প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ১০:৫০ এএম
বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরে শনিবার আঘাত হানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র। ছবি: রয়টার্স
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রথম চার দিনে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের (প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার) সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। তুরস্কভিত্তিক সংবাদ সংস্থা আনাদলু বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি এএন/এফপিএস-১৩২ আর্লি ওয়ার্নিং রাডার সিস্টেম ধ্বংস হওয়ার ঘটনায়। প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই রাডারটি শনিবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে কাতার কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
রবিবার কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভুলবশত হামলায় তিনটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়। এতে ছয়জন ক্রু প্রাণে বেঁচে গেলেও বিমানগুলো সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এগুলো প্রতিস্থাপন করতে আনুমানিক ২৮২ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শনিবার ইরানের প্রাথমিক হামলায় বাহরাইনের রাজধানী মানামায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরেও আঘাত হানে ক্ষেপণাস্ত্র। এতে দুটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ টার্মিনাল এবং কয়েকটি বড় ভবন ধ্বংস হয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ধ্বংস হওয়া টার্মিনালগুলোকে এন/জিএসসি-৫২বি স্যাটকম হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর প্রতিটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ২ কোটি ডলার (স্থাপন ও মোতায়েন ব্যয়সহ)।
এ ছাড়া ইরান দাবি করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-রুওয়াইস শিল্পাঞ্চলে মোতায়েন করা থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডার ধ্বংস করা হয়েছে। স্যাটেলাইট ছবির বিশ্লেষণেও সেখানে আঘাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। ওই রাডারের আনুমানিক মূল্য ৫০ কোটি ডলার।
সব মিলিয়ে এই হামলাগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১ দশমিক ৯০২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শনিবার থেকে ইরানে হামলা শুরু করার পর ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত সাতটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তর, কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান, আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটি ও ক্যাম্প বুহরিং, ইরাকের ইরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সামরিক ঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দর এবং কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি।
কুয়েতে রবিবার বিকালে তোলা ছবিতে আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটির ভেতরে একাধিক স্থানে ছাদ ধসে পড়ার চিত্র দেখা গেছে, যা আগের দিনের ইরানি হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্যাম্প আরিফজানে হামলায় ছয়জন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সদস্য নিহত হন। একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ক্যাম্প বুহরিং ঘাঁটির ওপর দিয়ে একটি ড্রোন উড়ে এসে ভেতরে বিস্ফোরিত হতে দেখা যায়।
এদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমসের যাচাই করা ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, ইরাকের ইরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামরিক স্থাপনাগুলো শনিবার ও রবিবার একাধিকবার লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। সেখানে আগুন ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। রবিবার সকাল নাগাদ স্যাটেলাইট ছবিতে ঘাঁটির একটি অংশে অন্তত চারটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ার প্রমাণ মিলেছে।
অন্যদিকে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরের রবিরের স্যাটেলাইট ছবিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি ‘বিনোদন’ জোনের ভেতরে বড় একটি ভবন থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। এটি আনুষ্ঠানিক যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি না হলেও মধ্যপ্রাচ্যে নৌবাহিনীর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বন্দরগুলোর একটি।
সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশনও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
সৌদি আরবের রাজধানী ইউএস এম্বাসি রিয়াদে দুটি ড্রোন আঘাত হানে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এতে সীমিত আগুন ও সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ওয়াশিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূতাবাসের ভেতরে থাকা সিআইএর স্টেশনটিও আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।
এ ছাড়া কুয়েত সিটির ইউএস এম্বাসি কুয়েতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়, যাকে কুয়েতি কর্মকর্তারা ‘নৃশংস হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দূতাবাসের আশপাশে ধোঁয়া দেখা গেলেও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। দূতাবাসটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় কর্মী ও তাদের পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত ইউএস কনস্যুলেটেও সন্দেহভাজন একটি ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। ড্রোনটি চ্যান্সারি ভবনের পাশের একটি পার্কিং এলাকায় পড়ে আগুন লাগলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে কনস্যুলেট প্রাঙ্গণে কিছু ক্ষয়ক্ষতি হলেও বড় ধরনের স্থাপনা ধ্বংস হয়নি।