোকে। এসব হামলার পর জরুরি সেবা সংস্থাগুলোকে তাদের কাজে এবং জনগণকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে বোমা হামলা-নিরোধী আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া-আসায়।
যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে উৎসাহের ঘাটতি নেই ইসরায়েলিদের মধ্যে। দেশটির বেশিরভাগ বড় শহরের বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকারে দীর্ঘদিন ধরে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা দেশের সঙ্গে যুদ্ধের ক্ষুধা দেখা গেছে। কট্টর বামপন্থী বাদে অন্য রাজনীতিকদের মধ্যে সরকারের পক্ষে অবস্থানই বেশি দেখা গেছে।
এ বিষয়ে ইসরায়েলি রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভের আলজাজিরাকে বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলজুড়ে সামরিকতন্ত্রের ঢেউ দেখা গেছে। এটি আগের (২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধ) মতো নয়। সে সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আতঙ্ক ও ইসরায়েলকে ইরান ধ্বংস করে দিতে পারে, এমন অস্তিত্বগত ভয় ছিল। বর্তমানের এর জায়গা নিয়েছে অতি উৎসাহী সামরিকতন্ত্র ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস।’
যুদ্ধের পক্ষে ইসরায়েলিদের সমর্থনকে অনেকে ইসরায়েলি সমাজের মৌলবাদীকরণ হিসেবে দেখেন। দেশটির সরকারের কেন্দ্রে একদিকে জায়গা করে নিয়েছেন কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকরা, অন্যদিকে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে তরুণ ও মেধাবীদের দেশত্যাগ বেড়েছ। দেশে অবস্থানরতদের এমন পরিস্থিতিতে রাখা হয়েছে, যাতে করে তারা ইরানকে প্রধান শত্রু হিসেবে গণ্য করেন। যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হলে বৃহত্তর সমাজের চরমপন্থী ঝোঁক আরও বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে তেল আবিব ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড্যানিয়েল বার-তাল বলেন, নতুন করে কয়েক সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধের পর কেমন মানসসম্পন্ন ইসরায়েলি সমাজ সৃষ্টি হবে, সে সম্বন্ধে ধারণা করা অসম্ভব।
সামরিক হিসাবনিকাশ
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সামাজিক প্রভাবের বাইরেও সামরিক হিসাবনিকাশ মাথায় নিতে হবে ইসরায়েলকে। ইরানের মতো একটি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইসরায়েল কত দিন বর্তমান স্তরের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে, সেটি বড় প্রশ্ন। এ নিয়ে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজে আত্তার বলেন, বিষয়টি নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো মিত্রদের সমর্থন ও দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সতেজ থাকার ওপর।
এ বিশ্লেষক আলজাজিরাকে জানান, যুদ্ধের প্রথম তিন দিনে ইসরায়েলের দিকে দুই শতাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। এর আগে ১২ দিনের যুদ্ধে একই ধরনের প্রায় ৫০০ অস্ত্র ছুড়েছিল দেশটির সামরিক বাহিনী। এর প্রতিটিকে প্রতিহত করতে ইসরায়েলকে কমপক্ষে একটি রকেট ছুড়তে হয়েছে। রকেট ঠেকানোর এ কর্মকাণ্ড সম্ভবত ইসরায়েলের সামর্থ্যের বাইরে চলে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া দেশটি সম্ভবত আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ হারাত।
তিন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা
ইসরায়েলের ভিন্ন তিনটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। স্বল্পপাল্লার রকেট ও কামান ঠেকাতে দেশটি ব্যবহার করে আয়রন ডোম। মধ্যপাল্লার রকেট ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যবহার হয় ডেভিড’স স্লিং। অন্যদিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যবহার করা হয় অ্যারো টু ও অ্যারো থ্রি। ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে কী পরিমাণ ইন্টারসেপ্টর আছে, তা খোলাসা করে না ইসরায়েল, তবে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টরের মজুদে টান পড়ে। এটি ইঙ্গিত করে যে, প্রলম্বিত যুদ্ধে বেশি পরিমাণে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। ইন্টারসেপ্টর কমার সঙ্গে সঙ্গে সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তু বাঁচানোয় বেশি নজর দিতে হতে পারে ইসরায়েলের, যা অধিকসংখ্যক বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভার
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সূত্রের বরাত দিয়ে বিশ্লেষক আত্তার জানান, গত বছরের জুনের সংঘাতের পর ইরান প্রতি মাসে ১০০টি করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করেছে। এর অর্থ হলো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ আছে দেশটির কাছে। এ বিশ্লেষকের মতে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যাই নয়, এর ধরনও ইসরায়েলের জন্য সম্ভাব্য হুমকি। আত্তারের মতে, কী ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের কাছে আছে, তা জানা যায়নি।
ইরানের কাছে দূরপাল্লার এমন ক্ষেপণাস্ত্র আছে, যা গ্রিস ও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এ ছাড়া মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েল এবং স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দেশটি উপসাগরীয় আরব দেশগুলেকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।
আগের মতো এবারের যুদ্ধের হিসাবনিকাশে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় লঞ্চার। আত্তারের মতে, ১২ দিনের যুদ্ধের আগে ইরানের কাছে কতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল এবং কী পরিমাণ ধ্বংস হয়েছে, সে তথ্য জানা যায়নি। ইরানের লঞ্চারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। যদি লঞ্চারগুলো ধ্বংস করা হয়, তাহলে প্রচুর ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেও তা যুদ্ধের হিসাবনিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবে না। বিষয়টি এমন দাঁড়াবে যে, কারও হাতে গুলি থাকলেও নেই রাইফেল।
অর্থনৈতিক দিক
দুই বছরের বেশি সময় ধরে প্রায় নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধের দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে ইসরায়েলের অর্থনীতিতে। বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, অস্ত্রশস্ত্রের খরচ বাড়ার পাশাপাশি লাখো রিজার্ভ সেনাকে পরিকল্পনার বাইরে দীর্ঘদিন মাঠে রাখা হয়েছে। লেবানন ও গাজায় ২০২৪ সালের যুদ্ধে ইসরায়েলের ব্যয় হয় তিন হাজার ১০০ কোটি ডলার। এর ফলে বিগত বছরগুলোর মধ্যে বাজেটে সবচেয়ে ঘাটতি দেখা যায় ওই বছরে। ২০২৫ সালের প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধে দেশটির ব্যয় পাঁচ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছাচ্ছে। যুদ্ধের ঝনঝনানির মধ্যে ২০২৪ সালে বৃহৎ তিন ক্রেডিট এজেন্সি ইসরায়েলের ক্রেডিং রেটিংয়ের অবনমনের তথ্য প্রকাশ করে। এমন বাস্তবতায় রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ হেভের বলেন, ইসরায়েল ঋণ, জ্বালানি, পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যদিও তার মতে, এসবের কিছুই ইসরায়েলের সামরিক অভিযান থামানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এটি অর্থনীতি নয়, প্রযুক্তির প্রশ্ন।
হেভেরের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লোড, নিশানা ও হত্যায় সক্ষম উন্নত অস্ত্র সরবরাহ করা অব্যাহত রাখতে পারে এবং তাতে সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি না থাকে, তাহলে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ইসরায়েলের আগ্রাসন থামানোর জন্য যথেষ্ট হবে না।