× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের কট্টর সমর্থক ডিক চেনি মারা গেছেন

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৫ ২২:০৮ পিএম

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৫ ২২:১২ পিএম

সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি।

সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি।

২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পেছনে প্রধানতম ‘চক্রান্তকারী’ সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি মারা গেছেন। ৮৪ বছর বয়সে নিউমোনিয়া ও হৃদ্‌রোগজনিত জটিলতায় সোমবার তার মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার তার পরিবারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।

২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা চেনিকে মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ভাইস প্রেসিডেন্টদের একজন বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা। রিপাবলিকান এই রাজনীতিক ছিলেন ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্যের সাবেক কংগ্রেসম্যান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

ক্ষমতার কেন্দ্রে এক ‘ছায়া প্রেসিডেন্ট’

জর্জ বুশ যখন ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে টেক্সাসের গভর্নর ছিলেন, তখনই চেনি তার রানিং মেট হন। হোয়াইট হাউসে প্রবেশের পর তিনি প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে জায়গা করে নেন। প্রেসিডেন্সিয়াল ক্ষমতা বৃদ্ধির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া চেনি মনে করতেন, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর থেকে নির্বাহী ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা তিনি পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলেন।

জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে চেনির প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। নিজের দপ্তরকে তিনি একপ্রকার আলাদা ক্ষমতার বলয় হিসেবে গড়ে তোলেন, যেখানে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো প্রেসিডেন্টের পূর্বানুমোদন ছাড়াও।

ইরাক যুদ্ধের হোতা

২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পেছনে সবচেয়ে সক্রিয় কণ্ঠগুলোর একটি ছিল চেনির। তিনি দাবি করেছিলেন, ইরাকের কাছে ব্যাপক গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে এবং সেটি বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য হুমকি। পরে এসব অস্ত্রের কোনো প্রমাণই মেলেনি। তবুও চেনি আজীবন তার অবস্থানে অনড় ছিলেন, বলেছিলেন, ‘তৎকালীন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল।’ 

তিনি তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল ও কনডোলিজা রাইসের সঙ্গে বহুবার নীতিগত বিরোধে জড়ান। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে বন্দিদের ওপর তথাকথিত ‘উন্নত জিজ্ঞাসাবাদ কৌশল’- যেমন জলপীড়ন (ওয়াটারবোর্ডিং) ও নিদ্রা-বঞ্চনা (ঘুমাতে না দেওয়া) সমর্থন করায় তিনি কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটি ও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদক এসব পদ্ধতিকে ‘নির্যাতন’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

জর্জ ডব্লিউ বুশের সঙ্গে ডিক চেনি। 

রাজনীতি, পরিবার ও ট্রাম্পবিরোধিতা 

চেনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তার কন্যা লিজ চেনিও কংগ্রেস সদস্য ছিলেন। ট্রাম্পবিরোধী অবস্থানের কারণে দলীয় সমর্থন হারিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি আসন হারান। ডিক চেনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে ভোট দেবেন। কারণ তার ভাষ্য, ‘আমাদের প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো হুমকি আর কেউ তৈরি করেনি।’

হৃদরোগ, হ্যালিবার্টন ও বিতর্ক 

চেনির জীবনজুড়ে হৃদরোগ ছিল এক অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তার প্রথম হার্ট অ্যাটাক হয়। ২০১২ সালে তিনি হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করান। রাজনীতি থেকে সাময়িক অবসরের আগে ১৯৯৫–২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি তেল ও গ্যাস সেবা সংস্থা হ্যালিবার্টন-এর প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর হ্যালিবার্টন ইরাক যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন সরকারের অন্যতম বড় ঠিকাদার হয়ে ওঠে, যা তার বিরুদ্ধে স্বার্থ-সংঘাতের অভিযোগ উত্থাপন করে।

প্রথম প্রজন্মের রিপাবলিকান

১৯৪১ সালের ৩০ জানুয়ারি নেব্রাস্কার লিঙ্কনে জন্ম নেওয়া রিচার্ড ব্রুস চেনি জন্মসূত্রে এক ডেমোক্র্যাট পরিবারে বড় হন। তার মা ছিলেন একজন ওয়েট্রেস থেকে সফটবল খেলোয়াড়, আর বাবা কাজ করতেন ফেডারেল সয়েল কনজার্ভেশন সার্ভিসে। পরিবারের প্রথম রিপাবলিকান হিসেবে চেনি পরে বলেন, ‘সম্ভবত আমার প্রপিতামহের পর আমিই প্রথম রিপাবলিকান, যিনি ইউনিয়ন বাহিনীর পক্ষে গৃহযুদ্ধে লড়েছিলেন।’

ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও রাজনীতিতে উত্থান

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনায় ব্যর্থ হয়ে তিনি ফিরে আসেন ওয়াইওমিংয়ে। ১৯৬০-এর দশকে বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে পরবর্তীতে রাজনৈতিক বিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলাকালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেননি; বরং একাধিকবার ড্রাফট থেকে অব্যাহতি নেন। লেখক জন নিকোলস ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন, ‘চেনি সৈনিকের পোশাকের প্রতি এমনই অ্যালার্জিক ছিলেন যেন তা তার জীবনের জন্য হুমকি।’ 

ওয়াশিংটনে তার প্রবেশ ১৯৬৯ সালে, প্রেসিডেন্ট নিক্সনের আমলে কংগ্রেসনাল ইন্টার্ন হিসেবে। পরবর্তী সময়ে রামসফেল্ডের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে তিনি দ্রুতই প্রশাসনিক ক্ষমতার উচ্চস্তরে পৌঁছে যান। ফোর্ড প্রশাসনের সময় তিনি হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ ছিলেন, পরে এক দশক ওয়াইওমিংয়ের একমাত্র কংগ্রেসম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

‘ডার্থ ভেডার’ তকমা

কংগ্রেসে ডিক চেনির রক্ষণশীল অবস্থান ছিল কঠোর। গর্ভপাতের অধিকার, বন্দুক নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ও শিক্ষাখাতে সরকারি ব্যয়- সবকিছুর বিরোধিতা করেছেন তিনি। বর্ণবৈষম্যের সময় দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তির প্রস্তাবেও তিনি ভোট দেননি।

চেনির কঠোর ভাবমূর্তির কারণে তাকে অনেকেই ‘ডার্থ ভেডার’ বলে ডাকত। টেলিভিশনের কৌতুকশিল্পীরা তাকে ‘স্টার ওয়ার্স’-এর সেই অন্ধকার শক্তির সঙ্গে তুলনা করতেন। চেনি নিজেও মজা করে বলতেন, ‘ওটা তো দারুণ প্রশংসা।’ একবার এমনকি তিনি ‘টুনাইট শো’-তে ভেডারের পোশাকে হাজির হয়েছিলেন নিজের আত্মজীবনী প্রচারের সময়।

ব্যক্তিজীবন ও উত্তরাধিকার

স্ত্রী লিন চেনি তার দীর্ঘদিনের সহযাত্রী ছিলেন। তিনিও রক্ষণশীল সাংস্কৃতিক ইস্যুতে প্রভাবশালী কণ্ঠ ছিলেন। তাদের দুই কন্যা- লিজ ও মেরি চেনি। উভয়ই রাজনীতি ও সমাজে সক্রিয়। মেরি প্রকাশ্যে সমকামী। এই বিষয়ে কন্যার প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়ে চেনি দলীয় অনেক সহকর্মীর সমালোচনার মুখে পড়েন। বিশেষ করে যখন বুশ প্রশাসন সমলিঙ্গ বিবাহবিরোধী সাংবিধানিক সংশোধনী প্রস্তাব করে।

বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক প্রতিচ্ছবি

২০০৬ সালে এক শিকার অভিযানে দুর্ঘটনাক্রমে তিনি তার বন্ধুকে গুলি করে আহত করলে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ভাইস’ চলচ্চিত্রে অভিনেতা ক্রিশ্চিয়ান বেল তার চরিত্রে অভিনয় করেন। গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার গ্রহণের সময় বেল মজা করে বলেন, ‘এই চরিত্রের অনুপ্রেরণার জন্য শয়তানকে ধন্যবাদ।’

চেনি পরবর্তীতে নিজের আত্মজীবনী ‘ইন মাই টাইম : আ পারসোনাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল মেমোয়ার’ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে মতবিরোধ ও প্রেসিডেন্ট ওবামার নীতির সমালোচনা করেন।

নির্মম কৌশলী 

শেষ বয়সে চেনি ক্রমশ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান, তবে বিতর্ক কখনও থামেনি। মার্কিন রাজনীতির ইতিহাসে তিনি থেকে গেছেন এক অনন্য দ্বৈত চরিত্রের প্রতীক- দেশপ্রেমিক ও ক্ষমতার রাজনীতির নির্মম কৌশলী হিসেবে।

তার পরিবার জানায়, মৃত্যুর সময় স্ত্রী লিন, কন্যা লিজ ও মেরি তার পাশে ছিলেন। 


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা