প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৯:০২ পিএম
আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৯:০৪ পিএম
ইরানে অন্তত ১৪টি স্থানে শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা চালিয়েছে। হামলার পর তেহরান থেকে ধোয়া উড়তে দেখা যায়। ছবি: এপি
ইরানের রাজধানী তেহরানের অন্তত ১৪ স্থানে শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যৌথ বোমা হামলা চালিয়েছে, তার মূল লক্ষ্যবস্তু কেবল সামরিক ঘাঁটি বা পারমাণবিক কেন্দ্র নয়, বরং দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব। কোনো কোনো সমরবিদ এটাকে বলছেন ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ বা ‘নেতৃত্ব নির্মূল’ কৌশল।
তবে এই হামলাকে ‘প্রি-অ্যাম্পটিভ’ বা ‘প্রতিরোধমূলক আগাম হামলা’ হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।
কিন্তু কেন প্রথাগত যুদ্ধের বদলে এবার এই চরম পন্থায় হাঁটছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব?
দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের হুমকি-ধামকি আর ব্যর্থ আলোচনার পর তেহরানসহ ইরানের প্রধান শহরগুলোর কৌশলগত অবস্থানে শুরু হওয়া এই বিধ্বংসী হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘মেজর কমব্যাট অপারেশন’ বা ‘মহাযুদ্ধ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র শনিবার ভোরে হামলার মধ্য দিয়ে এই অপারেশনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে আল জাজিরা জানায়, এটি একটি যৌথ অভিযান যেখানে মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনীর বিশাল বহর অংশ নিচ্ছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যম ‘ফার্স নিউজ’ জানিয়েছে, তেহরানের প্রাণকেন্দ্র জমহুরি এলাকা এবং ইউনিভার্সিটি স্ট্রিটে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
ইরানের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হামলার লক্ষ্যবস্তু থেকে বাদ যায়নি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কার্যালয় এবং রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) সদর দপ্তর।
তেহরান ছাড়াও কেরমানশাহ, কোম, তাবরিজ ও ইসফাহানের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো এই হামলায় আক্রান্ত হয়েছে।
দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের শহর মিনাবে মেয়েদের একটি স্কুলে হামলায় অন্তত ৫১ জন নিহত ও ৬০ জন আহত হয়েছে বলে বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে।
হামলার পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প আক্রমণাত্মক এক বার্তায় বলেন, “ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে এবং তাদের নৌবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করা হবে।”
হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের মতো গোষ্ঠীগুলোকে ইরানি সহায়তার পথ চিরতরে বন্ধ করতেই এই আক্রমণ—এমনই বার্তা ট্রাম্পের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলার মূল উদ্দেশ্য কেবল সামরিক স্থাপনা ধ্বংস নয়, বরং ১৯৫৩ সালের সিআইএ অভ্যুত্থানের মতো এবার সরাসরি বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা বা ‘নেতৃত্ব বদল’ নিশ্চিত করা।
আল জাজিরার ওয়াশিংটন প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যালান ফিশার এই হামলাকে ১৯৫৩ সালের সিআইএ অভ্যুত্থানের আধুনিক ও বিধ্বংসী সংস্করণ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এবার আর গোপনে নয়, বরং সরাসরি বোমা মেরে ইরানকে ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ আলী হাশেমের মতে, এই হামলার মূল লক্ষ্য হলো ‘ডিক্যাপিটেশন’ বা নেতৃত্ব নির্মূল। অর্থাৎ শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দিয়ে পুরো কমান্ড সিস্টেমকে পঙ্গু করে দেওয়া, যাতে তারা আর পাল্টা কোনো বড় হামলার নির্দেশ দিতে না পারে।
হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
রয়টার্সের দাবি, খামেনিকে তেহরান থেকে কোনো এক গোপন বাঙ্কারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আর প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এখনো অক্ষত আছেন বলে দাবি করেছে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা।
আক্রমণের জবাবে ইরানও তীব্র পাল্টা আঘাত শুরু করেছে। উত্তর ইসরায়েল লক্ষ্য করে তেহরান ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে, যার ফলে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে অবিরাম সাইরেন ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
ইসরায়েলের পর বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। সেসব স্থান থেকে ধোয়া উঠার ছবিও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এসেছে।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “তোমরা এমন এক পথ বেছে নিয়েছ, যার শেষ তোমাদের হাতে নেই।”
গত কয়েক মাস ধরেই ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিচ্ছিলেন। ট্রাম্পের ভাষায়, খামেনিই ছিলেন তার জন্য একটি ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’।
এই মুহূর্তে হতাহতের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এটি একটি ‘মাল্টি-ডে অপারেশন’ বা কয়েক দিনব্যাপী চলা অভিযান হতে যাচ্ছে। এই যুদ্ধের পরিণতি শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে স্থায়ীভাবে বদলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের চেয়ে শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিয়ে দ্রুত জয় হাসিল করা এবারের যুদ্ধ-কৌশলের অন্যতম উদ্দেশ্য।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মনে করে, ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক নেতৃত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হানলে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, যা তাদেরকে দ্রুত আত্মসমর্পণ করতে বা আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করবে।
সামরিক তাত্ত্বিকদের মতে, ইরানের মতো দেশগুলোতে ক্ষমতা অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। এখানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং রেভল্যুশনারি গার্ডসের শীর্ষ কর্মকর্তারা হলেন রাষ্ট্রের শক্তির মূল আধার। এই কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত করলে পুরো রাষ্ট্র কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে বলে আক্রমণকারীরা বিশ্বাস করে।
প্রেসিডেন্ট
ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, এই হামলার অন্যতম
লক্ষ্য হলো ইরানি জনগণকে
বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উদ্বুদ্ধ করা।
নেতৃত্ব নির্মূলের মাধ্যমে বর্তমান কাঠামোকে দুর্বল করে সেখানে পশ্চিমা-বান্ধব বা ভিন্ন কোনো
শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করাই
এই কৌশলের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য।
ইরান মধ্যপ্রাচ্যে হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের মতো বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সহায়তা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে এই ‘ছায়া’ গোষ্ঠীগুলোর কাছে অর্থ ও অস্ত্রের জোগান বন্ধ হয়ে যাবে, ফলে পুরো অঞ্চলে ইরানের প্রভাব এক নিমেষেই কমে আসবে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল কেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সরিয়ে দিতে চায়?
কারণ, ইরানের শাসনব্যবস্থায় খামেনি কেবল একজন ধর্মীয় নেতা নন, ১৯৮৯ সাল থেকে ইরান শাসন করে আসছেন, যিনি দেশটির সর্বোচ্চ সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী। সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ ও পররাষ্ট্রনীতি—সবকিছুই তার নির্দেশে চলে।
যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, খামেনিকে সরিয়ে দিলে ইরানের পুরো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ভেঙে পড়বে, যা দেশটিকে একটি বড় ধরনের নেতৃত্ব সংকটে ফেলবে।
এ পরিস্থিতিতে খামেনি তার ৩৬ বছরের শাসনামলের সবচেয়ে গুরুতর সংকটের মুখোমুখি, যদিও তিনি শনিবারের যৌথ হামলা থেকে বেঁচে গেছেন।
একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, হামলাটি বিশেষভাবে খামেনিকে লক্ষ্য করে করা হয়েছিল, তবে বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞাত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সর্বোচ্চ নেতা তেহরানে ছিলেন না এবং তাকে একটি নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে।
প্রায় চার দশক ধরে খামেনি উপসাগরীয় অঞ্চলের সুন্নি মুসলিম রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য একটি আঞ্চলিক শক্তি গড়ে তুলেছিলেন এবং একই সঙ্গে পারমাণবিক প্রযুক্তির উন্নয়ন করেছিলেন, যা আশেপাশের অঞ্চলগুলিকে অস্থির করে তুলেছিল।
আর ইরানও অবিশ্বাস্যভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি শত্রুতাপূর্ণ আচরণ করেছে; একই সঙ্গে দেশটির ভিতরও বার বার অস্থিরতা দমন করছে।
কিন্তু শনিবারের ইরানের ওপর হওয়া হামলা আরও সংকটের মধ্যে ফেলল দেশটিকে।
গত জুনে খামেনি আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হন, যেখানে বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার নিহত হন।
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের মূল্যবান পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়।
জানুয়ারিতে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে ক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীর বিশাল বিক্ষোভ হাজারো প্রাণের বিনিময়ে দমন করা হয়েছিল।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর তেহরান-সমর্থিত হামাস ইসরায়েলে আক্রমণ করার পর থেকে খামেনির আঞ্চলিক প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ছে।