প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:৩৪ পিএম
গত ২ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেলসংলগ্ন এলাকায় ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বিক্ষোভে জড়ো হন কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই নেতা ইমরান খানের সমর্থকরা। ছবি: রয়টার্স
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে প্রায় এক মাস পরিবার বা ঘনিষ্ঠ কেউ দেখতে পারেননি—এ অভিযোগ সামনে আসতেই দেশটির রাজনীতি উত্তাল হয়ে উঠেছে। তার পরিবার ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নেতারা বলছেন, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ৭৩ বছর বয়সী ইমরানকে দেখতে দেওয়া হয়নি। এই অবরোধ ঘিরেই তৈরি হয়েছে বড় ধরনের রাজনৈতিক আলোচনা, উদ্বেগ ও নানা গুজব।
অবশেষে মঙ্গলবার
(২ ডিসেম্বর) ইমরান খানের বোন উজমা খানুম রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেলে তার সঙ্গে দেখা
করার সুযোগ পান। তিনি এসে জানান, ইমরান খানের স্বাস্থ্য ঠিক আছে, তবে জেলখানার পরিবেশ
ভালো নয়। ইমরান খান নাকি বলেছেন, তাকে অত্যন্ত নিম্নমানের পরিবেশে রাখা হচ্ছে, এবং
তিনি তার কারাবাসকে ‘মানসিক নির্যাতন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইমরান খান এখন দুর্নীতির কয়েকটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে লম্বা সময়ের জন্য জেল খাটছেন। তার স্ত্রী বুশরা বিবিও একটি দুর্নীতি মামলায় ৭ বছরের জেল খাটছেন। অবশ্য, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা এবং রাজনৈতিক চাল।
কেন ইমরান খান
জেলে?
২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকা ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্টে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকে তিনি কারাগারে আছেন। একাধিক মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মামলা হলো:
আল-কাদির ট্রাস্ট মামলা: ইমরান খান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘আল-কাদির’ নামের একটি ট্রাস্টের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে একজন আবাসন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৭ বিলিয়ন রুপি (২৫.১২ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের জমি ঘুষ হিসেবে গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইসলামাবাদ অ্যাকাউন্টেবিলিটি আদালত তাকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড ও বুশরা বিবিকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
তোশাখানা মামলা: ২০২৩ সালের আগস্টে খান গ্রেপ্তার হন এবং পরে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে প্রাপ্ত ১৪০ মিলিয়ন পাকিস্তানি রুপিরও বেশি মূল্যের রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রি করার দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
গুপ্ত নথি মামলা: ২০২২ সালে ওয়াশিংটন থেকে ইসলামাবাদে পাঠানো পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের একটি গোপন তারবার্তা (সাইফার) জনসমক্ষে প্রকাশের অভিযোগ আনা হয় ইমরান খানের বিরুদ্ধে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিনিয়র পিটিআই নেতা শাহ মাহমুদ কোরেশির সঙ্গে তাকে অভিযুক্ত করা হয়। অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট-এর অধীনে গঠিত একটি বিশেষ আদালত ইমরান খান ও কোরেশিকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তাদের প্রত্যেককে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
সন্ত্রাসবিরোধী অভিযোগ: ২০২৩ সালের মে মাসে খান গ্রেপ্তার হলে তার সমর্থকরা পাকিস্তানজুড়ে মাঝে মাঝেই সহিংস বিক্ষোভ করে। এই বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযোগে বর্তমানে খান বিচারের মুখোমুখি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে রাওয়ালপিন্ডির সন্ত্রাসবিরোধী আদালত তাকে অভিযুক্ত করে, যদিও তিনি দোষী নন বলে দাবি করেন। এই মামলার বিচার এখনো শুরু হয়নি।
ইদ্দত মামলা: খান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে তার স্ত্রীর পূর্ববর্তী স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর বাধ্যতামূলক অপেক্ষার সময় (ইদ্দত) শেষ হওয়ার আগেই বিবাহ করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। জুলাই মাসে তারা এই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।
ইমরান খানের ভাষ্য, তার বিরুদ্ধে আনা সব মামলা ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’।

খানুম তার সাক্ষাৎ
সম্পর্কে কী বলেছেন?
মঙ্গলবার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার পর ডাক্তার খানুম রাওয়ালপিন্ডিতে সাংবাদিকদের জানান, তার ভাইকে দিনের বেশিরভাগ সময় সেলের ভেতরে আটকে রাখা হয় এবং খুব অল্প সময়ের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘তিনি (ইমরান খান) শারীরিকভাবে ভালো আছেন। কিন্তু তাকে সব সময় ভেতরে রাখা হয় এবং খুব অল্প সময়ের জন্য বাইরে যেতে দেওয়া হয়। কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি খুব ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং বলেছেন, তারা তাকে ‘মানসিক নির্যাতন’ করছে।’
খানুম আরও যোগ করেন, তার ৩০ মিনিটের সাক্ষাৎ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল এবং কোনো মোবাইল ব্যবহারের অনুমতি ছিল না।
পরে তার বোন আলীমা খানুম এবং পিটিআইর নেতাদের সঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘যখন আমার দেখা হলো, তিনি খুব বিচলিত এবং খুব ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি বললেন, তারা তাকে ও বুশরা বিবিকে একটি ছোট ঘরে রেখে মানসিক নির্যাতন করছে...। তিনি বললেন, চার সপ্তাহ ধরে তাকে কারও সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি...। তিনি বললেন, এই মানসিক নির্যাতন শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও খারাপ।’
আনুষ্ঠানিকভাবেই
কি সাক্ষাৎ বন্ধ করা হয়েছিল?
খানের সঙ্গে সাক্ষাতের
ওপর কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা ছিল কি না বা এর কারণ কী—সে বিষয়টি পাকিস্তানের সরকার নিশ্চিত করেনি।
তবে, পরিবারের সদস্য
ও পিটিআই নেতারা অভিযোগ করেন, আদালত সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়ার পরেও তা বন্ধ রাখা হয়েছিল।
এ বছরের অক্টোবরের শেষের দিকে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট (আইএইচসি) আদিয়ালা জেল সুপারকে তাদের
জারি করা একটি আদেশ কার্যকর করার নির্দেশ দেয়, যেখানে প্রতি সপ্তাহে মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার
খান তার মনোনীত দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, এই সাক্ষাৎ কখনোই কার্যকর হয়নি। ফলস্বরূপ, খানের সমর্থকদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে তিনি অসুস্থ বা তাকে অন্য জেলে স্থানান্তর করা হচ্ছে। কেউ কেউ এমনকি গুজব ছড়ায় যে খান মারা গেছেন।
পরিবার ও সমর্থকরা
কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
ইমরান খানের বোন ও সমর্থকরা দীর্ঘদিন ধরে তার কারাবাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছেন। গত ১৮ নভেম্বর তারা আদিয়ালা জেলের বাইরে প্রথম সরাসরি বিক্ষোভ করেন।
তারা আরও জানান, এই প্রতিবাদ পিটিআই সদস্যদের পরিবারের প্রতি সংহতি জানাতেও ছিল, যারা ২০২৩ সালের ৯ মে এবং ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর ও ২৬ নভেম্বরের বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছিলেন।
১৮ নভেম্বর ইমরান খানের বোনেরা অভিযোগ করেন, আদিয়ালা জেলের বাইরে অবস্থান করার সময় তাদের ‘সহিংসভাবে আটক’ করা হয় এবং তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়।
২৫ নভেম্বর জেলের বাইরে দ্বিতীয় বিক্ষোভ হয়, যা পিটিআই ইউটিউব চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়; সেখানে আলীমা বলেন, ‘কে জানে, হয়তো ইমরানকে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। কেন তারা আমাদের তাকে দেখা করতে দিচ্ছে না?’
এরপর ২৮ নভেম্বর, পিটিআই সদস্য এবং পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের (খাইবার পাখতুনখোয়া) মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি আদিয়ালা জেলের বাইরে রাতভর লাইভ স্ট্রিম করা অবস্থান ধর্মঘট করেন, দাবি করেন যে আটবার তাকে খানের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করা হয়েছে।
পিটিআইর শক্ত ঘাঁটি খাইবার পাখতুনখোয়ার পেশোয়ার শহরেও খানের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়।
আদিয়ালা জেলের বাইরে বিক্ষোভ চলতে থাকাকালীন মঙ্গলবার খান ও তার বোনের মধ্যে সাক্ষাৎ হয়।
এরপর মঙ্গলবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা কার্যকর করে, যা জেলা প্রশাসনকে দুটি জায়গায় সীমিত সময়ের জন্য জনসমাগমে চার বা ততোধিক ব্যক্তির সমাগম নিষিদ্ধ করার অনুমতি দেয়; তা ইসলামাবাদে দুই মাসের জন্য এবং রাওয়ালপিন্ডিতে এই সপ্তাহের বুধবার পর্যন্ত।
সরকার কী বলেছে?
সাক্ষাতে বাধা দেওয়ার কারণ বা নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে সরকার স্পষ্টভাবে কিছু নিশ্চিত করেনি।
প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লীগ (পিএমএল-এন)-এর রাজনীতিবিদ তারিক ফজল চৌধুরী ২৮ নভেম্বর জাতীয় পরিষদকে জানান, খানের স্বাস্থ্য ভালো আছে এবং তার স্বাস্থ্য নিয়ে গুজব ভারতীয় ও আফগান মিডিয়া ছড়িয়েছে।
ফজল চৌধুরী বলেন, ‘তার স্বাস্থ্য একদম ঠিক আছে এবং তার জীবন নিয়ে কোনো বিপদ নেই।’
কেন খানের জেল-সাক্ষাতে
বাধা পাকিস্তানে রাজনৈতিক ঝড় তুলেছে?
কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, খানের সাক্ষাৎ বন্ধ করা একটি রাজনৈতিক কৌশল, যা পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন দল পিএমএল-এন-এর উপর বুমেরাং হতে পারে।
ইসলামাবাদভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (সিআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমতিয়াজ গুল আল জাজিরাকে বলেন, ‘সাক্ষাৎ বন্ধ করা এবং খানকে নির্জন কারাবাসে রাখার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো দৃশ্যত তাকে একটি আপোষে রাজি করানো এবং সরকারবিরোধী জনমতকে নিষ্ক্রিয় করা।’
পাকিস্তানের কলামিস্ট ও ডিজিটাল অধিকার সংস্থা বোলো ভি-এর পরিচালক উসামা খিলজি আল জাজিরাকে বলেন, ‘পাকিস্তানে রাজনীতিবিদরা হয় সরকারে থাকেন, না হয় জেলে; যেখানে পর্দার আড়ালে কে শাসন করবে তার মূল সিদ্ধান্ত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে। ইমরান খান বর্তমানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার শিকার, যেখানে ক্রমবর্ধমানভাবে নিয়ন্ত্রিত বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়াকে ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে।’
ইমরান খানের দল পিটিআইকে ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল এবং দলের বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। দলের সদস্যরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি আসনে জয়ী হন।
তবে পিটিআইর অভিযোগ, সরকার ও সামরিক বাহিনী তাদের আরও বেশি আসন পাওয়া থেকে বঞ্চিত করতে নির্বাচনে কারচুপি করেছে; স্বাধীন পর্যবেক্ষকরাও ভোট গণনায় বেশ কয়েকটি অনিয়ম লক্ষ্য করেছেন। সরকার ও সামরিক বাহিনী অবশ্য নির্বাচন কারচুপির অভিযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।
খিলজি বলেন, ‘এই মুহূর্তে পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ হিসেবে তার রাজনৈতিক দল পদ্ধতিগতভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছে, এবং তাদের প্রতিবাদ হিংসাত্মকভাবে দমন করা হয়েছে, কার্যত যেকোনো ধরনের বিক্ষোভকে বেআইনি করা হয়েছে।’
‘আদালতের আদেশ এবং বন্দীদের অধিকার লঙ্ঘন করে জেলে তার প্রবেশাধিকার সীমিত করার কারণ হলো তার দল এবং অন্যান্য রাজনীতিবিদদের কাছে এই বার্তা দেওয়া—যদি আপনারা নির্ধারিত পথে না চলেন, তাহলে পরিণতি হবে গুরুতর।’