ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৪০ পিএম
হরমুজ প্রণালীতে ১৭ ফেব্রুয়ারি ইরানের সামরিক মহড়ার সময় একটি ট্যাঙ্কারের চারপাশে কয়েকটি নৌযান চলছে। ছবি: এএফপি
যখনই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে, তখনই একটি সরু জলপথ বিশ্ববাসীর নজরে চলে আসে; আর সেটি হলো হরমুজ প্রণালী।
সম্প্রতি পারমাণবিক শক্তিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হওয়ায় এই উত্তেজনা তুঙ্গে পৌঁছেছে।
২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর এটিই এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ, যেখানে এবার সরাসরি ওয়াশিংটনের লক্ষ্যবস্তুতে রয়েছে ইরান।
প্রতিউত্তরে ইরান এই মাসের শুরুতেই রণকৌশল হিসেবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’, যে পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ করা হয় তা সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা ও সামরিক মহড়া চালিয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে প্রণালীর কিছু অংশে বিরলভাবে কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।
ওয়াশিংটন যদি ইরানকে আক্রমণ করার হুমকি কার্যকর করে, তবে এর অর্থনৈতিক পরিণতি কী হতে পারে—এটি ছিল তারই একটি সতর্কবার্তা। এটি আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, একটি আঞ্চলিক সংঘাত কত দ্রুত বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালী কোথায় অবস্থিত?
হরমুজ প্রণালী হলো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত জলপথ, যাকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের প্রধান ‘চোকপয়েন্ট’ বা প্রবেশদ্বার বলা হয়।
ভৌগোলিকগতভাবে এই বাঁকানো জলপথটির উত্তর দিকে ইরান এবং দক্ষিণ দিকে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অবস্থিত। এটি পারস্য উপসাগর এবং আরব সাগরের মধ্যে একমাত্র সামুদ্রিক সংযোগ পথ হিসেবে কাজ করে।
এই প্রণালীটি এর প্রবেশ ও বাহির পথে প্রায় ৫০ কিলোমিটার প্রশস্ত হলেও এর সবচেয়ে সরু অংশটি মাত্র ৩৩ কিলোমিটারের মতো।
অত্যন্ত সরু হওয়া সত্ত্বেও এই গভীর চ্যানেলটি দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজগুলো অনায়াসে চলাচল করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলো বিশ্ববাজারে তাদের পণ্য পাঠাতে সম্পূর্ণভাবে এই একটি পথের ওপরই নির্ভর করে।
অন্যদিকে, বিশ্বের আমদানিকারক রাষ্ট্রগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এই প্রণালীর নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রমের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল।
এই প্রণালী দিয়ে কী পরিমাণ তেল ও গ্যাস যায়?
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) মতে, ২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হয়েছে।
এটি বার্ষিক প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি বাণিজ্যের সমান, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে এই জলপথের গুরুত্বকে ব্যাপকভাবে তুলে ধরে।
এই পথ দিয়ে যাওয়া অপরিশোধিত তেল মূলত ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে। দীর্ঘদিন সরবরাহ বন্ধ থাকলে তা উৎপাদনকারী এবং তাদের রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেবে।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এই প্রণালী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের মোট এলএনজি চালানের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে গেছে, যার বড় অংশই কাতারের।
এই সব তেল-গ্যাস কোথায় যায়?
হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রবাহিত জ্বালানি তেলের সিংহভাগই এশিয়ার দেশগুলোতে রপ্তানি করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন বা ইআইএ-এর ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, এই পথ দিয়ে যাওয়া অপরিশোধিত তেল ও ঘনীভূত তেলের প্রায় ৮৪ শতাংশই এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে গিয়েছে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও চিত্রটি প্রায় একই রকম; কারণ মোট এলএনজি চালানের ৮৩ শতাংশের গন্তব্য ছিল এশিয়ার দেশগুলো।
বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া গত বছর এই প্রণালী দিয়ে আসা মোট তেলের ৬৯ শতাংশ ব্যবহার করেছে। মূলত এই দেশগুলোর বিশাল শিল্পকারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসা এই জ্বালানির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল।
অন্যদিকে, এই প্রণালী দিয়ে এলএনজি উভয় দিকেই চলাচল করে। উপসাগরীয় দেশগুলো যেমন গ্যাস রপ্তানি করে, তেমনি কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো আবার তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম আফ্রিকার মতো উপসাগরের বাইরের দেশগুলো থেকে এই পথেই গ্যাস আমদানি করে থাকে।
ইরানের হাতে কী বিকল্প আছে?
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, একটি দেশ তাদের উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল (২২ কিমি) পর্যন্ত সার্বভৌমত্ব ভোগ করে।
সবচেয়ে সরু অংশে হরমুজ প্রণালী এবং এর জাহাজ চলাচলের পথগুলো পুরোপুরি ইরান ও ওমানের জলসীমার মধ্যে পড়ে। এই আইনি বাস্তবতা তেহরানকে ভৌগোলিক সুবিধা দেয়। প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার জাহাজ এই প্রণালী পার হয়।
ইরান যদি যানচলাচল বাধাগ্রস্ত করতে চায়, তবে দ্রুতগামী নৌযান ও সাবমেরিন ব্যবহার করে সমুদ্র মাইন বসানো হবে তাদের অন্যতম কার্যকর কৌশল। তেহরানের নৌবহরে জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রবাহী নৌযান এবং বিশেষ ধরনের সাবমেরিন রয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্ট গত বছর হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিষয়টিকে আরও জটিল করতে পারে। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী, যাদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, তারা বাব আল-মান্দাব প্রণালীতে চলাচল ব্যাহত করার চেষ্টা করতে পারে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের পর থেকে ওই পথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হুথিরা সম্প্রতি একটি বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য তাদের প্রস্তুতির সংকেত দিয়েছে।
হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব—এই দুই প্রণালীতে একসঙ্গে চাপ সৃষ্টি হলে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।
বিশ্ব তেলের বাজারে প্রভাব
এনার্জি ইন্টেলিজেন্সের কোলবি কনেলি আল জাজিরাকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালী পূর্ণ বা আংশিক বন্ধ হলে তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে যে পরিমাণ তেল আসে, তা অন্য কোনো উৎস দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
সৌদি আরব তাদের তেল রপ্তানির জন্য এই প্রণালীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল; তারা প্রতিদিন প্রায় ৫৫ লাখ ব্যারেল তেল এই পথে পাঠায়। ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই যায় চীনে।
সৌদি আরব ও আমিরাতের কিছু বিকল্প পাইপলাইন আছে, কিন্তু সেগুলোর ক্ষমতা সীমিত।
কনেলি সতর্ক করেছেন, বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের অনেক উপরে উঠে যেতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব
জ্বালানি প্রবাহে বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানি ও কারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, বিশেষ করে চীনের মতো দেশের জন্য যারা রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল।
জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাদের পকেট কাটবে।
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের স্যামুয়েল রামানি সতর্ক করেছেন, “এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি ঘটাবে।”
ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক এবং গ্যাসের ৬০ শতাংশ এই পথ দিয়ে আসে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের অবস্থাও একই।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যও এটি বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। দুবাইয়ের বিনিয়োগকারীরা পর্যটন ও অর্থ খাত নিয়ে চিন্তিত।
রামানি আরও যোগ করেন, এটি কেবল রপ্তানি বা দামের বিষয় নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুতর বৈশ্বিক আর্থিক সংকট তৈরি করবে।