এক্সপ্লেইনার
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫ ২২:০৭ পিএম
বিশ্বজয়ের দ্বারপ্রান্তে চীনের ওষুধ শিল্প। প্রতীকী ছবি
বিশ্বের ওষুধ শিল্পে গত এক দশকে যে পরিবর্তন ঘটে চলেছে, তার কেন্দ্রবিন্দু এখন চীন। দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক উদ্ভাবন, উন্নয়ন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বড় বড় ওষুধ কোম্পানি- ‘বিগ ফার্মা’। কিন্তু ২০৩০ সালের মধ্যেই পরিস্থিতির নাটকীয় বদল ঘটতে যাচ্ছে। কারণ আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রীত প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার আয়ের ওষুধের পেটেন্ট শেষ হয়ে যাবে।
এই ‘পেটেন্ট ক্লিফ’ বিগ ফার্মাকে অভূতপূর্ব সংকটে ফেলেছে; যেহেতু একচেটিয়া অধিকারের সমাপ্তি ও মুনাফায় ধস দেখা দিচ্ছে। ফলে নতুন ওষুধ, উদ্ভাবনী ঔষধি উপদান এবং মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে এমন প্রযুক্তির জন্য তারা এখন মরিয়া। তবে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক উৎস হিসেবে তারা চীনকেই পাচ্ছে।
পশ্চিমাদের টপকে বৈশ্বিক উদ্ভাবনের শক্তি চীন
এক দশক আগেও বিশ্বে যত ক্লিনিক্যাল
ট্রায়াল হতো, তার মাত্র ৫ শতাংশ ছিল চীনে। আজ তা লাফিয়ে এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে। ক্যানসার,
অটোইমিউন রোগ, সেল থেরাপি, জিন থেরাপি- যেসব ক্ষেত্রে পশ্চিমা গবেষকরা দাপট দেখাতেন,
সেখানে এখন সমানতালে কিংবা অনেক ক্ষেত্রে আরও দ্রুত এগোচ্ছে চীনের বায়োটেক প্রতিষ্ঠানগুলো।
এর প্রতিফলন দেখা গেছে শেয়ারবাজারেও।
২০২৪-২৫ সালের মধ্যে চীনের বায়োটেক শেয়ারের দর বেড়েছে ১১০ শতাংশ, যা যুক্তরাষ্ট্রের
কোম্পানিগুলোর চেয়ে তিনগুণ বেশি। বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারছেনÑ ভবিষ্যতের ওষুধ বাজার
আর কেবল আমেরিকা বা ইউরোপের হাতে নেই।
নিয়ন্ত্রক সংস্কার ও গবেষণায় বিস্ফোরণ
চীনের সাফল্যের সবচেয়ে বড়
কারণ হলো তাদের আগ্রাসী নীতিগত সংস্কার। ২০১৫-১৮ সালে ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মী
সংখ্যা চারগুণ বাড়ানো হয়। একই সময়ে দুই দশকের পুরনো আবেদন জট (ব্যাকলগ) দূর করা হয়
মাত্র দুই বছরে। এর ফলে মানবদেহে ট্রায়ালের অনুমোদন সময় ৫০১ দিন থেকে কমে ৮৭ দিনে দাঁড়ায়।
নতুন ওষুধ অনুমোদনের সংখ্যা ২০১৫ সালের ১১ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৯৩ হয়। এর ৪২ শতাংশ
ছিল দেশীয় উদ্ভাবন। তা চীনের গবেষণা সক্ষমতার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
চীনের বায়োটেকের উত্থানে আরেক
বড় ভূমিকা রেখেছে বিদেশফেরত উচ্চমানের বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তা, যাদের বলা হয় ‘সি টার্টল’।
তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিতে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে
চীনে ফিরে আসছেন। স্থানীয় বিনিয়োগ, সরকারি প্রণোদনা এবং হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে সহজ তালিকাভুক্তির
সুবিধা তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার স্পৃহাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
বিগ ফার্মার চীনের ওপর নির্ভরতা
চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ,
সাপ্লাই চেইন ঝুঁকি এবং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ওয়াশিংটন বহুদিন ধরেই চীনের
ওষুধ-সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে। এমনকি কিছু চীনের বায়োটেক কোম্পানির
ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের গুজবও আছে। তবে ট্রাম্প-শির সাম্প্রতিক বৈঠক উত্তেজনা কিছুটা
প্রশমন করেছে। আর বাস্তবতাটাও পুরোটা বিপরীত। এজন্যই বিগ ফার্মা চীনের উদ্ভাবনকে ছাড়া
এগোতে পারছে না।
২০২৪ সালের প্রথমার্ধে বড়
বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর স্বাক্ষরিত মোট বৈশ্বিক লাইসেন্সিং ডিলের এক-তৃতীয়াংশই ছিল
চীনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। ২০২১ সালের তুলনায় এটি চারগুণ বেশি।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক
বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও প্রভাবশালী বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি ফাইজার চীনের কোম্পানি
থ্রিএসবায়োর ক্যানসারের পরীক্ষামূলক ওষুধের বৈশ্বিক অধিকার পেতে ১.২৫ বিলিয়ন ডলারের
চুক্তি করেছে। একই বছর যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক ওষুধ গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন
বা জিএসকে চীনের হেংরুই’র সঙ্গে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে, যা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ
সাপেক্ষে ১২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এই ধরনের চুক্তি এখন আর ব্যতিক্রম নয়;
বরং নিয়মে পরিণত হচ্ছে।
উদ্ভাবনী ওষুধে চীন পশ্চিমাদের ছাড়িয়ে
চীনের ওষুধ শিল্পের সবচেয়ে
বড় মাইলফলক আসে ২০১৯ সালে, যখন বেইজিন দেশটির প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের
খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) অনুমোদন পায়। এরপর থেকে চীনের ওষুধ প্রায় প্রতিবছরই
যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু আসল ভূমিকম্প ঘটে ২০২৫ সালে।
আকেসো বায়ো নামের চীনের ছোট
একটি কোম্পানির নতুন ফুসফুসের ক্যানসারের ওষুধ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মার্কিন জায়ান্ট
মার্কের বিশ্ববিখ্যাত থেরাপি কিট্রুডাকে পিছনে ফেলে দেয়। এটি দেখিয়ে দেয়- চীনের উদ্ভাবন
আর শুধু ‘সস্তা জেনেরিক’ নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মের ব্রেকথ্রু থেরাপির মূল উৎস হয়ে
উঠছে।
চীনকে এড়ানো যাচ্ছে
না
চীন কেবল খরচে সাশ্রয়ী উৎপাদনকারী
দেশ নয়; বরং উদ্ভাবন, গবেষণা ও বাণিজ্যিকীকরণে পশ্চিমাবিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করা একটি পরাশক্তিতে
পরিণত হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্কার, গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ, উদীয়মান বায়োটেক কোম্পানি,
বিদেশফেরত বিজ্ঞানী এবং পশ্চিমা বাজারের সংকট- সব মিলিয়ে চীনের ওষুধ শিল্প এখন বিশ্বজয়ের
দ্বারপ্রান্তে। পশ্চিমা কোম্পানিগুলো না চাইলেও ভবিষ্যতের ওষুধ গবেষণা ও চিকিৎসা উদ্ভাবনে
চীনকে এড়িয়ে চলা আর সম্ভব নয়।