বিশ্লেষণ
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪৬ এএম
আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবনতি একসময় কল্পনাই করা যেত না। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান যখন কাবুলের ক্ষমতায় ফিরে আসে, তখন ইসলামাবাদ সামরিক ও বেসামরিক দুই পর্যায়েই আনন্দে ভাসে। পাকিস্তানের ধারণা ছিলÑ তালেবান সরকার তাদের মিত্র হবে, সীমান্তে নিরাপত্তা হুমকি কমাবে, আর আফগানিস্তান হবে পাকিস্তানের কৌশলগত ‘প্রতিরক্ষা প্রাচীর’।
কারণ, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আফগান তালেবানকে সমর্থন দিয়েছে।
২০০১ থেকে ২০২১ পর্যন্ত পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল দ্বৈত। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযানকে সমর্থন দিয়ে মার্কিনপন্থী সরকারকে স্বীকৃতি দেয়, অন্যদিকে নিজেদের ভূখণ্ডে তালেবান ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আশ্রয় ও সহায়তা দেয়।
কিন্তু আজ সেই সম্পর্ক ভেঙে পড়েছে। গত ৯ অক্টোবর রাতে পাকিস্তানি বিমানবাহিনী প্রথমবারের মতো কাবুলে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। পারস্পরিক অবিশ্বাস ও একে অন্যের সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন এখন তাদের আগের সম্পর্ক পুনর্গঠনকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।
দুই দেশের জন্য ঝুঁকি কী
পাকিস্তানের নিরাপত্তা কাঠামো, যেখানে সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই প্রধান ভূমিকা রাখেÑ দীর্ঘদিন ধরেই আফগাননীতি পরিচালনা করছে। ইতিহাস বলছে, বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও সেনাবাহিনী প্রায়ই তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে।
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানে হামলার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসেই দেশটিতে হামলায় নিহত হয়েছে প্রায় ২,৪০০ মানুষ, যা আগের পুরো বছরের মোট সংখ্যার কাছাকাছি।
ইসলামাবাদ এসব হামলার জন্য দোষ দিচ্ছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে, যার নেতৃত্ব বর্তমানে আফগানিস্তানে অবস্থান করছে। টিটিপির অধিকাংশ সদস্য পাকিস্তানের আফগান সীমান্তবর্তী উপজাতি অঞ্চল থেকে আসে।
পাকিস্তানের আশা ছিলÑ তালেবান সরকার প্রতিষ্ঠার পর টিটিপি নেতারা আফগানিস্তান ছেড়ে যাবে। কিছু যোদ্ধা ফিরে এলেও সহিংসতা কমেনি। টিটিপি পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ইসলামী আইন ও পুরনো আধা-স্বায়ত্তশাসিত অবস্থার পুনর্বহাল দাবি করছে।
এদিকে পাকিস্তান ভুগছে একাধিক সংকটেÑ অর্থনীতি ধুঁকছে, ভারতের সঙ্গে মে মাসের সীমান্ত-সংঘাতের পর কূটনৈতিক উত্তেজনা তীব্র, রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে, সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধাক্কা। এই অবস্থায় অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই এখন জাতীয় নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে আফগানিস্তানে তালেবান সরকার আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন, নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত, আর চরম অর্থনৈতিক সংকটে। রাশিয়া ছাড়া কোনো দেশ এখনও তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি, যদিও চীন, ভারত ও ইরানসহ কয়েকটি দেশ তাদের বাস্তব শাসক হিসেবে মেনে কূটনৈতিক যোগাযোগ রাখছে। দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত প্রায় অচল। জাতিসংঘের সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্যসংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাত এই সংকট আরও গভীর করবে।
পুরনো বন্ধুত্ব কি ফিরবে?
এ মুহূর্তে দুই পক্ষই অবস্থানে অনড়। অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হলেও কেউই পিছিয়ে যেতে চায় না।
যে ইসলামাবাদ একসময় তালেবানের ক্ষমতায় ফেরা উদ্যাপন করেছিল, আজ তারা তালেবান সরকারকে ‘রেজিম’ বলে উল্লেখ করছে এবং আফগানিস্তানে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার’ গঠনের আহ্বান জানাচ্ছে। তারা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেÑ টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আফগান ভূখণ্ডে আরও হামলা হতে পারে।
নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি, আধুনিক অস্ত্র, এবং কূটনৈতিক প্রভাব তালেবানের তুলনায় অনেক বেশি। মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘর্ষে নিজেদের ‘বিজয়ী’ ভাবছে পাকিস্তান, যা তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে।
১৯৮০-এর দশক থেকে পাকিস্তান লাখো আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে; অনেকে সেখানে শিক্ষা ও পেশা গড়ে তুলেছে। ইসলামাবাদের মতে, এ কারণে আফগানদের পাকিস্তানের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। এখন শরণার্থী প্রত্যাবাসন ইস্যুটিই পাকিস্তানের প্রধান কূটনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে।
পাকিস্তানের দৃষ্টিতে, তারা একটি পরাশক্তি-সংলগ্ন দেশ; যে অবস্থান যেকোনো আফগান সরকারের শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা দাবি করে।
অন্যদিকে তালেবান নিজেদের দেখে এক দীর্ঘ ও সফল যুদ্ধের বিজয়ী হিসেবে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিকে পরাজিত করেছে। তাদের চোখে পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতও আরেক ‘মিশন’ হতে পারে।
তালেবান মুখপাত্ররা পাকিস্তানের প্রচারযুদ্ধের পাল্টা দিচ্ছে, অভিযোগ করছেÑ পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকায় আইএসআইএল যোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে সেনাবাহিনীর কিছু অংশের সহযোগিতায়।
তবুও বাস্তবতা হলো, স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তানের বাণিজ্য প্রধানত পাকিস্তাননির্ভর। সীমান্ত বন্ধ থাকায় দুই দেশের ব্যবসায়ীদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তালেবান সরকারের বিমান প্রতিরক্ষা বা আধুনিক অস্ত্রের অভাবও তাদের দুর্বলতা বাড়িয়েছে।
উত্তেজনা প্রশমনের পথ
পাকিস্তান এখন টিটিপির বিরুদ্ধে লড়াইকে ভারতের বিরুদ্ধে বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ হিসেবে দেখাচ্ছে, যদিও এর প্রমাণ নেই। তারা তালেবানকে টিটিপি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইসলামাবাদের পাশে দাঁড়ানো দেখতে চায়।
কিন্তু টিটিপি ও আফগান তালেবানের মধ্যে মতাদর্শিক ও সামাজিক বন্ধন বহু পুরনো। টিটিপির বিরুদ্ধে যাওয়া মানে তালেবানের ভেতরেও বিভক্তি তৈরি হওয়া, যা আইএসআইএলের (খোরাসান প্রদেশ শাখা) মতো উগ্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করবে।
অন্যদিকে পাকিস্তানেরও ঝুঁকি কম নয়। যদি তালেবান নেতা হিবতুল্লাহ আখুন্দজাদা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘জিহাদের ফতোয়া’ দেন, তাহলে পাকিস্তানের ভেতরের অনেক মাদ্রাসা ও ধর্মীয় নেতা তার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করতে পারেন। ২০২১ সালেই টিটিপি নেতারা আখুন্দজাদার আনুগত্য স্বীকার করেছে। এমন ফতোয়া পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
তা ছাড়া পাকিস্তানের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোও তালেবানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ সমর্থন করবে না। অপরদিকে, আফগানিস্তানে পাকিস্তানের হামলা চলতে থাকলে সাধারণ আফগানদের ক্ষোভ সত্ত্বেও তালেবান সরকারের প্রতি দেশীয় সমর্থন বাড়তে পারে।
এই অবস্থায় উত্তেজনা প্রশমন ও সংলাপ শুরু করার জন্য নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন। কাতার ও সৌদি আরব, যারা দুই পক্ষেরই আস্থা অর্জন করেছে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এই পথ ইতোমধ্যেই কিছু ফল দেখিয়েছে। তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুতাক্কি গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, কাতার ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় তালেবান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা বন্ধ রেখেছে।
তবে প্রকৃত শান্তি আসবে তখনই, যখন দুই দেশের নেতৃত্ব আন্তরিকভাবে তা চাইবে।
যদিও দুই পক্ষ একে অপরকে হুঁশিয়ারি দিচ্ছে এবং সীমান্তে গুলি বিনিময় চলছে, উভয়েই জানেÑ যুদ্ধ তাদের জন্য ভয়াবহ মূল্য নিয়ে আসবে।
তবু এর মানে এই নয় যে পুরনো উষ্ণ সম্পর্ক দ্রুত ফিরে আসবে, কিংবা ভুল পদক্ষেপ হবে না।
ভূগোল ও ইতিহাস দুই জাতিকে এমনভাবে বেঁধে রেখেছে, যা বিচ্ছিন্ন করা যায় না। সেটিকেই নতুন সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।
আফগান নেতাদের উচিত পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বাস্তববাদী হওয়া, আর পাকিস্তানের উচিত আফগান নীতিকে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতার রঙে না রাঙানো।
এই অঞ্চলে আরেকটি যুদ্ধের জায়গা নেই, কারণ শান্তি ছাড়া কোনো ফলই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
[মূল লেখা: হামিদ হাকিমি, আলজাজিরা]