প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৩১ পিএম
আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:১৮ পিএম
বাংলাদেশের সঙ্গে শিগগিরই জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি হতে পারে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। নতুন বছরের এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর প্রধান মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধুর সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর প্রধান মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের বৈঠক হয়। সে বৈঠকের পর পাকিস্তানে তৈরি বিমান বিক্রির বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থান জানায় সামরিক বাহিনী।
দেশটির সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানায়, বৈঠকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ পাকিস্তান বিমান বাহিনীর যুদ্ধ রেকর্ডের প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ‘পুরোনো নৌবহর ও বিমান নজরদারি বাড়াতে বিমান প্রতিরক্ষা রাডার সিস্টেমের একীভূতরণের’ জন্য সহায়তা চেয়েছেন।
গত মঙ্গলবার দেওয়া বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, বিমান বাহিনীর প্রধানদের বৈঠকে ‘সুপার মুশশাক’ প্রশিক্ষণ বিমান দ্রুত সরবরাহের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি জেএফ-১৭ থান্ডার বিমানের সম্ভাব্য ক্রয় নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে, তবে বাংলাদেশ এখনও চুক্তি সইয়ের বদলে যুদ্ধবিমানটি কিনতে শুধু ‘আগ্রহ’ দেখিয়েছে।
হালকা ওজনের দুই থেকে তিন আসন ও একক ইঞ্জিনের বিমান সুপার মুশশাক। পাকিস্তান ছাড়া ১০টির বেশি দেশ পাইলট প্রশিক্ষণের জন্য বিমানটি ব্যবহার করছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে আজারবাইজান, তুরস্ক, ইরান ও ইরাক।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে একাধিক বিশ্লেষক জানান, ভারতের সঙ্গে গত বছরের সাময়িক যুদ্ধ পাকিস্তানের বিমানযুদ্ধ সক্ষমতার সুনাম আরও বাড়িয়েছে। জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় গত ১০ বছরে বেশ কয়েকটি দেশ এতে আগ্রহ দেখিয়েছে। নাইজেরিয়া, মিয়ানমার ও আজারবাইজান এরই মধ্যে তাদের বহরে বিমানটি রেখেছে। এ বিমানের আনুমানিক মূল্য ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার।
পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার কমোডর আদিল সুলতান বলেন, ‘পাকিস্তান বিমান বাহিনী অনেক বেশি ব্যয়বহুল পশ্চিমা এবং রাশিয়ান সিস্টেমের বিরুদ্ধে উচ্চতর সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, যা এ বিমানগুলোকে বেশ কয়েকটি বিমান বাহিনীর জন্য আকর্ষণীয় বিকল্প করে তুলেছে।’
জেএফ-১৭ থান্ডার কী?
জেএফ-১৭ থান্ডার হালকা, সব ধরনের আবহাওয়ায় ব্যবহার উপযোগী বহুমুখী এক যুদ্ধবিমান। পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স-পিএসি ও চীনের চেংডু এয়ারক্রাফট করপোরেশন-সিএসি যৌথভাবে এটি নির্মাণ করে।
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে পাকিস্তান ও চীন বিমানটি তৈরির জন্য চুক্তি সই করে, যার কাজ দুই হাজার সালের পর পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের কামরার পিএসিতে শুরু হয়।
এ কর্মসূচিতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত একজন এয়ার কমোডর। তিনি বলেন, উৎপাদন দুই দেশের মধ্যে বিভক্ত, যার ৫৮ শতাংশ পাকিস্তানে এবং ৪২ শতাংশ চীনে করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ ব্যক্তি আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা সামনের কাঠামো এবং উলম্ব লেজ তৈরি করছি, চীন মাঝের ও পেছনের কাঠামো তৈরি করছে। বিমানটিতে একটি রাশিয়ান ইঞ্জিন ব্যবহার করা হচ্ছে, তবে পূর্ণাঙ্গ বিমান তৈরির কাজ পাকিস্তানে সম্পন্ন হয়।’
তিনি বলেন, ব্লক-১ ভ্যারিয়েন্টের মাধ্যমে ২০০৭ সালের মার্চে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আনা হয় বিমানটিকে। ব্লক থ্রি হিসেবে পরিচিত সবচেয়ে উন্নত ভ্যারিয়েন্টটি ২০২০ সালের পরিষেবায় যুক্ত হয়।
ব্লক থ্রি ভ্যারিয়েন্টের জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানটি সাড়ে চার প্রজন্মের। এটি আকাশ থেকে আকাশ এবং আকাশ থেকে ভূমিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। পাশাপাশি এতে রয়েছে উন্নত এভিওনিক্স, একটি অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারো তথা এইএসএ রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং দৃশ্যমান-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ক্ষমতা।
এইএসএ রাডার বিমানগুলোকে একসঙ্গে একাধিক ও অনেক দূরের লক্ষ্যবস্তু শনাক্তের সক্ষমতা দিয়েছে, তবে পঞ্চম প্রজন্মের বিমানগুলোর বিপরীতে এ বিমানের রাডার ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতার অভাব রয়েছে।
পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ভাষ্য, বিমানটি মাঝারি ও নিম্ন উচ্চতায় উচ্চগতিসম্পন্ন।
জেএফ-১৭ কিনেছে যেসব দেশ?
মিয়ানমারই প্রথম দেশ, যেটি জেএফ-১৭ কিনেছিল। ২০১৫ সালে অন্তত ১৬টি ব্লক-২ বিমানের অর্ডার দেয় দেশটি, যার মধ্যে এখন পর্যন্ত সাতটি সরবরাহ করা হয়েছে।
বিমানটির দ্বিতীয় ক্রেতা নাইজেরিয়া। ২০২১ সালে তাদের বিমান বাহিনীতে তিনটি জেএফ-১৭ যুক্ত হয়।
আজারবাইজান ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেড় বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের ১৬টি জেট বিমানের প্রাথমিক অর্ডার দেয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আজারবাইজান তাদের বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে পাঁচটি জেএফ-১৭ বিমান উন্মোচন করে।
একই মাসে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী জেএফ-১৭ ক্রয়ের জন্য একটি ‘বন্ধু দেশের’ সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের ঘোষণা দেয়। ক্রেতার নাম উল্লেখ না করেই তারা একে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হিসেবে বর্ণনা করে।
অন্য যুদ্ধবিমানের সঙ্গে তুলনা
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমানগুলো হলো পঞ্চম প্রজন্মের বিমান। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-২২ ও এফ-৩৫, চীনের জে-২০ ও জে-৩৫ এবং রাশিয়ার এসইউ-৫৭। এসব বিমানে রাডার ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তি আছে।
জেএফ-১৭ এর ব্লক থ্রি ভ্যারিয়েন্টটি সুইডেনের গ্রিপেন, ফ্রান্সের রাফাল, ইউরোফাইটার টাইফুন, ভারতের তেজাস ও চীনের জে-১০ এর মতো জেটগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
সাড়ে চার প্রজন্মের বিমানগুলোতে স্টিলথ প্রযুক্তি নেই, তবে বিমানগুলোতে উন্নত রাডার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যা বিমানগুলোকে শনাক্ত করা কঠিন করে তোলে।
জেএফ-১৭-এর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে কেন?
ভারতের সঙ্গে ২০২৫ সালের মে মাসে চার দিনের সংঘর্ষ হয় পাকিস্তানের। বিশেষ করে ৭ মে রাতে ভারতীয় বিমান পাকিস্তানি ভূখণ্ডের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানলে পাকিস্তানের বিমান বাহিনী-পিএএফ আবারও আলোচনায় আসে।
পিএএফের মতে, পাকিস্তানি বিমান বাহিনী কমপক্ষে ছয়টি ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করে। ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রথমে ক্ষতির কথা অস্বীকার করলেও পরে ‘কিছু’ বিমান হারানোর কথা স্বীকার করে নেন।
দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতার কৃতিত্ব দাবি করা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার পাকিস্তানি বিমানের কার্যকারিতা তুলে ধরেছেন, যদিও ভারত এ দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আইএসপিআর ২০২৫ সালের ১০ মে দাবি করে, একটি জেএফ-১৭ বিমান ভারতের এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত হানে, তবে ভারত তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো ক্ষতির কথা অস্বীকার করেছে।
বাংলাদেশের কাছে বিমান বিক্রির আলোচনার বিষয়ে জেএফ-১৭ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অবসরপ্রাপ্ত এক এয়ার কমোডর বলেন, ‘২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে পাকিস্তানের প্রতি ঢাকার মনোভাব ব্যাপকভাবে বদলেছে। এ ধরনের চুক্তি কেবল একটি প্ল্যাটফর্ম বা বিমান বিক্রির জন্য নয়; এটি একটি সহযোগিতা, জাতীয় পর্যায়ে একটি চুক্তি, যা দুটি দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব প্রদর্শন করে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জেএফ-১৭ বা সুপার মুশশাক প্রশিক্ষক বিমান পেলে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে, তারা প্রশিক্ষণ এবং বিক্রয়োত্তর পরিষেবার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। তারা চীনা জে-১০ বিমানের প্রতিও আগ্রহ দেখাচ্ছে, যার অর্থ কৌশলগতভাবে তারা ভবিষ্যতে কাদের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়, তা নির্ধারণ করেছে।’