যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনা
আলি হারব, আল জাজিরা
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৪ পিএম
আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৯ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: এএফপি
ইরানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মাঝে ট্রাম্পের লক্ষ্য একটাই—‘জয়’। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, তেহরানের আদর্শিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সামরিক জয়ের কোনো সহজ পথ নেই; বরং যেকোনো হামলা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুতর রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বর্তমানে সংকটের মধ্যে থাকলেও দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক হামলার জবাবে তেহরান এবার তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে—যা আগের মতো প্রতীকী বা সীমিত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।
ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলাইমানিকে ২০২০ সালে হত্যার ঘটনা কিংবা ২০২৫ সালের জুনে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর তেহরানের প্রতিক্রিয়া ছিল তুলনামূলকভাবে সংযত। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরানের জবাব ভিন্ন হতে পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার উদ্দেশ্যে ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ (নেতৃত্ব ধ্বংসে হামলা) চালানো হলেও সরকার ভেঙে পড়বে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং এতে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সূচনা হতে পারে বলে মত আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের।
তাদের মতে, এমন সংঘাতে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, যুক্তরাষ্ট্র নিজেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক বারবারা স্ল্যাভিন বলেন, “প্রায় সব বিকল্পই ভয়াবহ। ‘এ’ বা ‘বি’ করলে ঠিক কী ঘটবে, তার পরিণতি কী হবে—তা বলা অত্যন্ত কঠিন।
বিশেষ করে সরকার (ইরান) যদি মনে করে তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তাহলে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।”
সামরিক হুমকি, আবার সংযমের বার্তা
চলতি বছরের শুরু থেকে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর ট্রাম্প একাধিকবার সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২ জানুয়ারি তিনি লেখেন, “ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের গুলি করে হত্যা করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে। আমরা প্রস্তুত।”
পরবর্তী দুই সপ্তাহে একই ধরনের হুঁশিয়ারি পুনরাবৃত্তি করেন তিনি। এমনকি বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানান—এই আশ্বাস দিয়ে যে ‘সহায়তা আসছে’।
কিন্তু সরকার কঠোর দমন-পীড়ন চালায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হলে ট্রাম্পের বক্তব্যেও কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়।
বুধবার তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের বয়ান তুলে ধরে বলেন, “তারা বলেছে, লোকজন (বিক্ষোভকারীরা) গুলি করছিল, আর তারা পাল্টা গুলি করেছে।
“তারা আমাকে জানিয়েছে, কোনো ফাঁসি হবে না—আমি আশা করি, এটা সত্য।”
এর দুই দিন পর ট্রাম্প দাবি করেন, ১৫ জানুয়ারি নির্ধারিত ৮০০ জনের ফাঁসি বাতিল করেছে তেহরান।
‘ভেনেজুয়েলার সাফল্য’ ইরানে কার্যকর নয়
কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, আপাতত ইরানে বিক্ষোভ কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। তবে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করা কঠিন।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, সংকট শেষ হয়ে যায়নি। যেকোনো সময় নতুন করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর সামরিক বিকল্পও পুরোপুরি বাতিল করেননি ট্রাম্প।
মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সামরিক শক্তি পাঠাচ্ছে, যার মধ্যে একটি বিমানবাহী রণতরী বহরও রয়েছে।
অতীতেও সামরিক শক্তি ব্যবহারে ট্রাম্প দ্বিধা করেননি—আইএস নেতা বাগদাদির হত্যা, ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে লক্ষ্য করে হামলা, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ কিংবা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের নির্দেশ—সবই তার উদাহরণ।
তবে বারবারা স্ল্যাভিন বলেন, “এটা ভেনেজুয়েলা নয়। এখানে ‘একবার আঘাত, সব শেষ’ হবে না। এতগুলো সংকট সামলাতে গিয়ে ট্রাম্প কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় যুদ্ধ চান?”
ইরানের পাল্টা জবাব কতটা ভয়ংকর হতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক স্থাপনায় ২০২৫ সালের জুনে হামলার পর ইরান তুলনামূলক সংযত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলেও কোনো প্রাণহানি হয়নি।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, “ইরান আর সহ্য করবে না। ট্রাম্প ও ইরানের সাফল্যের মানদণ্ডও এক নয়।
ট্রাম্প হয়তো পুরো রাষ্ট্র ধ্বংস করতে চাইবেন। … কিন্তু কয়েক সপ্তাহের দীর্ঘ যুদ্ধে ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারলেই ইরানের লক্ষ্য পূরণ হবে।”
তেলের দাম বেড়ে গেলে ও বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে—তা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক নায়সান রাফাতি বলেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনকে ইরান অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত হামলাও তেহরানকে চরম প্রতিক্রিয়ায় ঠেলে দিতে পারে।
সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে ইরান
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরান বহু সংকট মোকাবিলা করেছে—ইরান-ইরাক যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, গণবিক্ষোভ।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ৪৭ বছরের ইতিহাসে দেশটি এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
আঞ্চলিক মিত্রদের তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ ভেঙে পড়েছে। হামাস ও হিজবুল্লাহ মারাত্মকভাবে দুর্বল। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ ক্ষমতাচ্যুত। ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর পতনের মধ্য দিয়ে আরেকটি মিত্র হারিয়েছে তেহরান।
ইসরায়েলের হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচিও বড় ধাক্কা খেয়েছে। নিষেধাজ্ঞার চাপে রিয়ালের মূল্য ৯০ শতাংশের বেশি কমে গেছে।
রাফাতি বলেন, “গত দুই সপ্তাহে রাষ্ট্র যেভাবে সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা তাদের গভীর দুর্বলতারই প্রকাশ।”
কূটনীতি কি এখনও সম্ভব?
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম ইরানে সরকার পরিবর্তনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্ররা—যারা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা নিয়ে উদ্বিগ্ন—ইরানে হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে।
দেশের ভেতরেও ট্রাম্পকে রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ২০২৬ সালের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাকে আমেরিকান ভোটারদের সন্তুষ্ট রাখতে হবে।
বিশেষ করে তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ সমর্থকগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ ইরাক ও আফগানিস্তানে ব্যর্থ যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর নতুন যেকোনো যুদ্ধে জড়ানোর বিপক্ষে।
ত্রিতা পারসি বলেন, ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে অপসারণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল হলেও জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, সে দেশের সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়েও মার্কিন জনগণ সন্তুষ্ট নয়।
তিনি বলেন, “আমি মনে করি না, ট্রাম্পের মূল সমর্থকগোষ্ঠী এ বিষয়ে একটুও উচ্ছ্বসিত।”
তাহলে কি কূটনীতির পথ এখনও খোলা?—এই প্রশ্নে ১৫ জানুয়ারি ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, তিনি এখনও কূটনৈতিক সমাধানের আশা দেখছেন।
তবে ইরানের প্রতি তার শর্তগুলো কঠোর—পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা।
পারসির মতে, যুক্তরাষ্ট্র আসলে ইরানের কাছে আত্মসমর্পণ চাইছে এবং বারবার আলোচনার শর্ত বদলে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী অর্জন করতে চায়—সে বিষয়ে গভীর পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া কূটনীতি সফল হওয়ার সম্ভাবনা আমি দেখছি না।”
এদিকে পুরো সংকটজুড়েই ইরান কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটির সরকার বিক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ষড়যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করছে।
ইরানি কর্মকর্তারা ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেছেন, বিদেশি শক্তিগুলো বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র দিচ্ছে—যাতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হত্যা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা চালানো যায়।
তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যেকোনো ধরনের বিদেশি হামলার জবাবে তারা কঠোর প্রতিশোধ নেবে।
তবে বারবারা স্ল্যাভিন মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে ইরান পারমাণবিক ইস্যুতে কিছুটা ছাড় দিতে পারে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া ত্যাগ করতেও রাজি হতে পারে।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ট্রাম্প চাইলে পারমাণবিক ইস্যুতে একটি সমঝোতা করে সেটিকেই বড় বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারেন—যদিও তাতে ইরানের বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ উঠতে পারে।