প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১৩ এএম
আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৪৯ এএম
ভারতে সাপের কামড়ে প্রতিবছর ৫০ হাজার মানুষ মারা যান, যা বিশ্বব্যাপী সাপের কামড়ে মোট মৃত্যুর অর্ধেক। ছবি: সংগৃহীত
তুঁত পাতা তুলতে গিয়ে সাপের কামড় খেয়েছিলেন ভারতের কৃষক দেবেন্দ্র। সেই স্মৃতি তিনি আজও ভুলতে পারেননি। দেবেন্দ্র বলেন, “কামড়ের চার দিন পর ব্যথা অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন আমি হাসপাতালে যাই। কিন্তু দেরি হয়ে যাওয়ায় আমার পা কেটে ফেলতে হয়েছে।”
সাপের কামড়ে মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব কমাতে কাজ করা গ্লোবাল স্নেকবাইট টাস্কফোর্স (জিএসটি) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন দেবেন্দ্র।
তবে দেবেন্দ্র ভাগ্যবানদের একজন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশটিতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সাপের কামড়ে মারা যান- যা বিশ্বব্যাপী সাপের কামড়ে মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক। কিছু হিসাব বলছে, মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
২০২০ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভারতে সাপের কামড়ে প্রায় ১২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে, অর্থাৎ বছরে গড়ে ৫৮ হাজার।
বিবিসি সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনটি করেছেন মুম্বাইয়ের বিবিসি সাংবাদিক চেরিল্যান মোলান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতে এতো মৃত্যুর একটি কারণ হলো- অ্যান্টিভেনমের সীমিত প্রাপ্যতা। বর্তমানে ভারতে যে অ্যান্টিভেনম রয়েছে, তা মূলত চারটি সাপের বিরুদ্ধে কার্যকর- চশমা গোখরা, কমন ক্রেইট, রাসেল ভাইপার ও স’স্কেলড ভাইপার। এই চারটি সাপকেই অধিকাংশ সাপের কামড়ের জন্য দায়ী করা হয়।
কিন্তু ভারতে আরও বহু বিষধর সাপ রয়েছে, যাদের জন্য নির্দিষ্ট অ্যান্টিভেনম নেই। এর মধ্যে রয়েছে হিমাচল প্রদেশে পাওয়া সবুজ পিট ভাইপার, দক্ষিণ ভারতের মালাবার পিট ভাইপার ও হাম্প-নোজড পিট ভাইপার এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন প্রজাতির সাপ।
জিএসটি এর এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে ৯৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী অ্যান্টিভেনম প্রয়োগে নানা সমস্যার মুখে পড়েন। গবেষকরা ভারত, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়ার ৯০৪ জন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর জরিপ চালিয়েছেন। এই দেশগুলো সাপের কামড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশগুলোতে দুর্বল অবকাঠামো, অ্যান্টিভেনমের সীমিত প্রাপ্যতা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে।
জিএসটি সদস্য ও ছত্তিশগড় রাজ্যের চিকিৎসক ডা. যোগেশ জৈন বলেন, ভারতে সাপের কামড়ে মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা মূলত মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে বেশি দেখা যায়। তার মতে, কৃষিকাজে নিয়োজিত মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র আদিবাসী জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
তুঁত পাতা কুড়ানোর সময় সাপে কামড়ানোর পর দেবেন্দ্রের পা কেটে ফেলতে হয়। ছবি: বিবিসি
ডা. জৈন বলেন, “ভারতে সাপের কামড়কে দরিদ্র মানুষের সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। এ কারণেই এসব সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু নিয়ে তেমন ক্ষোভ বা কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। অথচ সাপের কামড়ের চিকিৎসায় প্রতিটি সেকেন্ডই গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, সাপের বিষ কয়েক মিনিটের মধ্যেই রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে এবং সাপের প্রজাতিভেদে স্নায়ুতন্ত্র, কোষ বা রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থায় আঘাত হানে। অ্যান্টিভেনম দিতে দেরি হলে শ্বাসযন্ত্র বিকল হওয়া, পক্ষাঘাত, স্থায়ী টিস্যু ক্ষতি বা অঙ্গ বিকল হয়ে যেতে পারে।
তবুও গ্রামীণ ভারতে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হওয়া খুবই সাধারণ বিষয়। খারাপ সড়ক ব্যবস্থা, দূরবর্তী হাসপাতাল এবং পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া যায় না।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো- গ্রামীণ ভারতের বহু মানুষ এখনও ঝাড়ফুঁক বা লোকজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেন এবং অবস্থা গুরুতর না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে যান না, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালে ভারত সরকার সাপের কামড় প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ‘ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান ফর প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল অব স্নেকবাইট এনভেনোমিং (এনএপিএসই)’ চালু করে। এর লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা। এই পরিকল্পনায় উন্নত নজরদারি, অ্যান্টিভেনমের প্রাপ্যতা ও গবেষণা বৃদ্ধি, চিকিৎসা সক্ষমতা জোরদার এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি সঠিক উদ্যোগ হলেও বাস্তবায়ন এখনও অসম ও অসংগতিপূর্ণ।
২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সাপের কামড়জনিত বিষক্রিয়াকে ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উপেক্ষিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। ডব্লিউএইচও-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং এর মধ্যে এক লাখের বেশি মানুষ মারা যান।
সংস্থাটি আরও জানায়, সাপের কামড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের দরিদ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠী।