লোকসভা নির্বাচন
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৪ ১১:০২ এএম
রাহুল গান্ধী
লোকসভা নির্বাচনে রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোট নরেন্দ্র মোদির বিজেপির নেতৃত্বের এনডিএ জোটের দারুণ পরীক্ষা নিয়েছে বলা যায়। নির্বাচনের আগে মোদি যেখানে ঘোষণা দিয়েছিলেনÑ এবার চারশ আসনে জিতবে তার দল; সেখানে ভোটের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে এবার আর সংসদের নিম্নকক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না বিজেপি। মোদি ম্যাজিকে ধস নামানোর কারিগর আর কেউ নন, রাহুল গান্ধী।
কংগ্রেস, তৃণমূল, বামসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির যৌথমঞ্চ ‘ইন্ডিয়া’ (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স) গড়ে ওঠে মাত্র এক বছর আগে। এই বছরেই জোটের সঙ্গীদের নিয়ে দেশজুড়ে চষে বেড়িয়েছেন রাহুল। যার ফলও পেয়েছেন হাতেনাতে। যদিও পশ্চিমবঙ্গসহ কয়েকটি প্রদেশে জোটের সঙ্গীদের নিয়ে ভোটের আগে কিছু ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল, তবুও ভোটের মাঠে ইন্ডিয়া জোট তথা কংগ্রেসের উত্থানকে যে ভোটাররা স্বাগত জানিয়েছেন, তা বলাই বাহুল্য।
গতবারের মতোই এবারও রাহুল গান্ধী দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলি এবং কেরালার ওয়ানাদ আসন থেকে। এই দুটো আসনেই তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) ওয়েবসাইটে তার জয়ের বিষয়ে এমন তথ্যই জানিয়েছে।
রায়বেরেলি ঐতিহ্যবাহীভাবে কংগ্রেসের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এ আসন থেকে বরাবরই রাহুল গান্ধীর মা সোনিয়া গান্ধী নির্বাচন করে থাকেন। তবে ছেলের জন্য নিজের আসন ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। এ আসনে বিপুল ভোট পেয়েছেন রাহুল গান্ধী, ছাড়িয়ে গিয়েছেন মা সোনিয়া গান্ধীর ২০১৯ সালের ভোট জয়ের রেকর্ড। এ আসনে কংগ্রেস নেতা রাহুল বিজেপির দীনেশ প্রতাপ সিংকে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৩৪১ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। এখানে বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) ঠাকুর প্রসাদ যাদব মাত্র ২১,৫৮৮ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান লাভ করেন।
গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় লোকসভা নির্বাচনের ভোটগণনা শুরু হয়। দুপুর ১টা ৪২ মিনিট নাগাদ রাহুলের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নেন দীনেশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে দীনেশ লিখেন, ‘আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে, কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে রায়বেরেলির জনগণের সেবা করেছি। এই সেবাকালে যদি আমার চিন্তা, কথা বা কাজে কোনো ভুল হয়ে থাকে কিংবা কাউকে আহত করে থাকি, তাহলে আমি ক্ষমা চাইছি। দলের সদস্যরা কংগ্রেসের এই ঘাঁটিতে বিজেপির জয় নিশ্চিত করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু জনগণের সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে নেই।’
এদিকে কেরালার ওয়ানাদে রাহুল গান্ধী ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) অ্যানি রাজাকে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৪২২ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। যেখানে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কেরালার রাজ্য সভাপতি কে সুরেন্দ্রন ১ লাখ ৪১ হাজার ভোটের কিছু বেশি পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। গত লোকসভা নির্বাচনেও রাহুল ওয়ানাদে ৬৪ শতাংশ ভোটের বেশি পেয়ে জয়লাভ করেন।
দুটি লোকসভা আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাহুল গান্ধীর জন্য নতুন কিছু নয়। ২০১৯ সালের নির্বাচনে তিনি ওয়ানাদে জয় পেলেও আমেথিতে কঠিন লড়াইয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিজেপি নেতা স্মৃতি ইরানির কাছে হেরেছিলেন। আমোথিতে সেবার রাহুল পান ৪৩ শতাংশ ভোট। বিপরীতে ইরানি পেয়েছিলেন ৪৯ শতাংশ ভোট।
তবে এ-ও পরিষ্কার যে, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না বিজেপি।
এদিকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রাপ্ত সর্বশেষ ফলকে ‘মোদির নৈতিক হার’ বলে কটাক্ষ করেছে কংগ্রেস। পাশাপাশি দলটি বলেছে, ‘দেশের মানুষ মোদির বিরুদ্ধেই রায় দিয়েছেন।’
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কংগ্রেস এক সংবাদ সম্মেলনের ডাক দেয়। যেখানে উপস্থিত ছিলেন রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খড়্গে, সোনিয়া গান্ধী। বৈঠকে একাধারে বিজেপি এবং মোদি-শাহকে আক্রমণ করেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। খড়্গে বলেন, ‘ভোটের এই ফল বিজেপির নৈতিক হার। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কংগ্রেস লড়াই করেছিল। এই লড়াই শেষ হয়নি। আগামী দিনেও আমরা সংসদে এই নিয়ে আওয়াজ তুলব। মানুষ এবার কোনো দলকেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়নি।’
রাহুল গান্ধীও মোদিকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখেন সংবাদ সম্মেলনে। তিনি বলেন, ‘মোদি-শাহ দেশের এজেন্সি, অর্ধেক বিচার ব্যবস্থাকে কবজা করে রেখেছে। আমাদের লড়াই ছিল তার বিরুদ্ধে। সংবিধান বাঁচানোর লড়াইয়ে এটাই প্রথম পদক্ষেপ।’ বিজেপিবিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ দলের অন্যতম শরিক কংগ্রেস। সেই জোটের প্রত্যেকটি দলকে ধন্যবাদ জানান রাহুল। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের জোটসঙ্গীদের সম্মান করি।’
রাহুল আরও বলেন, ‘ভারতের মানুষ স্পষ্ট জবাব দিয়ে দিয়েছে মোদি-শাহকে সরকারে চায় না তারা। এই ফল বড় বার্তা দিল মোদিকে।’ একই সঙ্গে আলাদা করে উত্তরপ্রদেশের মানুষকে ধন্যবাদ জানান রাহুল। তবে ভবিষ্যতে ‘ইন্ডিয়া’ কি সরকার গড়বে? বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার পরেই সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে রাজনৈতিক মহলে। এমনকি, কংগ্রেসের পুরনো ‘বন্ধু’ চন্দ্রবাবু নাইডুর দল টিডিপি এবং নীতিশ কুমারের দল জেডিইউ কী করবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে। যদি এই দুই দল এনডিএ ছেড়ে চলে আসে, তবে মোদির সরকার গড়া প্রশ্নের মুখে পড়ে যাবে। সেই নিয়ে রাহুলকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ইন্ডিয়া বৈঠকে এই নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আগামীকাল আমরা বৈঠকে বসছি।’