প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৫৫ এএম
আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৩৬ পিএম
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সরে যাওয়ার পর হামাস অনুগত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা গাজার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে। গাজা উপত্যকার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের প্রবেশদ্বারে রবিবার তারা যানবাহনে তল্লাশি চালায়। এএফপি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে মিসরে আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলন শুরুর আগেই ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন হামাসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। এই সম্মেলনে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ অবসানে ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এদিকে সোমবার সকালের মধ্যেই জীবিত ২০ জিম্মিকে পর্যায়ক্রমে মুক্তি দেওয়া হবে বলে আশা করছে ইসরায়েল। এ ছাড়া আজ ইসরায়েল সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। খবর বিবিসি ও আলজাজিরার।
ইসরায়েল সরকারের এক মুখপাত্র জানান, ফেরত দেওয়া মৃত জিম্মিদের লাশ কফিনে করে একটি ফরেনসিক ইনস্টিটিউটে নেওয়া হবে। সেখানে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হবে। আর ইসরায়েল ২৫০ ফিলিস্তিন বন্দি ও গাজা থেকে আটক ১৭০০ জনকে মুক্তি দেবে। এদের মধ্যে ২৪ জনের বেশি শিশু রয়েছে। জিম্মি ও বন্দিদের স্বজনরা তাদের জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন।
এদিকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর রবিবার শত শত ত্রাণবাহী ট্রাককে গাজায় ঢুকতে গেছে। মিসরের সঙ্গে রাফাহ ক্রসিংয়ে ঢোকার অপেক্ষায় রয়েছে আরও অনেক ট্রাক। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, গাজায় প্রতিদিন ৬০০ ত্রাণবাহী ট্রাক ঢুকতে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। এজন্য জাতিসংঘ সব সীমান্ত খুলে দিতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
গাজায় যুদ্ধ অবসানে ট্রাম্পের ঘোষিত শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত শুক্রবার থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এখন সেই পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার জন্য সোমবার বিকালে শার্ম আল-শেখে অনুষ্ঠিত হবে শান্তি সম্মেলন, যেখানে সভাপতিত্ব করবেন ট্রাম্প ও মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে আক্রমণ চালানোর পর ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায় হামাস। ইসরায়েলের ভাষ্য, ওই হামলায় প্রায় এক হাজার ২০০ জন নিহত হয়। জবাবে গাজা উপত্যকায় ব্যাপক আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েল। কয়েক দফায় কিছু জিম্মি মুক্তি পেলেও ৪৭ জনের বেশি জিম্মি রয়েছে হামাসের হাতে। এদের মধ্যে প্রায় ২০ জন জীবিত বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে গাজার সিভিল ডিফেন্স জানায়, জীবিত জিম্মিদের মুক্তির আগে গণনা করা হয়েছে। তাদের মুক্তির প্রস্তুতি হিসেবে নির্দিষ্ট এলাকায় নেওয়া হয়েছে।
টেলিগ্রামে আরবিতে করা পোস্টে বলা হয়েছে, গাজা উপত্যকার তিনটি পৃথক স্থানে জিম্মি হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এতে আরও বলা হয়, যেসব ফিলিস্তিন বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হবে, তাদের তালিকা চূড়ান্ত করতে একটি চুক্তি পৌঁছাতে কাজ চলছে। এই তালিকায় ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি হামাসের প্রভাবশালী নেতা মারওয়ান বাঘৌতি ও আহমাদ সাদাতের নাম অন্তর্ভুক্ত করার চাপ অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ইসরায়েল। আজ ট্রাম্পের ইসরায়েল সফরের কথা রয়েছে। এ উপলক্ষে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট ভবনের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এনবিসির মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে বলেন, ট্রাম্প যখন সোমবার সকালে ইসরায়েল যাবেন, তখন তিনি হামাসের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়া জিম্মিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করবেন।
তিনি বলেন, ‘তারা কখন মুক্তি পাবে, নির্দিষ্ট করে সেই সময় বলা যাচ্ছে না। কিন্তু আমাদের প্রত্যেকের প্রত্যাশা রয়েছে…তিনি (ট্রাম্প) মুক্ত জিম্মিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করবেন।’
জিম্মি-বন্দিবিনিময়ে নতুন চুক্তি
হামাস কর্মকর্তা ওসামা হামদান এএফপিকে জানান, ‘সই হওয়া চুক্তি অনুযায়ী সোমবার সকাল থেকে জিম্মিমুক্তি ও বন্দিবিনিময় কার্যক্রম শুরু হবে।’ ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সব ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে ইসরায়েল প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দিকে ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছে।
ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মুক্তির জন্য নির্বাচিত ২৫০ বন্দিকে ইতোমধ্যে দুটি কারাগারে জড়ো করা হয়েছে। এ ছাড়া গাজার যুদ্ধে আটক এক হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনিকেও মুক্তি দেওয়া হবে।
জানা গেছে, জীবিত ও মৃত জিম্মিদের ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি ২০১৪ সালে আটক এক ইসরায়েলির দেহাবশেষও হস্তান্তর করা হবে।
শান্তি সম্মেলন ও আন্তর্জাতিক উপস্থিতি
শার্ম আল-শেখে শান্তি সম্মেলনে ২০টির বেশি দেশের নেতা অংশ নেবেন বলে জানিয়েছে মিসর। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ উপস্থিত থাকবেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অংশগ্রহণ এখনও নিশ্চিত নয়।
হামাস এই সম্মেলনে থাকবে না। সংগঠনটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হোসাম বাদরান বলেন, ‘আমরা কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায়ই আলোচনা করে এসেছি। সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই।’
রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এখনও অনিশ্চিত। ট্রাম্পের পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে গাজায় বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েন এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে রয়েছে বড় ধরনের জটিলতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হামাস কর্মকর্তা স্পষ্ট জানান, ‘অস্ত্র ত্যাগের প্রশ্নই আসে না।’
অন্যদিকে শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী ইসরায়েল ধাপে ধাপে সরে গেলে গাজার দায়িত্ব নেবে মিসর, কাতার, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের যৌথ বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি কমান্ড সেন্টার থাকবে ইসরায়েলে, যেখান থেকে পুরো কার্যক্রম সমন্বয় করা হবে।
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার গাজা পরিদর্শন করেছেন।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গাজা নগরীতে ফিরছেন লাখো বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি। তবে ইসরায়েলি হামলায় তাদের অনেকের ঘরবাড়ি এখন কেবল ধ্বংসস্তূপ।