প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৫৭ এএম
প্রবা পাতা।
ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ঢাকাই জামদানি নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। সেখানকার ন্যাশনাল ক্রাফটস মিউজিয়াম ও হস্তকলা একাডেমিতে ১৯ সেপ্টেম্বর এ প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। চলবে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় সংস্কৃতিজগতের নামকরা ব্যক্তিত্বরা। এই আয়োজন শুধু শাড়ির প্রদর্শনী নয়, বরং বাংলাদেশের এক অনন্য শিল্প ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার এক বিরল প্রচেষ্টা।
এই প্রদর্শনীর উদ্যোগ নিয়েছেন ভারতের নতুন নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রিয়াজ হামিদুল্লাহ। কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি যখন উমরাও জান ছবির পরিচালক মুজফফর আলির সঙ্গে এই আয়োজন নিয়ে কথা করেন, তখনই বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। পরিচালক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি তো আসবই। আমি উমরাও জানে রেখাকে জামদানি পরিয়েছি... আর দিল্লিতে জামদানি নিয়ে কাজ হলে আমি আসব না?’ শেষ পর্যন্ত তিনি কথা রেখেছেন। প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্যÑ ভারতীয় শাড়িপ্রেমীদের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানিকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং এই শিল্পকে আরও ব্যাপক পরিসরে তুলে ধরা।
উদ্বোধনীতে মুজফফর আলি হাজির হয়ে শাড়ির সম্ভার ঘুরে দেখেন। প্রতিটি জামদানির নকশা ও বুননের সূক্ষ্মতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন তিনি এবং প্রশংসা করতে ভোলেননি। শুধু তা-ই নয়, তাঁতিদের সঙ্গে ছবিও তোলেন। একইভাবে ভারতের নামি ইন্টেরিয়র ডিজাইনার সুনীতা কোহলি, যিনি রাষ্ট্রপতি ভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মতো ঐতিহাসিক ভবন সাজিয়েছেন, তিনিও এই প্রদর্শনীর অন্যতম মেন্টর। তার উপস্থিতি ও মূল্যায়ন এই আয়োজনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
জামদানি এমন এক টেক্সটাইল, যা বুনতে লাগে ওস্তাদ ও সাগরেদÑ অন্তত দুজন তাঁতি একসঙ্গে কাজ না করলে এর সূক্ষ্ম নকশা সম্ভব নয়। প্রতিটি জামদানি বোনা হয় হাতে, যেখানে কোনো যন্ত্র বা পাওয়ার লুমের ব্যবহার নেই। একেকটি শাড়ি বুনতে লাগে সাত দিন থেকে শুরু করে ৭০ দিন পর্যন্ত। আবার কখন তা ১৭০ দিন পর্যন্ত লেগে যায়। এজন্যই জামদানিকে শুধু শাড়ি নয়, বরং ‘তাঁতে বোনা শিল্পকর্ম’ বলা হয়। রাষ্ট্রদূত হামিদুল্লাহ বলেন, ‘প্রতিটি জামদানি আসলে আলাদা একেকটা কবিতা।’
এই প্রদর্শনী কিউরেট করেছেন চট্টগ্রামের চন্দ্রশেখর সাহা ও রাজস্থানের চন্দ্রশেখর ভেডা। দুজনই আহমেদাবাদের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডিজাইনের সাবেক শিক্ষার্থী এবং দীর্ঘদিনের বন্ধু। সাহা বহু বছর ছিলেন বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ‘আড়ং’-এর প্রধান ডিজাইনার, আর ভেডা ভারতের ‘স্পাইডার ডিজাইন’-এর কর্ণধার। তাদের মতে, জামদানির আসল শক্তি হলো, এটি এখনও পুরোপুরি হাতে তৈরি। চন্দ্রশেখর ভেডা বলেন, ফাস্ট ফ্যাশনের যুগেও জামদানি টিকে আছে, কারণ প্রযুক্তি কখনোই এই শিল্পকে প্রতিস্থাপন করতে পারেনি।
জামদানির কারিগররা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শীতলক্ষ্যার তীরে এই কাজ চালিয়ে আসছেন। তাঁতিরা বিশেষ এক ভাষায় নিজেদের মধ্যে কথা বলেন, যা বাইরের কারও বোঝার উপায় নেই। জামদানির নকশা লুকিয়ে থাকে অঙ্কের ছন্দ, কবিতার লাইন আর রঙের মিশেলে; যার কোনো লিখিত নকশা থাকে না। এজন্য প্রতিটি জামদানি একক এবং অনন্য। চন্দ্রশেখর সাহা এটিকে বলেন ‘ওভেন আর্ট’Ñ তাঁতে বোনা শিল্প।
তথ্যসূত্র : বিবিসি বাংলা