প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:০৩ পিএম
আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:০৯ পিএম
ইরানের রাজাভি খোরাসান প্রদেশের মাশহাদে ১০ জানুয়ারির সরকার বিরোধী বিক্ষোভ। সোশাল মিডিয়া থেকে নেওয়া এই ছবিটি রয়টার্স প্রকাশ করেছে।
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কয়েকশ বিক্ষোভকারীর নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি এখন চরম উত্তপ্ত। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক হামলার হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকলেও আলোচনার পথ এখনো বন্ধ করেনি।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ-এর বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, গত দুই সপ্তাহে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। একই সময়ে সহিংসতায় ৪৮ জন নিরাপত্তা কর্মীও প্রাণ হারিয়েছেন। বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে ১০ হাজার ছয়শোর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ইরানের সরকার নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, নিরাপত্তা কর্মীর নিহত হয়েছেন শতাধিক।
ইরান সরকার এখনো সরকারিভাবে কোনো হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি এবং রয়টার্স উল্লেখ করা পরিসংখ্যানগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি প্রতিদিনের বাংলাদেশ।
এদিকে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন দিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকার পর পুনরায় সংযোগ স্থাপন হলে দেখা যায়, বিক্ষোভ অনেকটাই শান্ত।
ইন্টারনেট পুনঃসংযোগের
ঘোষণা
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি
ইন কাতারের ইরান-বিশেষজ্ঞ মেহরান কামরাভা বলেছেন, ইরানে ইন্টারনেট
বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজপথে গণজমায়েত ও ব্যাপক আন্দোলন ঠেকানো।
এর আগে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী
আব্বাস আরাঘচি জানান, খুব শিগগিরই ইন্টারনেট সংযোগ পুনরায় চালু করা হবে।
কামরাভা আল জাজিরাকে
বলেন, “ইরানের নেতৃত্ব দেশটির পরিস্থিতি যে নিয়ন্ত্রণে আছে, এটি দেখাতেই ইন্টারনেট আবার চালু করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তার মতে,
সরকার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় মহলকেই এই বার্তা দিতে চায় যে পরিস্থিতি তাদের
নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়।”
আরাঘচি ‘মুখরক্ষা’
করতে চান বলেও মন্তব্য করেন কামরাভা। তিনি বলেন, “ইরান সরকার অস্থিরতা সামাল দিতে এখন
একাধিক কৌশল একসঙ্গে প্রয়োগ করছে।
“এটি তেহরানে সরকারের মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে গুরুতর সংকটগুলোর একটি। সরকার এখন পুরোপুরি সংকট ব্যবস্থাপনায় রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “সরকার একদিকে পরিস্থিতি শান্ত করতে চাচ্ছে, অন্যদিকে জনসমর্থন নিজেদের পক্ষে আছে—এমন চিত্র তুলে ধরতে চায়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিও সরাসরি ও পরোক্ষভাবে এই বার্তা দিতে চায় যে সরকার পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে আছে ও আলোচনায় আগ্রহী।”
আলোচনার টেবিলে
ইরান, তবে হুমকিও দিচ্ছে সমানতালে
রয়টার্সের প্রতিবেদনে
বলা হয়েছে, সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের
যোগাযোগের পথ এখনো খোলা আছে। বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং মার্কিন
দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী বার্তা আদান-প্রদান চলছে। সুইজারল্যান্ডের
মাধ্যমেও যোগাযোগ রাখছে তেহরান।
তবে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আমরা যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত, তবে আলোচনার জন্যেও আমাদের দরজা খোলা।” ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ আরও এক ধাপ এগিয়ে হুমকি দিয়েছেন, ইরানে হামলা হলে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব মার্কিন ঘাঁটি ও জাহাজ লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
ট্রাম্পের ‘স্ট্রং
অপশন’ ও সামরিক চিন্তাভাবনা
সিএনএন বলছে, এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরান নিজেই আলোচনার জন্য ফোন করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “আলোচনার আগেই হয়তো আমাদের অ্যাকশনে যেতে হতে পারে।” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প মঙ্গলবার তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। সেখানে ইরানের ওপর সম্ভাব্য সামরিক হামলা, সাইবার আক্রমণ, কিংবা আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে। তবে জনবহুল এলাকায় ইরানের সামরিক ঘাঁটি হওয়ায় হামলার ক্ষেত্রে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি নিয়ে চিন্তায় আছে পেন্টাগন।
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা
ও বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
আল জাজিরার প্রতিবেদনে
বলা হয়, ইরানের ভেতরে বিক্ষোভ এখন আর শুধু অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা
সরাসরি ধর্মীয় শাসন ব্যবস্থার পতনের দাবিতে রূপ নিয়েছে। সরকার এই বিক্ষোভকে ‘আমেরিকা
ও ইসরায়েলের উসকানি’ হিসেবে দেখছে। সোমবার তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে সরকার সমর্থক বিশাল
মিছিল বের করা হয়, যেখান থেকে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ ও ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ স্লোগান দেওয়া
হয়।
বিদেশেও বিক্ষোভের আঁচ লেগেছে। লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভকারীদের ওপর ট্রাক চালিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, আর লন্ডনে ইরানি দূতাবাসের পতাকা নামিয়ে ফেলায় ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে তেহরান।
ইরানে বিদেশি
‘হস্তক্ষেপের’ বিরোধিতা চীনের
বেইজিং থেকে বার্তাসংস্থা
এএফপির খবর জানায়, ইরানে বিদেশি ‘হস্তক্ষেপের’ বিরোধিতা করেছে চীন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে
শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
এর আগে, ইরানে বিক্ষোভকারীদের
হত্যা করা হলে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তার ওই হুমকির পর সোমবার বেইজিং এ প্রতিক্রিয়া জানায়।
চীনের পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের মন্তব্য প্রসঙ্গে বলেন,
“আমরা সবসময় অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করি।
“মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে সহায়ক এমন কাজ আরও বেশি করে করার জন্য সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই।”
ইরানে বিক্ষোভকারীদের
বিরুদ্ধে সহিংসতা ‘দুর্বলতার লক্ষণ’: জার্মান চ্যান্সেলর
ভারতের আহমেদাবাদ
থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি খবর জানায়, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎস বলেছেন, ইরান
বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে যে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও নির্মম সহিংসতা’ চালাচ্ছে, তা ‘দুর্বলতার
লক্ষণ’।
ভারত সফরের সময় সোমবার জার্মান চ্যান্সেলর বলেন, “আমরা এই সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানাই। এই সহিংসতা শক্তির প্রকাশ নয়, বরং দুর্বলতার লক্ষণ। এই সহিংসতা বন্ধ হতে হবে।”
সামনে কী হতে
পারে?
বিশ্লেষকদের মতে,
ট্রাম্প নিজেকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছেন যেখানে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চললে
তাকে কোনো না কোনো ব্যবস্থা নিতেই হবে। এদিকে ইরান গত বছরের ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের
সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের ক্ষত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি, যা তাদের কিছুটা দুর্বল অবস্থানে
রেখেছে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিষয়ে ইরান কোনো ছাড় দেবে
কি না, তা নিয়ে এখনো বড় ধরনের ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।