প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১১:১৮ এএম
হংকংয়ে গত ছয় দশকের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের পাশে আহাজারি করেন এক ব্যক্তি। ছবি : সংগৃহীত
হংকংয়ে গত ছয় দশকের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২৭৯ জনের বেশি নিখোঁজ, আর হাজারো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
বুধবার (২৬ নভেম্বর) দুপুরে লাগা আগুন রাত নেমে গেলেও জ্বলছিল। অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের অবহেলার কারণেই এই বিপর্যয়। তদন্ত শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
বিভিন্ন মিডিয়ার ছবি ও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বহুতল ভবনগুলো আগুনে জ্বলছে, ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে আকাশ, পুরো শহরের স্কাইলাইন যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন ৭৬৭ জনের বেশি দমকলকর্মী।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি এক দমকলকর্মীর কথাও উল্লেখ করেছেন, যিনি কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন।
আগুনের প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। তবে যা নিশ্চিতভাবে জানা গেছে-
কোথায় ও কখন আগুন লাগে?
আগুন লেগেছিল বুধবার স্থানীয় সময় ২ট ৫১ মিনিটে হংকংয়ের উত্তরাঞ্চলের বড় আবাসিক কমপ্লেক্স ওয়াং ফুক কোর্টে, যা তাই পো জেলায় অবস্থিত। সেখানে মোট ৮টি ৩১-তলা টাওয়ার ব্লক রয়েছে। তাই পো জেলা মূল ভূখণ্ড চীনের শেনঝেন শহরের নিকটবর্তী একটি আবাসিক এলাকা।
স্থানীয় কাউন্সিলর মুই সিউ-ফং জানিয়েছেন, ওই ভবনগুলোর মধ্যে ৭টি ব্লক আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত। প্রায় ৪৬০০ বাসিন্দার জন্য এখানে প্রায় দুই হাজার অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে।
১৯৮৩ সালে নির্মিত এই ভবনগুলোর বাহিরে তখন সংস্কারের কাজ চলছিল। সব ভবন ছিল বাঁশের মাচা ও নেট দিয়ে মোড়া। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বাঁশের মাচা ধরে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
কিছু বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি। প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে, আগুনের এমন অস্বাভাবিক বিস্তার রহস্যজনক। কর্তৃপক্ষ বলছে, জানালার চারপাশে ব্যবহৃত দাহ্য পদার্থ, বিশেষ করে পলিস্টাইরিন, আগুন ছড়িয়ে পড়ায় বড় ভূমিকা রেখেছে।
আগুন কতটা ভয়াবহ ছিল?
হংকং দমকল বিভাগ এই অগ্নিকাণ্ডকে লেভেল ফাইভ বা সর্বোচ্চ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রথম খবর পাওয়ার ৪০ মিনিটের মধ্যেই এটি লেভেল ফোরে উন্নীত হয়। সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিটে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় আবার বাড়িয়ে লেভেল ফাইভ করা হয়। গত ১৭ বছরে হংকংয়ে এ ধরনের কোনো আগুন লাগেনি।
ভবনের ভেতর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। দমকলের পাইপগুলো ওপরের তলায় পৌঁছাতেও সমস্যা হচ্ছিল। তীব্র তাপে উদ্ধারকর্মীরা ভবনে ঢুকতেই পারছিলেন না।
দমকল বিভাগের উপপরিচালক ডেরেক আর্মস্ট্রং চ্যান বলেন, “মাচা আর ভাঙা ধ্বংসাবশেষ উপর থেকে পড়ছে, এতে আমাদের কর্মীদের জীবনহানি আরও বেড়েছে।”
মোট ৭৬৭ দমকলকর্মী, ১২৮ ফায়ার ইঞ্জিন, ৫৭টি অ্যাম্বুলেন্স, এবং প্রায় ৪০০ পুলিশ সেখানে মোতায়েন করা হয়।
আগুন নেভাতে কাজ করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। ছবি : সংগৃহীত
নিহত ও নিখোঁজদের সম্পর্কে যা জানা গেছে
রাত পেরিয়ে মধ্যরাতের পরপরই প্রশাসন জানায় ২৭৯ জন নিখোঁজ। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) ভোরের দিকে মৃত্যু আবার বেড়ে ৪৪ এ দাঁড়ায়। অন্তত ৪৫ জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে।
পুলিশ মাইক হাতে নিয়ে বিভিন্ন ভবনের সামনে ঘুরে ঘুরে বাসিন্দাদের আত্মীয়দের সন্ধান দিচ্ছিল।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ৩৭ বছর বয়সী দমকলকর্মী হো ওয়াই-হো। তার সঙ্গে দুপুর ৩টা ৩০ মিনিটে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। পরে তাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়; হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র ও সহায়তা
সরকার একাধিক জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে। তবে টুং চেয়ং স্ট্রিট স্পোর্টস সেন্টার দ্রুতই ভর্তি হয়ে যায়।
ওয়াং ফুক কমপ্লেক্সের পাশের কোয়াং ফুক কমিউনিটি হলকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়।
বিবিসির প্রতিবেদক দেখেছেন, সেখানে অবস্থান নিয়েছেন অনেক বৃদ্ধ, যারা হেঁটে চলতেও লাঠি বা হুইলচেয়ারের সাহায্য নিচ্ছিলেন। পরবর্তীতে তাদের বিভিন্ন কমিউনিটি হলে স্থানান্তর করা হবে। কমপক্ষে ৯০০ জন এই অস্থায়ী আশ্রয়গুলোতে রয়েছেন।
তাই পো–এর ৬টি স্কুল বৃহস্পতিবার বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন সম্পর্কে যা জানা গেছে
পুলিশ ৫২ থেকে ৬৮ বছর বয়সী তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। দুইজন একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, একজন প্রকৌশল পরামর্শক। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিল্ডিংয়ের বাইরে যেসব সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছিল সেগুলো আগুন প্রতিরোধক ছিল না। জানালাগুলোতেও স্টাইরোফোম ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।
পুলিশ বলেছে, “আমরা মনে করছি, প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা চরম অবহেলা করেছেন। তাদের ব্যর্থতার কারণেই আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটল।”
তবে আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পাওয়া যায়নি।
বাঁশের মাচা: ঐতিহ্য, কিন্তু ঝুঁকি
ওয়াং ফুক কোর্টের সব ভবন ছিল বাঁশের মাচা ও সবুজ নেট দিয়ে ঢাকা। হংকংয়ে শত শত বছর ধরে নির্মাণকাজে বাঁশের মাচা ব্যবহৃত হয়। এটি হালকা, শক্ত এবং দ্রুত গজায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ায় সরকার বাঁশের পরিবর্তে লোহা ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, বাঁশের অন্তর্নিহিত সমস্যা হলো- যান্ত্রিক শক্তির তারতম্য, সময়ের সঙ্গে ক্ষয়, এবং অত্যন্ত দাহ্যতা।
এই আগুনেও দেখা গেছে, বাঁশের কাঠামো ধরে আগুন এক ভবন থেকে আরেক ভবনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।