ট্রাম্প-সালমান বৈঠক
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ২০:৫৭ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনীতি যে এখন আর প্রচলিত শক্তির ভারসাম্যে থেমে নেই, তা আবারও স্পষ্ট হলো ওয়াশিংটনে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে (এমবিএস) দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজকীয় অভ্যর্থনায়। লাল গালিচা, ঘোড়সওয়ারে সজ্জিত আনুষ্ঠানিকতা, সামরিক ব্যান্ড ও ফ্লাইওভার- সব মিলিয়ে এ সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক আড্ডায় তুমুল আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদের সূচনালগ্নে ট্রাম্প এমন এক টোনে সৌদি সম্পর্ক পুনর্গঠন করছেন, যা তার আগের প্রশাসন বা জো বাইডেন কোনো সময়েই প্রকাশ্যে দেখায়নি। এই সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে বিপুল বিনিয়োগ, সামরিক জোট এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার নতুন সমীকরণ; আর প্রেক্ষাপটে রয়ে গেছে জামাল খাসোগি হত্যার পুরনো ছায়া।
সাউথ পোর্টিকো দিয়ে প্রবেশের পর ওভাল অফিসে ট্রাম্প ও এমবিএস সাংবাদিকদের সামনে বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলেন। ঘোষণা আসে- ওয়াশিংটন-রিয়াদ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।
ইসরায়েল-সৌদি স্বাভাবিকীকরণে ‘ভালো আলোচনা’
সৌদি আরবকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যুক্ত করার ইচ্ছা ট্রাম্প বহুদিন ধরে ব্যক্ত করে আসছেন। মঙ্গলবার এমবিএস জানান, রিয়াদ মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চায় এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যুক্ত হতে আগ্রহী; তবে এর শর্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট পথ নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, দুই রাষ্ট্র সমাধানের জন্য ‘সঠিক পরিবেশ তৈরিতে’ সৌদি আরব কাজ করবে। ট্রাম্পও জানান, এক রাষ্ট্র, দুই রাষ্ট্র- সব মডেল নিয়েই আলোচনা হয়েছে, তবে বিস্তারিত পরে প্রকাশ করা হবে।
সৌদি আরবকে ‘মেজর নন–ন্যাটো অ্যালাই’ ঘোষণা
হোয়াইট হাউসে ব্ল্যাক-টাই ডিনারে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে ‘মেজর নন–ন্যাটো অ্যালাই’ বা প্রধান অ-ন্যাটো মিত্রের মর্যাদা দেবে। এ মর্যাদায় উন্নত মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও অস্ত্র সরবরাহ অনেক সহজ হয়। একইসঙ্গে দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে, যা ৮০ বছরের সামরিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করবে।
চুক্তিতে ‘বার্ডেন শেয়ারিং’—অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের খরচ কমাতে সৌদি আরব নতুন তহবিল দেবে বলে জানানো হয়েছে। সফরের আগেই ট্রাম্প এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সৌদি আরবের কাছে বিক্রির অনুমোদন দেন, যা ইসরায়েলের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ নীতির ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরান ইস্যুতে নরম-কঠোর দু’ধরনের বার্তা
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের হামলা নিয়ে ট্রাম্প আবারও ‘গর্ব’ প্রকাশ করেন। তবে এরপরই তার ভাষায় নমনীয়তা আসে। তিনি বলেন, তেহরান এখন সমঝোতা খোঁজে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনাও চলছে। এমবিএস জানান, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা হলে সৌদি আরব তা সমর্থন করবে। সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছিল, সফরের আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এমবিএসকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সৌদির ‘১ ট্রিলিয়ন ডলার’ বিনিয়োগের ইঙ্গিত
বৈঠকের শুরুতেই ট্রাম্প জানান, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রে ৬০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে সম্মত হয়েছে। তিনি মজা করে বলেন- এমবিএস তার বন্ধু, তাই বিনিয়োগ বাড়িয়ে ১ ট্রিলিয়নও করতে পারেন।
এমবিএস নিজেও বলেন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রেয়ার ম্যাটেরিয়াল, চুম্বক শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আজ যেসব চুক্তি হচ্ছে, তা বিনিয়োগকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি ‘বিশ্বের সবচেয়ে উত্তপ্ত বাজার’ হিসেবে অভিহিত করেন।
খাশোগি ‘অত্যন্ত বিতর্কিত’, সালমান ‘নির্দোষ’
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন এখানেই- ট্রাম্প প্রকাশ্যে দেখিয়েছেন যে খাসোগি হত্যাকাণ্ড তার প্রশাসনের কোনো নীতিগত বাধা নয়। তিনি এমবিএসকে মানবাধিকার বিষয়ে ‘অসাধারণ’ অগ্রগতি করেছে বলে প্রশংসা করেন। সৌদি যুবরাজের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি খাশোগিকে ‘অত্যন্ত বিতর্কিত’ বলে আখ্যা দেন এবং বলেন, এমবিএস হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ‘কিছুই জানতেন না’, যা সিআইএ’র আগের মূল্যায়ন ও সিনেটের সর্বসম্মত নিন্দার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি এমনও ইঙ্গিত দেন যে খাশোগির পরিণতি যেন ‘নিজের কর্মফল’। প্রশ্ন করায় এক সাংবাদিককে ধমক দিয়ে ট্রাম্প দেখিয়ে দিয়েছেন, মানবাধিকার তার নীতিতে তেমন গুরুত্ব পায় না। খাশোগির স্ত্রী হানান বলেন, কোনো সাংবাদিকের অতীত তাকে হত্যার যৌক্তিকতা হতে পারে না; জামাল ছিলেন সাহসী ও সৎ মানুষ।
বন্ধুত্ব, প্রশংসা ও বিতর্কিত মন্তব্য
সফরজুড়ে ট্রাম্প ও এমবিএস নানা প্রশংসায় একে অপরকে ভরিয়ে দেন। ট্রাম্প এমবিএসকে ‘ফ্যান্টাস্টিক’ ও ‘ব্রিলিয়ান্ট’ বলে উল্লেখ করেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রিয়াদ সফরে এমবিএসকে ‘ফিস্ট বাম্প’ দেওয়াকে ব্যঙ্গ করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ওর হাত ধরে রেখেছিলাম- ও হাত কোথায় ছিল, তাতে আমার কিছু যায় আসে না।’
জেফ্রি এপস্টিন-সংক্রান্ত সরকারি নথি প্রকাশ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে ট্রাম্প বলেন, ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিল হওয়া উচিত। এ সময়েই মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ এপস্টিন-ফাইল প্রকাশে বাধ্য করার বিল পাস করে।
ট্রাম্প–এমবিএস বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন পথ তৈরি করেছে- প্রতিরক্ষা জোট, বড় বিনিয়োগ এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিয়ে। এই সফর দুই দেশের সম্পর্কে উষ্ণতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।