প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৫ ২৩:০৩ পিএম
প্রায় চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে একটি নতুন পরিকল্পনা-কাঠামো তৈরি হয়েছে—এমন দাবিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গন সরগরম। যদিও এই পরিকল্পনার অস্তিত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ স্বীকার করেনি, যুক্তরাষ্ট্রের ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এবং যুক্তরাজ্যের ফিনান্সিয়াল টাইমস প্রথম বিষয়টি প্রকাশ করে। পরে রয়টার্সও দুই নাম না-জানা সূত্রের বরাত দিয়ে খবরটি নিশ্চিত করে।
খবরে বলা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের খসড়া ২৮ দফা শান্তি প্রস্তাব ইউক্রেনের জন্য বেশ প্রতিকূল। এতে দেশটিকে অস্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড ছাড় দিতে হবে, এমনটিও উল্লেখ আছে। বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) কিয়েভে মার্কিন সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বৈঠকের আগের দিনই এ খবর প্রকাশিত হয়।
পরিকল্পনাটি কি আনুষ্ঠানিক?
সেসব
সূত্র এই পরিকল্পনা নিয়ে বলেছে, তারা কেউ বলতে পারেনি এটি এখনও আনুষ্ঠানিক কি না।
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, আর রাশিয়া সরাসরি পরিকল্পনার অস্তিত্ব
অস্বীকার করেছে। তবুও বিভিন্ন সূত্র বলছে, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ কিয়েভকে পরিকল্পনার
খসড়া অবহিত করেছেন।
ফিনান্সিয়াল
টাইমসের ভাষায়, এ প্রস্তাব ‘রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক’, আর এটিকে ‘রাশিয়ার
পক্ষে অতিমাত্রায় ঝুঁকে থাকা’ হিসেবেও মন্তব্য করা হয়েছে। এমনকি দাবি উঠেছে- পরিকল্পনার
খসড়া প্রণয়নে প্রথমদিকে শুধুই মার্কিন ও রুশ কর্মকর্তারা ছিলেন।
তবে চ্যাথাম হাউসের রাশিয়া-বিশেষজ্ঞ কিয়ার জাইলস বলেছেন, পুরো বিষয়টি হয়তো যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং রাশিয়ার তথ্য-অভিযানের অংশ, যা পশ্চিমা গণমাধ্যম ভুলভাবে গ্রহণ করেছে। এই অভিযোগ-সংক্রান্ত একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পোস্ট পরবর্তীতে উইটকফ মুছেও ফেলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন কী বলছে?
হোয়াইট
হাউস নীরব। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, যুদ্ধের
অবসানে “দুই পক্ষের মতামত নিয়ে সম্ভাব্য কিছু প্রস্তাব” নিয়ে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র।
শান্তির জন্য ‘কঠিন ছাড়’ লাগতে পারে বলেও তিনি জানান।
জেলেনস্কি তুরস্কে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকের পর বলেন, রক্তপাত থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্পের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিকল্পনার সম্ভাব্য শর্ত কী?
অ্যাক্সিওস’র খবর অনুযায়ী:
১.
ক্রিমিয়া ও ডনবাসে রাশিয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ
ক্রিমিয়া
(২০১৪ সালে রাশিয়ার দখলে যাওয়া) এবং ডনবাস—ডোনেৎস্ক ও লুহানস্ক—দুই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার হাতে যাবে। বর্তমানে লুহানস্ক পুরোপুরি
এবং ডোনেৎস্কের বড় অংশ রাশিয়ার দখলে রয়েছে।
২.
ইউক্রেনকে ডনবাস থেকে সেনা প্রত্যাহার
ডনবাস
হবে একটি অসামরিক অঞ্চল, যেখানে রাশিয়া ও ইউক্রেন—কেউই
সেনা মোতায়েন করতে পারবে না।
৩.
ইউক্রেনের সামরিক ক্ষমতায় বড় কাটছাঁট
দীর্ঘমেয়াদে
সেনাবাহিনীর আকার সীমিত করা, বিশেষত ৪ লাখের বেশি সৈন্য না রাখা এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র
নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
৪.
জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসনে যুদ্ধরেখা অপরিবর্তিত
এই দুই অঞ্চলে রাশিয়া বর্তমানে প্রায় ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে আছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই রেখাই স্থায়ীভাবে জমে যাবে; বাকি অংশ পরে আলোচনায় নির্ধারিত হবে।
ইউক্রেনের জন্য কি পরিকল্পনাটি ভালো?
বিশেষজ্ঞদের
মত কঠোর—এটি ইউক্রেনের জন্য মোটেও উপকারী নয়।
চ্যাথাম
হাউসের জাইলস বলছেন, সেনাবাহিনীর আকার কমানো ও দূরপাল্লার অস্ত্র নিষিদ্ধ করা ইউক্রেনকে
“পরবর্তী রুশ হামলার সামনে পুরোপুরি অসহায়” করে দেবে এবং “ইউরোপের নিরাপত্তা বিপন্ন
হবে”।
কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক মারিনা মিরন বলেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এটি হবে “রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষার একতরফা প্রস্তাব”।
ট্রাম্পের অবস্থানে টানাপোড়েন
বিগত
এক বছরে ট্রাম্পের অবস্থান বহুবার বদলেছে।
অভিযান চলাকালে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ক্ষমতায় এসে “২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ শেষ করবেন”, কিন্তু দশ মাসেও তা হয়নি।
এরপর কী?
মিরন
মনে করেন, এই পরিকল্পনা যদি সত্যিই থাকে, ইউক্রেন ও ইউরোপ তা প্রত্যাখ্যান করবে। এরপর
শুরু হবে নতুন কূটনৈতিক খেলায় আরেক ধাপ।
তিনি
বলেন, “ট্রাম্প তখন বলতে পারবেন—‘আমরা পরিকল্পনা দিয়েছিলাম, আপনারাই প্রত্যাখ্যান
করেছেন, তাই শান্তি আসছে না।’”
ইউক্রেন, ইউরোপ ও রাশিয়া এই ধরনের প্রস্তাব–প্রতিপ্রস্তাব দিয়ে একে অন্যকে চাপে রাখার চেষ্টা করবে।
পরিকল্পনা নিশ্চিত নয়
নানা
সূত্রে ভেসে ওঠা ২৮ দফা পরিকল্পনা এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু এর সম্ভাব্য কাঠামো প্রকাশিত
খবর অনুযায়ী ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং রাশিয়ার জন্য সুবিধাজনক। পরিকল্পনাটি
সত্যি হোক বা রুশ তথ্য–অভিযানের অংশ—এটি যে
বৈশ্বিক কূটনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে, তা আবারও প্রমাণিত।