প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:০৫ পিএম
আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:৩৪ পিএম
ফ্লোরিডার পাম বিচে নিজের মার-এ-লাগো রিসোর্ট বসে সিআইএ পরিচালক জন র্যাডক্লিফ (বামে) এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে (ডানে) সঙ্গে নিয়ে ভেনেজুয়েলায় শনিবারের মার্কিন সামরিক অভিযানের লাইভ স্ট্রিম দেখেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: ট্রুথ সোশ্যাল
ভেনেজুয়েলার শাসকবদল, লাতিন আমেরিকায় ক্ষমতা ভারসাম্য আনা এবং জ্বালানি তেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র যে অনিশ্চয়তা দেখছিল, গত শনিবার এক নজিরবিহীন সামরিক অভিযানে তার নাটকীয় অবসান ঘটিয়েছে।
মার্কিন কমান্ডোদের এক রুদ্ধশ্বাস ঝটিকা অভিযানে নিজ প্রাসাদ থেকে বন্দি হলেন ভেনেজুয়েলার দীর্ঘকালীন দাপুটে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস।
কারাকাসের মসনদ থেকে সরাসরি মার্কিন বিচারব্যবস্থার ‘পূর্ণ ক্রোধের’ মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় ৬৩ বছর বয়সী মাদুরো এখন নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের একটি অন্ধকার সেলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন।

গুপ্তচর, রেপ্লিকা ও ৪৭ সেকেন্ডের সেই অভিযান
এই অভিযান কোনো আকস্মিক পদক্ষেপ ছিল না। ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’ নামের এই মিশনের প্রস্তুতি চলেছিল মাসের পর মাস। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ মাদুরোর নিজের প্রশাসনেই একজন উচ্চপদস্থ ‘সূত্র’ তৈরি করেছিল, যার মাধ্যমে মাদুরোর ঘুমানো, খাওয়া এমনকি প্রতিদিনের পোশাকের তালিকাও মার্কিনিদের নখদর্পণে ছিল।
পেন্টাগন কারাকাসে মাদুরোর প্রাসাদের একটি হুবহু নকল (রেপ্লিকা) তৈরি করে সেখানে ডেল্টা ফোর্সকে দিয়ে নিয়মিত মহড়া করিয়েছিল। শুক্রবার রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার মার-এ-লাগো রিসোর্ট থেকে চূড়ান্ত নির্দেশ দেন— ‘গুডলাক অ্যান্ড গডস্পিড’। মুহূর্তেই ১৫০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান আকাশে ওড়ে এবং কারাকাসকে বিদ্যুৎহীন করে ফেলা হয়। মার্কিন বিশেষ বাহিনী যখন প্রাসাদে ঢোকে, মাদুরো একটি সেফ রুমে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের ব্যবধানে দরজা ভেঙে তাকে বন্দি করা হয়।
মাদুরোর বিচার: অভিযোগ যখন ‘মাদক-সন্ত্রাসবাদ’
গ্রেপ্তারের পর মাদুরোকে হাতকড়া ও চোখ বাঁধা অবস্থায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস আইও জিমা’ হয়ে নিউইয়র্কে আনা হয়। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি জানিয়েছেন, সোমবারই তাকে আদালতে তোলা হবে। মাদুরোর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো ‘নারকো-টেররিজম’ বা মাদক-সন্ত্রাসবাদ।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, তিনি একটি আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র পরিচালনা করতেন, যা যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ কোকেন পাচার করত। এছাড়া মাদক ব্যবসার সুরক্ষায় ভারী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের দায়ে তাকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

আইনি বৈধতা ও ‘মনরো ডকট্রিন’
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের চোখে চরম বিতর্কিত। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চাথাম হাউসের গবেষক মার্ক ওয়েলারের মতে, এটি একটি ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী কোনো সার্বভৌম দেশের ওপর এভাবে শক্তি প্রয়োগের অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের নেই। তবে মার্কিন আদালত ‘কার-ফ্রিজবি’ নীতি অনুসরণ করে, যা অনুযায়ী আসামিকে ‘কীভাবে’ আনা হয়েছে তা বিবেচ্য নয়, বরং তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার করা সম্ভব।
ট্রাম্প এই অভিযানকে ১৮২৩ সালের ‘মনরো ডকট্রিন’-এর আধুনিক সংস্করণ হিসেবে দাবি করেছেন এবং একে মজা করে তার নামের সঙ্গে মিলিয়ে ‘ডনরো ডকট্রিন’ নাম দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেছেন, লাতিন আমেরিকায় রাশিয়া বা চীনের কোনো প্রভাব তিনি সহ্য করবেন না এবং প্রয়োজনে ‘আন্তর্জাতিক পুলিশ’ হিসেবে হস্তক্ষেপ করবেন।
মাদুরো সরকারের অন্য সদস্যদের কেন গ্রেপ্তার করেনি যুক্তরাষ্ট্র?
বিবিসির মার্কিন সহযোগী সিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে প্রশ্ন করা হয়েছিল কেন যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর সরকারের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তার করেনি?
এই প্রশ্ন এই কারণে সামনে এসেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর আগে ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলোকে গ্রেপ্তার ২৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ঘোষণা করেছিল। আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনোর জন্য ঘোষণা করা হয়েছিল ১৫ মিলিয়ন ডলার।
রুবিওকে এই প্রশ্ন করা হলে তিনি তার জবাবে বলেন, “ব্যাপারটা খুবই সহজ। আপনি গিয়ে সবাইকে একসঙ্গে ধরে ফেলতে পারবেন না।”
তিনি বলেন, “আরও অনেককে ধরতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী যদি দেশটিতে আরও বেশি সময় অবস্থান করত, তাহলে কী ধরনের প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারতো সেটি কল্পনা করতে পারেন?”
পরে রুবিও বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারকেই গুরুত্ব দিয়েছি এবং সেটিই অর্জন করেছি।”
তেলের নতুন সমীকরণ: বিশ্ববাজারে প্রভাব
এই অভিযানের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে যাচ্ছে জ্বালানি তেলের বাজারে। বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুত থাকা সত্ত্বেও মাদুরোর আমলে ভেনেজুয়েলার উৎপাদন তলানিতে ঠেকেছিল। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, বড় বড় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো শিগগির ভেনেজুয়েলায় ফিরে আসবে এবং জীর্ণ অবকাঠামো মেরামত করবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি ভেনেজুয়েলার তেল নিয়মিত আন্তর্জাতিক বাজারে আসা শুরু করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫০ ডলারের নিচে নেমে আসার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এটি বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সাহায্য করবে।
তবে কৌশলগত দিক থেকে এটি চীন ও রাশিয়ার জন্য বড় ধাক্কা, কারণ তারা ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর বড় বিনিয়োগ করে রেখেছিল। এছাড়া ওপেকের বাজারে একচেটিয়া আধিপত্যকেও এটি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেবে।

ভেনেজুয়েলায় এখন ‘ভয় আর অনিশ্চয়তা’
মাদুরো বন্দি হলেও কারাকাসে তার সহযোগীরা এখনও প্রতিরোধের ডাক দিচ্ছেন। ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নিয়ে মাদুরোর আটককে ‘অপহরণ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি সাফ জানিয়েছেন, “আমরা আর কোনো সাম্রাজ্যের উপনিবেশ হব না।” অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের মধ্যে কাজ করছে চরম আতঙ্ক। মারাকে শহরের এক মনোবিজ্ঞানী আলেজান্দ্রা প্যালেনসিয়া বলেন, “শহরটি যেন পরিত্যক্ত। মানুষের মনে কেবল ভয় আর অনিশ্চয়তা।”
ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের “একটি পয়সাও খরচ হবে না”, কারণ মাটির নিচ থেকে আসা তেলের টাকা দিয়েই সব খরচ উসুল করা হবে।
তবে ইরাক ও আফগানিস্তানের স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়া এই হস্তক্ষেপ ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এজেন্ডার সমর্থকদের কতটা সন্তুষ্ট রাখতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়।
সোমবার যখন ম্যানহাটনের আদালতে মাদুরোকে দাঁড় করানো হবে, তখন তা কেবল একজন ব্যক্তির বিচার হবে না, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতির এক নতুন ও জটিল অধ্যায়ের সূচনা করবে।