প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:৪৬ পিএম
আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:৪৯ পিএম
ইরানের তেহরানে এক ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দূতাবাসের বাইরের দেয়ালে আঁকা দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে হাঁটছেন, যেখানে ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’র মশালধারী বাহু ভাঙা দেখানো হয়েছে। ছবিটি ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে তোলা হয়েছে। ছবি: এএফপি
জাতিসংঘে ইরানের দূত বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ‘সামরিক আগ্রাসন’ চালায়, তাহলে তেহরান ‘দৃঢ়ভাবে’ জবাব দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির নিন্দা জানাতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে আহ্বান জানিয়ে দেওয়া এক চিঠিতে তিনি এ কথা বলেন।
জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলো এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের প্রতি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, ট্রাম্প সম্প্রতি ভারত মহাসাগরের চাগোস দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত একটি বিমানঘাঁটি সম্ভাব্য ইরান হামলায় ব্যবহারের হুমকি দিয়েছেন।
ইরাভানি লেখেন, “অঞ্চলের অস্থির পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সামরিক সরঞ্জাম ও সম্পদ জড়ো করার প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এমন যুদ্ধংদেহী বক্তব্যকে কেবল কথার কথা হিসেবে দেখা উচিত নয়।”
ইরানি দূত জোর দিয়ে বলেন, তার দেশ “না উত্তেজনা চায়, না যুদ্ধ; এবং কোনো যুদ্ধ শুরু করবে না।”
তবে তিনি সতর্ক করেন, ইরানের ওপর হামলা হলে অঞ্চলজুড়ে “শত্রুপক্ষের সব ঘাঁটি, স্থাপনা ও সম্পদকে” বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
‘অর্থবহ চুক্তি’ না হলে সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত
ট্রাম্প সতর্ক করে বৃহস্পতিবার বলেন, তেহরানের কাছে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি ‘অর্থবহ চুক্তি’ করার জন্য ১০ থেকে ১৫ দিন সময় রয়েছে। এ সময় তিনি ওয়াশিংটনে তার নবগঠিত ‘শান্তি পরিষদের’ প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের আতিথ্য দিচ্ছিলেন।
ট্রাম্প বলেন, “এখন হয়তো আমাদের বিষয়টি আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে হবে, অথবা নাও নিতে পারি,”— যা সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “হয়তো আমরা একটি চুক্তি করব। আগামী প্রায় ১০ দিনের মধ্যে আপনারা তা জানতে পারবেন।”
পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আমি মনে করি ১০–১৫ দিন যথেষ্ট সময়, মোটামুটি সর্বোচ্চ।”
এর আগে ওয়াশিংটনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, গত বছরের জুনে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা ইরানের বিরুদ্ধে চালানো হয়েছিল, যা গাজায় “যুদ্ধবিরতির” পথ তৈরি করেছিল।
তার দাবি, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা না হলে ইরানের “হুমকি” মধ্যপ্রাচ্যে দেশগুলোর “শান্তি” প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত।
‘নইলে খারাপ কিছু ঘটবে’: ট্রাম্প
সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা এমন সময়ে দেখা দিল, যখন কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দ্বিতীয় দফা পরোক্ষ আলোচনা করেছে—যা মোটামুটি ইতিবাচক বলেই বর্ণনা করেছিল
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বুধবার জানান, জেনেভার আলোচনায় দুই পক্ষ “ভালো অগ্রগতি” করেছে এবং একটি চুক্তির জন্য “মৌলিক নীতিমালার ব্যাপক ঐকমত্যে” পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।
ট্রাম্পও বৃহস্পতিবার বলেন, তার কূটনৈতিক সহকারীরা—স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার—ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে “খুব ভালো বৈঠক” করেছেন।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “আমাদের একটি অর্থবহ চুক্তি করতে হবে। নইলে খারাপ কিছু ঘটবে।”
আলোচনা চলমান থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে চলেছে। সেখানে দুটি বিমানবাহী রণতরী ও ডজনখানেক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তারা ট্রাম্পের লাগাতার হুমকির জবাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, “আমেরিকানরা বারবার বলে তারা ইরানের দিকে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। অবশ্যই, যুদ্ধজাহাজ একটি বিপজ্জনক সামরিক সরঞ্জাম।”
তিনি যোগ করেন, “কিন্তু সেই যুদ্ধজাহাজকে সাগরের তলদেশে পাঠাতে পারে—এমন অস্ত্র তার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক।”
উত্তেজনার পটভূমি
২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। ডিসেম্বরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আতিথ্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দেন, ইরান যদি তার পারমাণবিক বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করে, তবে আবার হামলা চালানো হবে।
এর কিছুদিন পর ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। সে সময় ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলে নেওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, “সহায়তা আসছে।”
গত মাসে ট্রাম্প কিছুটা নমনীয় অবস্থান নেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ইরান ভিন্নমতাবলম্বীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করতে সম্মত হয়েছে।
এরপর দুই দেশ আবার আলোচনা শুরু করে।জুনের যুদ্ধের পর প্রথম দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ওমানে, ৬ ফেব্রুয়ারি।
এরপর জেনেভায় দ্বিতীয় দফা আলোচনা হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতেই বর্তমানে নতুন করে সময়সীমা, হুমকি ও কূটনৈতিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও টানাপোড়েনের মুখে দাঁড়িয়েছে।