× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বসনিয়ার যুদ্ধের ৩০ বছর: কীভাবে ঘটেছিল সেই ভয়াবহ নৃশংসতা

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:৫১ পিএম

১৯৯২ সালের ৬ এপ্রিল সারাজেভোতে একজন সেনা সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকরা সার্বিয়ান স্নাইপারদের আক্রমণের মুখে পড়ে। সেসময় সেনা সদস্যটি পাল্টা গুলি চালান। ছবিটি তুলেছিলেন এএফপির মাইক পার্সন

১৯৯২ সালের ৬ এপ্রিল সারাজেভোতে একজন সেনা সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকরা সার্বিয়ান স্নাইপারদের আক্রমণের মুখে পড়ে। সেসময় সেনা সদস্যটি পাল্টা গুলি চালান। ছবিটি তুলেছিলেন এএফপির মাইক পার্সন

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় যুদ্ধ শেষ হয়েছে তিন দশক আগে। কিন্তু দেশটি আজও ক্ষতবিক্ষত। জাতিগত নির্মূল অভিযান, গণহত্যা আর লাখো মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার স্মৃতি এখনো সমাজের ভেতরে গভীর দাগ কেটে আছে।

১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের এই যুদ্ধে প্রাণ হারান প্রায় এক লাখ মানুষ, আর ঘরছাড়া হন ২০ লাখের বেশি। এই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় ছিল ১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সংঘটিত সবচেয়ে বড় গণহত্যা।

যুদ্ধের শুরু কেন, কীভাবে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত সমাজতান্ত্রিক ফেডারেল যুগোস্লাভিয়ার ছয়টি প্রজাতন্ত্রের একটি ছিল বসনিয়া। দীর্ঘদিন প্রেসিডেন্ট যোসিপ ব্রোজ টিটোর নেতৃত্বে দেশটি একসঙ্গে ছিল। কিন্তু ১৯৮০ সালে টিটোর মৃত্যুর পর অর্থনৈতিক সংকট বাড়তে থাকে, আর একই সঙ্গে মাথাচাড়া দেয় জাতীয়তাবাদ- বিশেষ করে সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়ায়।

১৯৯১ সালে স্লোভেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৯৯২ সালের শুরুতে ম্যাসেডোনিয়াও আলাদা হয়ে যায়। এই ভাঙনের ঢেউ বসনিয়াকেও নাড়িয়ে দেয়। ১৯৯২ সালের ১ মার্চ বসনিয়ায় স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোট হয়। ভোট দেওয়া মানুষের ৯৯.৭ শতাংশই স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেন। তবে বসনীয় সার্বরা এই ভোট বয়কট করে। তারা আলাদা করে নিজেদের ‘সার্ব রিপাবলিক’ গঠন করে, যা পরে রিপাবলিকা সার্পস্কা নামে পরিচিত হয়।

এই সময় সার্বিয়ার নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচের আগ্রাসী নীতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তার লক্ষ্য ছিল বসনিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার সার্ব-অধ্যুষিত এলাকাগুলো একত্র করা। ১৯৯২ সালের ৬ এপ্রিল ইউরোপীয় কমিউনিটি বসনিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ঠিক সেই মাসেই যুগোস্লাভ সেনাবাহিনী ও সার্ব প্যারামিলিটারিদের সহায়তায় বসনীয় সার্ব বাহিনী দেশজুড়ে হামলা শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল এলাকা দখল আর অ-সার্ব জনগোষ্ঠীকে তাড়িয়ে দেওয়া। 

১৯৯৫ সালের ১৩ জুলাই বসনিয়ার পূর্বাঞ্চলের স্রেব্রেনিৎসা থেকে আসা মুসলিম শরণার্থীরা পতোকারি গ্রামে জাতিসংঘের সাঁজোয়া কর্মী বহনকারী গাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। ফাইল ছবি  

সারায়েভো অবরোধ: আধুনিক ইউরোপের দীর্ঘতম ঘেরাও

১৯৯২ সালের ৫ এপ্রিল রাজধানী সারায়েভো ঘিরে ফেলে বসনীয় সার্ব বাহিনী। প্রায় ৪৩ মাস ধরে চলে এই অবরোধ। আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে তা সবচেয়ে দীর্ঘ। আবাসিক এলাকায় গোলাবর্ষণ, বিদ্যুৎ-পানি বন্ধ, স্নাইপারের গুলি—সব মিলিয়ে নিহত হন প্রায় ১১ হাজার মানুষ, যাদের মধ্যে এক হাজারেরও বেশি শিশু।

এই হামলার পর জাতিসংঘ সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা দেয়। একই সময় দক্ষিণ-পশ্চিম বসনিয়ায় ক্রোয়াট বাহিনীর সঙ্গে বসনিয়াকদের আলাদা সংঘাত শুরু হয়, সেখানেও চলে জাতিগত নির্মূল অভিযান।

প্রাণহানি আর বাস্তুচ্যুতি

যুদ্ধ শেষে বসনীয় কর্তৃপক্ষের গবেষণায় দেখা যায়, নিহত হন প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার মানুষ, যাদের বড় অংশই বেসামরিক নাগরিক। নিহতদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ছিলেন বসনিয়াক মুসলিম। যুদ্ধের কারণে প্রায় ২২ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হন, যা তখনকার মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি। তাদের অনেকেই আর কখনো নিজের ঘরে ফিরতে পারেননি।

মানবতাবিরোধী অপরাধ

যুদ্ধের শুরু থেকেই বসনিয়াকদের লক্ষ্য করে চলে পরিকল্পিত জাতিগত নির্মূল। চলে গণহত্যা, ধর্ষণ, জোরপূর্বক উৎখাত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা ধ্বংস।

১৯৯২ সালে উত্তর-পশ্চিমের প্রিয়েদোর এলাকায় ওমারস্কা, কেরাতের্ম ও ত্রনোপোলিয়ে নামে বন্দিশিবির গড়ে তোলে বসনীয় সার্ব কর্তৃপক্ষ। সেখানে হাজারো মানুষকে নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল একে ‘ব্যাপক ও পরিকল্পিত অপরাধ’ বলে উল্লেখ করেছে।

পূর্ব বসনিয়ার ফোচা ও ভিসেগ্রাদে নারীদের ওপর সংগঠিত ধর্ষণ চালানো হয়। ফোচা মামলার মাধ্যমে ধর্ষণ ও যৌন দাসত্বকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় আন্তর্জাতিক আদালত।

১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ স্রেব্রেনিৎসাকে ‘নিরাপদ এলাকা’ ঘোষণা করে। কিন্তু তাতেও হত্যাযজ্ঞ থামেনি। ওই বছর এপ্রিলে আহমিচি গ্রামে শতাধিক বসনিয়াককে হত্যা করে ক্রোয়াট বাহিনী।

‘স্নাইপার সাফারি’র ভয়াল অধ্যায়

সারায়েভো অবরোধের সময় চালু ছিল তথাকথিত ‘স্নাইপার সাফারি’। অভিযোগ আছে, বিদেশি ধনী ব্যক্তিরা টাকা দিয়ে বসনীয় সার্ব বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়ে সাধারণ মানুষকে গুলি করত- শখের শিকার হিসেবে। ইতালিসহ কয়েকটি দেশে এ নিয়ে তদন্ত হলেও এখনো কেউ দোষী সাব্যস্ত হয়নি।

স্রেব্রেনিৎসা: ইউরোপের কালো অধ্যায়

১৯৯৫ সালে স্রেব্রেনিৎসা হয়ে ওঠে আশপাশের গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা বসনিয়াকদের শেষ আশ্রয়। জনাকীর্ণ এই শহরটি পুরোপুরি অবরুদ্ধ ছিল। জাতিসংঘের ডাচ শান্তিরক্ষীরা থাকলেও তারা কার্যকরভাবে কিছুই করতে পারেননি।

জুলাইয়ের শুরুতে বসনীয় সার্ব বাহিনী শহরে ঢুকে পড়ে। ১১ জুলাই শহরে প্রবেশ করেন রাদোভান কারাদজিচের নির্দেশে জেনারেল রাতকো ম্লাদিচ। এরপর পুরুষ ও কিশোরদের আলাদা করা হয়। কয়েক দিনের মধ্যে আট হাজারেরও বেশি বসনিয়াক পুরুষ ও কিশোরকে হত্যা করে গণকবরে পুঁতে ফেলা হয়। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জোর করে বের করে দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এই হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

১৯৯২ সালের ১৬ এপ্রিল সার্বিয়া সীমান্তের কাছে অবস্থিত পূর্ব বসনিয়ার একটি শহর থেকে মুসলিম শরণার্থীরা সরে যাচ্ছেন। সার্ব ও মুসলিম বাহিনীর মধ্যে প্রবল লড়াই শুরু হওয়ার পর এই সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছিল। ছবিটি : এএফপি 

যুদ্ধের অবসান ও ডেটন চুক্তি

স্রেব্রেনিৎসার পর পশ্চিমা দেশগুলো আর নীরব থাকতে পারেনি। ১৯৯৫ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ন্যাটো বসনীয় সার্ব বাহিনীর ওপর ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ডেটনে শান্তি আলোচনা হয়।

১৯৯৫ সালের ২১ নভেম্বর ডেটন শান্তিচুক্তিতে সম্মত হন বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ার নেতারা। ১৪ ডিসেম্বর প্যারিসে চুক্তিতে সই হয়। এতে বসনিয়া একটি রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকলেও দুই ভাগে বিভক্ত হয়—ফেডারেশন অব বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা এবং রিপাবলিকা সার্পস্কা।

বিচার হয়েছে, কিন্তু ন্যায়বিচার কি সম্পূর্ণ?

১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটিওয়াই)। ২৪ বছরে ১৬১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। তাদের মধ্যে ৯০ জন সাজাপ্রাপ্ত হন। যুদ্ধকালীন সার্ব নেতা রাদোভান কারাদজিচ ও জেনারেল রাতকো ম্লাদিচ—দুজনই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান।

তবুও অনেক ভুক্তভোগীর কাছে ন্যায়বিচার এখনো অসম্পূর্ণ। আজও বহু স্রেব্রেনিৎসা–বেঁচে ফেরা মানুষ শরণার্থী হয়ে বিদেশে বসবাস করছেন। যুদ্ধ শেষ হলেও বসনিয়ার সমাজে সেই ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা