প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬ ১৮:৫৯ পিএম
আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬ ২২:৪৯ পিএম
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: এএফপি
চার দশক ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি জাতির প্রতিরোধের মানসিকতা তৈরি করেছিলেন; তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় শনিবার সকালে নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট
ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার ৮৬ বছর বয়সী খামেনির কম্পাউন্ডে যৌথ বিমান হামলার কথা জানানোর
পর, রবিবার সকালে ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে।
ইরানের তাসনিম নিউজ
এজেন্সি জানিয়েছে, “ইরানের জনগণের উদ্দেশে ঘোষণা করা হচ্ছে, ইসলামী বিপ্লবের নেতা মহামান্য
গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ ইমাম সাইয়্যিদ আলি খামেনি শনিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী
শাসকের যৌথ হামলায় শহিদ হয়েছেন।”
এই হামলায় খামেনির
মেয়ে, জামাতা ও নাতিও নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যম।
ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন,
খামেনি ও অন্যান্য ইরানি কর্মকর্তারা “যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এবং উন্নত ট্র্যাকিং
সিস্টেম থেকে বাঁচতে পারেননি।”
আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ
খোমেনি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের নেতা, যার নেতৃত্বে ইরানের সর্বশেষ শাহ মোহাম্মদ
রেজা পাহলভি ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আয়াতুল্লাহ আলি
খামেনি ইরানের হাল ধরেন।
খোমেনি ছিলেন ক্যারিশম্যাটিক
নেতা, বিপ্লবের আদর্শিক শক্তি। আর খামেনি ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক
কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যা ইরানের প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক প্রভাবের মূল ভিত্তি।
সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার
আগে, ১৯৮০-র দশকে ইরাকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে
দায়িত্ব পালন করেন।
সেই দীর্ঘস্থায়ী
সংঘাত ও পশ্চিমা দেশগুলোর সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দেওয়ার কারণে খামেনির মনে পশ্চিমাদের
এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাসের জন্ম হয় বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
এই মনোভাবই তার কয়েক
দশকের শাসনকালকে পরিচালিত করেছে এবং এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, ইরানকে সবসময়
বাইরের ও ভেতরের শত্রুর বিরুদ্ধে রক্ষণাত্মক অবস্থায় থাকতে হবে।
ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ
ভ্যালি নাসর আল জাজিরাকে বলেন, “লোকে ইরানকে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র মনে করে কারণ খামেনি
পাগড়ি পরতেন এবং ধর্মের ভাষায় কথা বলতেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি ছিলেন যুদ্ধের মধ্য
দিয়ে আসা একজন প্রেসিডেন্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন ইরান সবসময় বিপদে আছে এবং এর নিরাপত্তা
প্রয়োজন।
“খামেনি মনে করতেন
আমেরিকা ইরানের শত্রু; এবং বিপ্লব, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ একে অপরের পরিপূরক—তাই এগুলোকে রক্ষা করতে হবে।”
এই দৃষ্টিভঙ্গির
অধীনেই ‘ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি) একটি আধাসামরিক বাহিনী থেকে
একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
খামেনি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার
মুখে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য “প্রতিরোধ অর্থনীতি”র প্রচার করেন, পশ্চিমাদের সঙ্গে
সম্পর্কের ব্যাপারে সন্দিহান থাকেন এবং সংস্কারপন্থীদের কঠোরভাবে দমন করেছেন।
তবে তার শাসনকাল
বেশ কয়েকবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল; যেমন ২০০৯ সালে নির্বাচনের কারচুপির অভিযোগে
বিক্ষোভ এবং ২০২২ সালে নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলন।
সম্ভবত তার শাসনের
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসে গত জানুয়ারিতে, যখন অর্থনৈতিক কষ্টের কারণে শুরু হওয়া বিক্ষোভ
দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং অনেকে সরাসরি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতনের ডাক
দেয়।
কর্তৃপক্ষের কঠোর
প্রতিক্রিয়ার ফলে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর গত জানুয়ারিতে অন্যতম রক্তক্ষয়ী সংঘাত তৈরি
হয়।
সমালোচকরা মনে করেন,
খামেনি ইরানের তরুণ প্রজন্মের চাহিদা বুঝতে পারেননি, যারা একাকীত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের
সঙ্গে ছায়া যুদ্ধের বদলে সংস্কার ও অর্থনৈতিক উন্নতি চেয়েছিল।
ভ্যালি নাসর বলেন, “ইরানিরা জাতীয় স্বাধীনতার জন্য অনেক বড় মূল্য দিয়েছে—এই প্রক্রিয়ায় তিনি জনগণের সমর্থন হারিয়েছেন, কারণ তারা আর এই স্বাধীনতার যৌক্তিকতায় বিশ্বাস করত না।”
শুরুর জীবন
১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব
ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে খামেনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন বিখ্যাত মুসলিম
নেতা এবং জাতিগতভাবে আজারবাইজানি।
খামেনি তার মা খাদিজেহ্
মিরদামাদিকে একজন উৎসাহী কুরআন ও বই পাঠক হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যিনি তার মধ্যে সাহিত্য
ও কবিতার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করেছিলেন।
খামেনি চার বছর বয়সে
কুরআন শেখার মাধ্যমে পড়াশোনা শুরু করেন। তিনি হাইস্কুল শেষ না করে ধর্মতত্ত্ব স্কুলে
যোগ দেন এবং তৎকালীন বিখ্যাত আলেমদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে তিনি নাজাফ
ও কোমের মতো বিখ্যাত শিয়া শিক্ষা কেন্দ্রে পড়াশোনা করেন। কোম শহরে তিনি আয়াতুল্লাহ
রুহুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ হন, যিনি শাহ-বিরোধী অবস্থানের কারণে তরুণ শিক্ষার্থীদের
কাছে জনপ্রিয় ছিলেন।
খামেনি ধর্মতত্ত্ব
পড়াতেন, যা তাকে তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল যারা রাজতন্ত্রের
ওপর বিরক্ত ছিল।
১৯৫৩ সালে সিআইএর
মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারকে সরিয়ে রাজতন্ত্রকে পূর্ণ ক্ষমতায় আনা হয়েছিল, যা খামেনি
ও তার অনুসারীরা মেনে নিতে পারেননি।
একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে খামেনি বারবার গ্রেপ্তার হন এবং নির্বাসিত হন, কিন্তু ১৯৭৮ সালের বিক্ষোভে অংশ নিতে ফিরে আসেন, যা পাহলভি শাসনের অবসান ঘটায়।
সর্বোচ্চ নেতা
হিসেবে দায়িত্ব
রাজতন্ত্র পতনের
পর খামেনি নতুন ইরান গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৮০ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী
এবং পরে আইআরজিসির সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮১ সাল খামেনির
জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর ছিল। একটি হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে গেলেও তিনি তার ডান হাতের
কার্যক্ষমতা হারান। সেই বছরই তিনি ইরানের প্রথম আলেম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
১৯৮৯ সালে খোমেনির
মৃত্যু ছিল ইরানের জন্য একটি মোড়। খোমেনি তার পূর্বনির্ধারিত উত্তরসূরিকে সরিয়ে দেওয়ার
পর একটি কাউন্সিল খামেনিকে মনোনীত করে।
মনোনীত হওয়ার সময়
খামেনি বলেছিলেন, “আমি মনে করি না আমি এই পদের যোগ্য; এটি হয়তো কেবল একটি প্রতীকী নেতৃত্ব
হবে।”
কিন্তু তার নেতৃত্ব
মোটেও প্রতীকী ছিল না। খামেনির শুরুর দিকের প্রধান কাজ ছিল ইরাক যুদ্ধের পর ধ্বংসস্তূপ
থেকে দেশকে পুনর্গঠন করা।
যুদ্ধের ময়দানে বারবার
যাওয়ার কারণে তিনি সামরিক বাহিনীর (আিইআরজিসি) আনুগত্য লাভ করেন এবং যুদ্ধের বাস্তবতা
গভীরভাবে বুঝতে পারেন।
অধ্যাপক নারগেস বাজঘলি
বলেন, “খামেনি এমন একজন নেতা যার মানসিকতা ইরাক যুদ্ধের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। তিনি সবসময়
ইরানকে একটি অবরুদ্ধ দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন।”
১৯৯০-এর দশকে সংস্কারপন্থী
মোহাম্মদ খাতামি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনার কথা বললে খামেনি
সেটিকে বিদ্যমান ব্যবস্থার জন্য হুমকি মনে করেন।
খামেনি আইআরজিসিকে
অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেন এবং তরুণ প্রজন্মকে তার আদর্শে গড়ে তোলার
জন্য প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন।
২০০৯ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত জয়ের পর যখন বিশাল বিক্ষোভ (গ্রিন মুভমেন্ট) শুরু হয়, তখন খামেনি সেই ফলাফলকে সমর্থন করেন এবং বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়। ইরানি নেতৃত্ব এই অস্থিরতার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোকে দায়ী করে।
‘শান্তিও নয়,
যুদ্ধও নয়’
খামেনি একজন বাস্তববাদীও
ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন পশ্চিমাদের সঙ্গে লড়াই কেবল যুদ্ধ দিয়ে নয়, প্রয়োজনে আলোচনার
মাধ্যমেও করতে হবে।
২০১৫ সালে অর্থনৈতিক
সংকটের কারণে তিনি পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) স্বাক্ষরের অনুমতি দেন যাতে নিষেধাজ্ঞা
কিছুটা কমে।
তবে তিন বছর পর ডোনাল্ড
ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে বের হয়ে গেলে খামেনি পুনরায় আক্রমণাত্মক অবস্থানে ফিরে যান
এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা বন্ধ করে দেন।
২০১৯ সালে জ্বালানির
দাম বাড়ার কারণে বিক্ষোভ শুরু হলে তিনি বিক্ষোভকারীদের “সন্ত্রাসী” বলে অভিহিত করেন
এবং কঠোর ব্যবস্থা নেন।
ইব্রাহিম রাইসি প্রেসিডেন্ট
হওয়ার পর খামেনি প্রতিরোধ অর্থনীতির ওপর জোর দেন এবং পূর্বদিকের দেশগুলো যেমন চীন, রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা বাড়ানোর চেষ্টা করেন।
২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী বিক্ষোভ খামেনির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তিনি এই বিক্ষোভকে সরাসরি বিদেশি হস্তক্ষেপ বলে দাবি করেন।
‘প্রতিরোধের অক্ষ’
খামেনি বিশ্বাস করতেন
ইরানের বাইরে মিত্রদের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে শত্রুরা সরাসরি ইরানে
আক্রমণ করতে না পারে। এর মূল কারিগর ছিলেন কাসেম সোলেইমানি, যাকে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র
হত্যা করে।
এই মিত্রদের তালিকায়
ছিল লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার আসাদ সরকার, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী।
কিন্তু ২০২৩ সালের
৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এই নেটওয়ার্ক দুর্বল হতে শুরু করে। ইসরায়েল গাজায় হামলা
চালায় এবং হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরাল্লাহসহ অনেক নেতাকে হত্যা করে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে
সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর ইরানের প্রভাব আরও কমে যায়।
এই দুর্বলতার সুযোগ
নিয়ে ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ইরানের পরমাণু কেন্দ্র ও সামরিক স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা
চালায়।
ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র
হামলা চালালে দুই সপ্তাহের পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের
পরমাণু স্থাপনায় বড় ধরনের বোমা হামলা করে।
ট্রাম্প খামেনির
“নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” দাবি করলেও খামেনি দমে যাননি। তিনি বলেছিলেন, “ইরানি জাতি কখনোই
আত্মসমর্পণ করবে না।”
যুদ্ধের সময় দেশপ্রেমের
কারণে মানুষ পাশে থাকলেও, পরে অর্থনৈতিক ধসের কারণে আবার তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয়। মানবাধিকার
সংস্থাগুলোর মতে, এতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়।
সবশেষে, ২০২৬ সালের
২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে “বড় ধরনের সামরিক অভিযান” শুরু
করেছে এবং তিনি সরাসরি সরকার পরিবর্তনের ডাক দেন।
ট্রাম্প ইরানিদের
উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনাদের স্বাধীনতার সময় এসেছে... যখন আমরা শেষ করব, তখন সরকার আপনাদের
হাতে থাকবে।”