× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইরাকে ভোট ও সদরের ক্ষমতায় ফেরার খেলা

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:৪৭ এএম

ইরাকে ভোট ও সদরের ক্ষমতায় ফেরার খেলা

ইরাকের শিয়া নেতা মোকতাদা আল সদর, যিনি দেশটির রাজনীতি ও জনজীবনে গত দুই দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত, তিন বছর আগে তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে তার লক্ষ্য অবসর ছিল না, বরং ছিল এক পর্বতপ্রমাণ ‘পুনরাগমন’। নভেম্বরের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সদর সম্প্রতি বলেছেন, তিনি ‘দেশ বাঁচাতে ও পুরনো মুখ বদলাতে চান।’ এই আহ্বান কেবল নির্বাচনী কৌশল নয়, বরং এক দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক নাটকের নতুন অধ্যায়।

২০২২ সালের জুনে সদর তার দলীয় ব্লক পার্লামেন্ট থেকে প্রত্যাহার করেন। তখন থেকে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা ইরানঘনিষ্ঠ শিয়া কোঅর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক (এসসিএফ) সংসদের বৃহত্তম শিয়া জোট হয়ে ওঠে। সদর তাদের বিরুদ্ধে তার সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ তোলেন।

তবে সদরের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে যেভাবে ‘পুরো ব্যবস্থার সংস্কার’ দাবি তোলা হয়েছে, তার আড়ালে তিনি যে ক্ষমতায় ফেরার পথ তৈরি করছিলেন, তা স্পষ্ট। তার অনুসারীদের একটি অংশ মনে করছিল নির্বাচনে অংশ নিলে অন্তত সরকারি কাঠামোর মধ্যে থাকা তাদের কিছু কর্মকর্তাকে রক্ষা করা যাবে। শেষ পর্যন্ত সদর তিন বছরের বয়কট আপাতত ‘স্থগিত’ করার সিদ্ধান্তে রাজি হন, যদিও তিনি পরে আবার সরে যেতে পারেন, এই শর্তেই।

তারা প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল সুদানির সঙ্গে নিবন্ধন সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে যোগাযোগও করেন। কিন্তু এসসিএফ তা প্রত্যাখ্যান করে। জুলাইয়ে সদর নিজেই তার আলোচকদের ‘বয়কটার্স’ ট্যাগসহ একটি হাতে লেখা বার্তা পোস্ট করে আলোচনা শেষ ঘোষণা দেন।

সদর প্রথম বড় ধাক্কা খান ২০২২ সালে, যখন তার তথাকথিত ‘জাতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সরকার’ গঠনের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ইরাকের প্রচলিত ক্ষমতা-বণ্টন ব্যবস্থা মুহাসাসা অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে মন্ত্রিসভা ও রাষ্ট্রীয় পদগুলো ভাগ হয় জাতিগত ও ধর্মীয় অনুপাতে। সমালোচকদের মতে, এটি জবাবদিহিতাহীনতা ও দুর্নীতির উৎস।

সদরের প্রস্তাবিত নতুন মডেল ছিল বিপরীত- সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই সরকার গঠন, বাকিদের বিরোধী দলে রাখা।

২০২১ সালের নির্বাচনের আগে থেকেই সদর সুন্নি নেতা মোহাম্মদ আল-হালবুসি ও কুর্দি নেতা বারজানির দলের (কেডিপি) সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। তাদের সঙ্গে একটি অঘোষিত চুক্তিও হয়- প্রত্যেকে নিজের অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করবে, আর মিলিতভাবে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করবে।

নির্বাচনে সদরের দল ৭৩টি আসন পায়, কেডিপি ৩১, হালবুসির তাকাদ্দুম আন্দোলন ৩৭। ‘ইনকাজ ওয়াতান’ (দেশ রক্ষার জোট) নামে তারা ১৭৫ আসনের জোট গঠন করে। কিন্তু তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারহাম সালিহ আদালতের ব্যাখ্যা চান, যা শেষ পর্যন্ত সদরের পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়। আদালত জানান, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ (২২০ আসন) সমর্থন লাগবে। ফলে এসসিএফ একটি ‘বাধাদানকারী তৃতীয় পক্ষ’ হয়ে ওঠে।

সাবেক মেহেদি আর্মি কমান্ডার সদর ২০০৬ সাল থেকে বিভিন্ন নামে আহরার ব্লক, সায়রুন অ্যালায়েন্স, সদরিস্ট ব্লক- প্রতিটি সরকারেই ছিলেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৭৩টি আসন পাওয়ার পর সংসদ ছাড়ার সিদ্ধান্তে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরাই উপকৃত হয়। এসসিএফের হাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা চলে আসে এবং তারা সুদানিকে প্রধানমন্ত্রী করে।

সদর তখন রাস্তায় নামে। তার অনুসারীরা বাগদাদের কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত গ্রিন জোনে প্রবেশ করে, সংসদ দখল করে অবস্থান নেয়। প্রথমে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও পরে তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। আরও রক্তপাত ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত সদর টেলিভিশনে বক্তৃতা দিয়ে তার অনুসারীদের সরে যেতে বলেন।

পরবর্তীতে এসসিএফ-নিয়ন্ত্রিত সংসদ নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে কুর্দি ইউনিয়ন পার্টির (পিইউকে) আবদুল লতিফ রশিদকে নির্বাচিত করে এবং সুদানি দ্রুত মন্ত্রিসভা গঠন করে।

ক্ষমতায় এসে এসসিএফ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর থেকে শুরু করে নাজাফ ও আমারার গভর্নর পর্যন্ত সদর-ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেয়। এমনকি আদালতকেও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।

কুর্দিস্তানের তেল-গ্যাস আইন বাতিল, সুন্নি স্পিকার হালবুসির বহিষ্কার- এসব ঘটনার ফলে সরকারের অভ্যন্তরীণ সংকট বেড়েছে।

অর্থনৈতিক অবস্থাও নাজুক। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ইরাকের সরকারি ব্যয়- বেতন, ভাতা, পেনশন মোট তেল আয়ের প্রায় ৯৯ শতাংশ ছুঁয়েছে।

একই সঙ্গে ইসরায়েলি হুমকি, ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর উপস্থিতি, আর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপ- সব মিলিয়ে সরকার এখন এক গভীর সংকটে।

এই প্রেক্ষাপটে সদর নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করেছেন ‘প্যাট্রিয়টিক শিয়া কারেন্ট’ নামে। নিজের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও জনভিত্তি ব্যবহার করে তিনি এখন শিয়া সমাজে আবারও প্রভাব বিস্তার করছেন।

২০২৫ সালের আশুরায় বাগদাদ ও নাসিরিয়ার আন্দোলন চিহ্নিত তহরির ও হাবুবি স্কয়ারে সদর নিজেই তাবু ফেলে খাদ্য বিতরণ করেন, যেখানে আগে কোনো রাজনীতিক প্রবেশ করতে সাহস করেননি।

আঞ্চলিকভাবে তিনি ইরানপন্থী এসসিএফের বিপরীতে নিজেকে ‘সমঝোতাপূর্ণ’ নেতা হিসেবে দাঁড় করাচ্ছেন। সিরিয়ায় শাসন পরিবর্তনের সমর্থন, গাজা ইস্যুতে কেবল নিন্দা- এসবের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের কাছে এক ‘গণতান্ত্রিক, কিন্তু ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য’ মুখ হয়ে উঠছেন।

এখন প্রশ্ন, ইরাক যদি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ইসরায়েলি আক্রমণ বা অর্থনৈতিক পতনের মুখে পড়ে- তবে কি সদরই সেই শূন্যতা পূরণে প্রস্তুত?

অনেকে বলছেন, তিন বছরের নীরবতা, ব্যর্থ জোট আর রাজনৈতিক নাটকের মধ্য দিয়ে সদর যে চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন, সেটাই হয়তো তার চূড়ান্ত লক্ষ্য- ক্ষমতায় ফেরা, নিজের শর্তে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা