প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:৩৩ পিএম
আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০১:২৭ এএম
ডিজিটাল অর্থনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক উদ্যোগ—যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবারটি ফিনান্সিয়াল–এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সমঝোতা নিয়ে অর্থনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকার একে প্রবাসী আয়ের লেনদেন খরচ কমানো ও নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরলেও অর্থনীতিবিদদের একাংশ সতর্ক করছেন, এর গভীর প্রভাব পড়তে পারে সামষ্টিক অর্থনীতিতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলার–পেগড বা ডলার–সংযুক্ত স্টেবলকয়েন কেবল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়; এটি কার্যত মার্কিন ডলারকে বিকল্প হিসাব একক, মূল্য সংরক্ষণ মাধ্যম ও লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। পাকিস্তানের মতো দুর্বল মুদ্রা, সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বারবার ব্যালান্স অব পেমেন্টস চাপে থাকা অর্থনীতিতে এটি “নীরব ডলারাইজেশন” ত্বরান্বিত করতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড (আইএমএফ) ইতোমধ্যেই উদীয়মান অর্থনীতিতে স্টেবলকয়েনের ব্যাপক ব্যবহার নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা স্থানীয় ব্যাংক থেকে আমানত সরিয়ে নিতে পারে এবং দুর্বল মুদ্রানীতির দেশগুলোতে আর্থিক স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন করতে পারে। একইভাবে ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস জানিয়েছে, বেসরকারি স্টেবলকয়েন “সুস্থ মুদ্রা”র মৌলিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হতে পারে এবং আর্থিক সার্বভৌমত্বে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের ব্যাখ্যা, যদি ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরা পাকিস্তানি রুপির বদলে ডলার–সংযুক্ত স্টেবলকয়েন ধরে রাখতে শুরু করেন, তবে রুপির চাহিদা কমবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ বাড়বে এবং সামান্য আস্থাহীনতাও দ্রুত মুদ্রার অবমূল্যায়নে রূপ নিতে পারে। সীমিত রিজার্ভ ও প্রত্যাশাভিত্তিক বাজার কাঠামোর কারণে এই চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতীতে ক্রিপ্টো লেনদেনের ব্যাপারে সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল। ২০১৮ সালের এক সার্কুলারে ভার্চুয়াল কারেন্সি লেনদেন থেকে নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভাষাগত নমনীয়তা এলেও, ২০২৫ সালের মে মাসে এসবিপি জানায় যে তারা এখনো কোনো ক্রিপ্টো কার্যক্রমের লাইসেন্স দেয়নি এবং কেবল একটি সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরির বিষয়ে অনুসন্ধানমূলক কাজ করছে।
আরেকটি উদ্বেগ হলো আর্থিক মধ্যস্থতা দুর্বল হয়ে পড়া। স্টেবলকয়েন ব্যবহারে অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ডিজিটাল ওয়ালেটে সরে যেতে পারে। এতে আমানত কমে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার ও তারল্য ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা হ্রাস পেতে পারে। ফলে মুদ্রানীতির প্রভাব কমে যেতে পারে এবং আর্থিক চাপের সময় পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে।
এছাড়া ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স –এর নজরদারি থেকে সদ্য বেরিয়ে আসা পাকিস্তানের জন্য আর্থিক স্বচ্ছতা ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক–নিয়ন্ত্রিত লেনদেন ব্যবস্থায় যে নথিভুক্তি ও পর্যবেক্ষণ সম্ভব, স্টেবলকয়েন–ভিত্তিক ব্যবস্থায় তা জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সবশেষে, বেসরকারি স্টেবলকয়েন মূলত ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের দায়—সার্বভৌম মুদ্রা নয়। রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, তারল্য ঝুঁকি বা বিদেশি নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের মতো বিষয়গুলোতে পাকিস্তানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে কোনো আন্তর্জাতিক অস্থিরতা বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি দেশীয় ব্যবহারকারীদের ওপর পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মত, প্রযুক্তিগত সুবিধার আড়ালে পাকিস্তানের এই ক্রিপ্টো উদ্যোগ রুপির ওপর চাপ বাড়িয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। সরকার যেখানে ডিজিটাল উদ্ভাবনের সুযোগ দেখছে, সেখানে অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন—এই পথ কি স্থিতিশীলতার, নাকি অদৃশ্য ঝুঁকির?