প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:২৬ পিএম
আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:৩৪ পিএম
অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বিখ্যাত বন্ডাই বিচে (সমুদ্র সৈকতে) ইহুদিদের এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বন্দুক হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। শিশুসহ অন্তত ২৯ জনকে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ এই হামলাকে সরাসরি ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে ঘোষণা করেছে।
রবিবার (১৪ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় বন্ডাই বিচে ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব হানুক্কা উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান চলছিল। সেখানে এক হাজারেরও বেশি মানুষ জড়ো হয়েছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঠিক সেই সময় বন্দুকধারীরা আচমকা গুলি চালাতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যেই উৎসবের আনন্দ বদলে যায় আতঙ্ক আর রক্তাক্ত দৃশ্যে।
নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার ক্রিস মিন্স জানান, এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন হামলাকারীও রয়েছে। আরেকজন সন্দেহভাজন হামলাকারীকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ ধারণা করছে, অন্তত দুইজন বন্দুকধারী হামলায় জড়িত ছিল, তবে তৃতীয় কেউ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে, আর এটি হবে দীর্ঘ ও জটিল বলে জানিয়েছেন প্রিমিয়ার।
প্রিমিয়ার ক্রিস মিন্স বলেন, “এই হামলা পরিকল্পিতভাবে সিডনির ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করেই চালানো হয়েছে। হানুক্কার প্রথম দিনে, যে রাতটা শান্তি আর আনন্দের হওয়ার কথা ছিল, সেটাই এই ভয়ংকর ও পৈশাচিক হামলায় তছনছ হয়ে গেছে।”
ঘটনাস্থলে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শী গিল বলেন, “সবকিছু এমন লাগছিল যেন মাছ ভর্তি পাত্রে গুলি চালানো হচ্ছে। লোকটা ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে বড় একটা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করছিল; একেবারে টার্গেট প্র্যাকটিসের মতো।”
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী, ৩০ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা হ্যারি উইলসন জানান, “আমি অন্তত ১০ জনকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেছি। চারদিকে শুধু রক্ত আর চিৎকার।”
হামলার পরপরই বন্ডাই বিচ এলাকায় ব্যাপক পুলিশি অভিযান শুরু হয়। সৈকত ও আশপাশের এলাকা ঘিরে ফেলা হয়, মানুষজনকে দ্রুত সরে যেতে বলা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এই মুহূর্তে হামলার কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিশ্চিত করা যায়নি, তবে এটি আর সক্রিয় হামলা নয়। তদন্ত চলমান রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এই ঘটনাকে “ভয়াবহ ও মর্মান্তিক” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “জরুরি সেবাকর্মীরা মাঠে আছেন, তারা প্রাণ বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।”
এদিকে, ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হানুক্কার প্রথম প্রদীপ জ্বালাতে আসা ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর “জঘন্য সন্ত্রাসীরা” হামলা চালিয়েছে। তিনি রক্তমাখা একটি ইহুদি প্রার্থনার শালের ছবিও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা’র দাবি করেছেন, অস্ট্রেলিয়ায় গত কয়েক বছরে বেড়ে ওঠা ইহুদিবিরোধী বিদ্বেষ ও হামলারই চরম পরিণতি এই ঘটনা। তার ভাষায়, “গ্লোবাল ইনতিফাদার ডাক আজ বন্ডাই বিচে বাস্তব রূপ নিয়েছে।”
অস্ট্রেলিয়ার ইহুদি সম্প্রদায়ের শীর্ষ সংগঠনের সহ-প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স রিভচিন স্কাই নিউজকে বলেন, “এটা ছিল আমাদের কমিউনিটির সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটি; একটি আনন্দের উৎসব। কিন্তু যদি ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের এভাবে লক্ষ্য করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটা কল্পনারও বাইরে ভয়ংকর।” তিনি জানান, এই হামলায় তার একজন মিডিয়া উপদেষ্টাও আহত হয়েছেন।
বিশ্বখ্যাত বন্ডাই বিচ অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম ব্যস্ত ও প্রতীকী স্থান। প্রতি বছর এখানে লাখ লাখ পর্যটক আসেন। এমন জায়গায় এই ধরনের হামলা দেশজুড়ে নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, অস্ট্রেলিয়ায় গণহারে বন্দুক হামলার ঘটনা খুবই বিরল। ১৯৯৬ সালের পোর্ট আর্থার হত্যাকাণ্ডের পর দেশটি কঠোর অস্ত্র আইন প্রণয়ন করে। তবে সব কঠোরতার পরও, বন্ডাই বিচের এই রক্তাক্ত হামলা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এক ভয়ংকর ও গভীর ক্ষত হয়ে থাকল; বিশেষ করে যখন সেটি একটি ধর্মীয় উৎসবের আনন্দকে রক্তে ভাসিয়ে দিল।