মোদির মন্ত্রিসভা
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৪ ২২:০৭ পিএম
টানা তিন মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। তার সঙ্গে একে একে শপথ নিয়েছেন ৭২ জন। তাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ৩০ জন, প্রতিমন্ত্রী ৩৬ জন এবং স্বতন্ত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত পাঁচজন। তবে এই তালিকায় নেই কোন মুসলমানের নাম। যদিও ধর্মীয় সংখ্যালঘু পাঁচজন পেয়েছেন মন্ত্রিত্ব। এ ছাড়া নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে দলিত ১০ জন, সংখ্যালঘু জাতিসত্তার পাঁচজন, পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ২৭ জন এবং উচ্চ বর্ণের রয়েছেন ২১ জন। হিন্দু ধর্মীয় রাজনীতিতে মোদি কোনো ছাড় দিচ্ছেন না তা এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। কেননা তার শপথ অনুষ্ঠানে মুকেশ আম্বানি ও আদানিসহ হিন্দু সিভিল সোসাইটির বিশেষ সদস্যরা।
গেল নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন মুখতার আব্বাস নকভি। কিন্তু ২০২২ সালে রাজ্য সভায় তার মেয়াদ শেষ হলে তিনি পদত্যাগ করেন। তখন তার জায়গায় স্মৃতি ইরানি মন্ত্রী হন। এবারের মেয়াদে কোন মুসলমান শপথ নেননি। এনডিএ থেকে কোন মুসলমান নির্বাচিতও হয়নি।
নতুন মন্ত্রিসভায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু পাঁচজনের মধ্যে দুনজ জন শিখ, দুজন বৌদ্ধ এবং একজন খ্রিস্টান। তারা হলেন হরদীপ সিং পুরি, রবনীত সিং বিট্টু, জর্জ কুরিয়ান, কিরেন রিজিজু এবং রামদাস আথাওয়ালে। তাদের মধ্যে পুরি এবং আথাওয়ালে রাজ্য সভার সংসদ সদস্য। আর অরুণাচল প্রদেশ থেকে লোকসভা নির্বাচনে জয় পেয়েছেন রিজিজু, পাঞ্জাব থেকে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন বিট্টু আর কেরালা বিজেপির সাধারণ সম্পাদক কুরিয়ান নির্বাচনেই অংশ গ্রহণ করেননি।
গেল মঙ্গলবার লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়। এবারের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি বিজেপি। ফলে কিছুটা অস্বস্তিতে ছিলেন মোদি। তবে রবিবার মন্ত্রিসভার সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানিয়েছেন, ‘জোট ধর্ম’ সঠিকভাবে পালনের ক্ষেত্রে তার সরকার কোনো গাফিলতি করবে না। মন্ত্রিসভায় যারা রয়েছেন তাদের অনেকেই আশাবাদী জোট সরকারে তারা স্বাধীনভাবেই কাজ করতে পারবেন। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সূত্র বলছে, শরিকদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে মোদি নিজ দলের ভারসাম্য নষ্ট করবেন না। স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, বাণিজ্য এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থাকছে বিজেপির কাছেই।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর চন্দ্রবাবু নাইডু লোকসভা স্পিকারের পদের জন্য নানা তোড়জোড় চালিয়েছেন। শুরুতে তার দল চারটি মন্ত্রণালয় দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত একটি কেবিনেট মন্ত্রী আর একটি রাজ্যমন্ত্রীর পদেই সন্তুষ্ট রয়েছেন। তবে নাইডু কি এখনও লোকসভা স্পিকারের জন্য তোড়জোড় চালাচ্ছেন নাকি বরাদ্দের সুবিধার প্রত্যাশায় চুপ থাকবেন তা অস্পষ্ট রয়ে গেছে। নিজ রাজ্যে বরাদ্দ ও বিশেষ সুবিধার প্রত্যাশায়ই যে তিনি এ সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন তা সহজেই প্রতীয়মান। একই কথা নীতিশ কুমারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে নীতিশ কুমারের সঙ্গে জাতিভিত্তিক শুমারির বিষয়টি নিয়ে এখনও কোনো মীমাংসা হয়নি। নীতিশের নেতৃত্বাধীন টিডিপি সাফ জানিয়েছে, ওবিসির অধীনে মুসলমানদের ৪ শতাংশ কোটা তারা কোনোভাবেই ছাড়বে না।
নতুন মন্ত্রিসভা গোছানোর পর মোদির সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কেবিনেটে মন্ত্রণালয় ভাগ করা প্রথমটি। তবে ভারতীয় গণমাধ্যমের দাবি, এনডিএ শরিকরা অগ্নিপথ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাড়তি জোর দিচ্ছে। চলতি বছরই মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও ঝাড়খণ্ডে অ্যাসেম্বলি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই রাজ্য থেকে মন্ত্রিসভায় সদস্য বাছাই করাও মোদির রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন অনেকে। রাজ্যসভার সদস্য প্রফুল্ল প্যাটেল প্রতিমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব পেলেও তা নাকচ করে দেন। তবে বিজেপি অন্ধ্রপ্রদেশের শরিকদের তুষ্ট রেখে অ্যাসেম্বলি নির্বাচন জয়ের বিষয়টি ভাবছে।
মোদির জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে শক্তিশালী বিরোধী জোট। লোকসভায় যেকোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিগত দশ বছরের মতো বাড়তি সুবিধা তিনি পাচ্ছেন না। তবে মোদির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এবং বিজেপিকে সামাল দেওয়া। গত লোকসভা নির্বাচনের হিসাবে বিজেপি এবার ৬০টিরও বেশি আসনে হেরেছে। বিজেপি ও আরএসএসের সিনিয়র নেতারা অসন্তুষ্ট হলেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। ধারণা করা হচ্ছেÑ মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও ঝাড়ঝণ্ড রাজ্যসভা নির্বাচন পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করবেন।
ভারতের রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন সময় পরিস্থিতি যাচাই করে এগুতে পারেন। মোদিও সম্ভবত তার সব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবেন। আপাতত মোদির মন্ত্রিসভার সামনে রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু নানা সমীকরণের পরও তিনি তার নিজস্ব রাজনৈতিক কৌশল ধরে রেখেছেন।