প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:২৬ পিএম
আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:২১ পিএম
২০১৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, দিল্লির স্বনামধন্য জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) ক্যাম্পাসে হাঁটছেন ছাত্রনেতা ওমর খালিদ (মাঝে)। কোনো বিচার ছাড়াই পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে জেলে বন্দি রয়েছেন খালিদ। ছবি: এএফপি
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ২০২০ সালে হওয়া ধর্মীয় দাঙ্গার মামলায় গত পাঁচ বছর ধরে জেলে থাকা পাঁচ মুসলিম ছাত্র ও অধিকারকর্মীকে জামিন দিয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ কোর্ট। তবে আদালতের শীর্ষ বেঞ্চ ওমর খালিদ ও শারজিল ইমাম—এই দুই আলোচিত পণ্ডিতের জামিন নামঞ্জুর করেছে। ফলে বিচার শুরু হওয়ার অপেক্ষায় তাদের আপাতত তিহার জেলেই থাকতে হচ্ছে।
যারা সোমবার জামিন
পেয়েছেন, তাদের মধ্যে ছিলেন শামশাদ আহমেদের ছেলে শাদাব আহমেদ। দীর্ঘ পাঁচ বছরের দুঃসহ
অপেক্ষার অবসান হলো তাদের। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে কোনো বিচার ছাড়াই জেলে ছিলেন শাদাব।
৬৭ বছর বয়সী বাবা
শামশাদ আহমেদ আল জাজিরাকে বলেন, “আমরা খুবই আনন্দিত। বিচার পেতে দেরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু
একদম যে পাইনি তা নয়।
“সবাই খুশি যে আমাদের
ছেলে একটা নেক কাজের জন্য জেল খেটে ঘরে ফিরছে। তবে ওমর আর শারজিলের জন্য বুকটা ফেটে
যাচ্ছে; ওরাও তো আমাদেরই ছেলে।”
২০১৯ সালে ভারতের
নাগরিকত্ব আইনে যে বদল আনা হয়েছিল, মুসলিমদের মতে তা ছিল বৈষম্যমূলক। এর প্রতিবাদে
ভারতজুড়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু হয়। প্রায় ২০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার এই বৃহত্তম
সংখ্যালঘু গোষ্ঠী দাবি করেছিল, ভারতের মতো একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ধর্ম কখনো নাগরিকত্বের
ভিত্তি হতে পারে না। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি সরকার সেই প্রতিবাদ কঠোরভাবে দমন করে এবং
‘সন্ত্রাসবিরোধী’ আইনে শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের
মতে, বিনা বিচারে ছাত্র ও অধিকার-কর্মীদের এই দীর্ঘ বন্দিদশা মোদি সরকারের আমলে মুসলিমদের
ওপর হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতনের এক বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমনকি নিউইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানিও সম্প্রতি ওমর খালিদকে চিঠি লিখে সংহতি জানিয়েছেন।

২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি
ভারতের নয়া দিল্লিতে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে চলা বিক্ষোভের সময় ৩৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ জুবায়েরকে
মারধর করছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী স্লোগান দেওয়া একদল লোক। ছবি: রয়টার্স
ঘটনাটা আসলে কী
নিয়ে?
২০২০ সালে মোদি সরকার
নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু, পার্সি,
শিখ, বৌদ্ধ, জৈন ও খ্রিস্টানদের দ্রুত নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করে। কিন্তু মুসলিমদের
বাদ দেওয়ায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দিল্লির শাহীন বাগ।
ক্ষমতাসীন বিজেপির
শীর্ষ নেতাদের মুসলিম-বিদ্বেষী বক্তব্যের মধ্যেই ডানপন্থী হিন্দু জনতা দিল্লির পূর্বাঞ্চলে
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে হামলা চালায়, যা থেকে ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হয়। এতে ৫০ জনেরও বেশি
মানুষ নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলিম। ১৯৮৪ সালের শিখ-বিরোধী দাঙ্গার পর এটিই
ছিল দিল্লির সবচেয়ে বড় সহিংসতা।
এর জবাবে পুলিশ ৭৫৮টি
মামলা করে এবং দুই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের
অভিযোগ উঠলেও তারা দাবি করে, তরুণ মুসলিম কর্মীরা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্র
করেছিল। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
বিক্ষোভকারীদের ওপর
‘ইউএপিএ’ নামক এক কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে জামিন পাওয়া প্রায়
অসম্ভব। এই আইনে সরকারকে কাউকে ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা করার এবং বছরের পর বছর বিনা বিচারে
আটকে রাখার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

অভিযুক্তরা কারা?
ষড়যন্ত্রের মামলায়
গ্রেপ্তার হওয়া ১৮ জনের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৬ জন জামিন পেয়েছেন। সোমবার যাদের
নিয়ে শুনানি হয়েছে তাদের পরিচয় একনজরে:
ওমর খালিদ: দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ)
প্রাক্তন গবেষক ও আদিবাসী অধিকার নিয়ে পিএইচডি করা পণ্ডিত।
শারজিল ইমাম: জেএনইউর ইতিহাসের গবেষক ও আইআইটি বোম্বে থেকে
পাস করা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।
মিরান হায়দার: জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার পিএইচডি গবেষক।
গুলফিশা ফাতেমা: একজন এমবিএ গ্র্যাজুয়েট ও সমাজকর্মী।
শিফা-উর-রহমান: একজন ব্যবসায়ী ও জামিয়া মিলিয়া অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের
সভাপতি।
শাদাব আহমেদ: কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন গ্র্যাজুয়েট, যিনি বিক্ষোভে
স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতেন।
সেলিম খান: একজন রপ্তানি ব্যবসায়ী।
এই মামলা নিয়ে
এত বিতর্ক কেন?
সুশীল সমাজ মনে করে,
এই মামলাটি ভারতের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। বিশ্লেষক আসিম আলী আল জাজিরাকে
বলেন, এই আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলিমরা তাদের নাগরিক অধিকার দাবি করেছিল, যা সরকারকে
কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তাই সরকার শক্তি প্রয়োগ করে বুঝিয়ে দিচ্ছে, নাগরিকত্বের সংজ্ঞা কেবল
তারাই ঠিক করবে।
ওমর আর শারজিলের
জামিন না হওয়া প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াই প্রশ্ন তোলেন, “আদালত কি রাজনৈতিক
বয়ান দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে? কারণ দাগী অপরাধী বা ধর্ষকরা জামিন পেলেও এদের ক্ষেত্রে
কেন আইন আলাদা হবে?”

কেন কারাগারেই
থাকতে হচ্ছে খালিদ ও ইমামকে?
সুপ্রিম কোর্টের
বেঞ্চ জানিয়েছে, ওমর খালিদ ও শারজিল ইমামের ভূমিকা বাকিদের মতো নয়; তারা এই ‘ষড়যন্ত্রের’
কেন্দ্রে ছিলেন বলে আদালত প্রাথমিকভাবে মনে করছে। তাই তাদের আরও এক বছর পর জামিনের
আবেদন করতে বলা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার মনে হয় বিচারকরা সরকারের প্রচণ্ড চাপে ছিলেন। মোদি সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার করছে এবং আদালতও সরকারের নির্দেশ মেনে মাথা নত করছে। এই মামলার অভিযোগে কোনো সত্যতা নেই।”
ভারতের ওপর এর
প্রভাব কী?
এই দমন-পীড়নের ফলে
ভারতের ছাত্র রাজনীতিতে এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সমাজকর্মী নাতাশা নারওয়াল, যিনি
নিজেও এক বছর জেলে ছিলেন, তিনি বলেন, বর্তমানে যেকোনো ধরনের প্রতিবাদকেই খুব সহজে অপরাধ
হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং সামান্য সেমিনার
বা সিনেমা প্রদর্শনী করলেও শিক্ষার্থীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।